ভোটের হাওয়া : বরিশাল-৪

অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়েও জয়ের আশা বড় দু'দলে

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮      

পুলক চ্যাটার্জি, বরিশাল

বিশাল মেঘনা নদীর কারণে জেলা সদর থেকে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুই উপজেলা হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জকে নিয়ে গঠিত বরিশাল-৪ নির্বাচনী আসন। দুর্গম এ এলাকায় ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটে ২০১৪ সালে। স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ ২০১৪-তে এ আসনের সংসদ সদস্য হয়ে ১৯৯১ সালের পর আবারও আসনটিতে নৌকার জয়পতাকা তোলেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আসনটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে বিএনপি চাইছে, তাদের হূত আসন ফিরে পেতে।

তবে উভয় দলের জয়ের পথে বাধা হয়ে উঠেছে বরিশাল-৪ আসনে দল দুটির অভ্যন্তরে বিরাজমান অদৃশ্য ও নীরব বিভক্তি। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রের দাবি, নির্বাচিত হওয়ার পর পংকজ দেবনাথ দুই উপজেলায় মূল দল ছাড়াও অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করেছেন। এর ফলে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ আওয়ামী লীগের অনেক সিনিয়র নেতা দলের শীর্ষ পদ-পদবিতে থেকেও অনেকটা নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।

পংকজ দেবনাথ অবশ্য অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের দলনিরপেক্ষ মানুষ উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার মিছিলে শামিল হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে যারা অতীতে আওয়ামী লীগের আতঙ্ক ছিল, তারা এখন আওয়ামী লীগে এসে ঠুনকো অভিযোগ তুলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম ভুলুও বর্তমান সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে দলের মধ্যে নিজস্ব বলয় সৃষ্টির অভিযোগ অসত্য দাবি করে বলেন, যারা অতীতে তৃণমূল পর্যায়ে দলকে সুসংগঠিত না করে নিজেদের ভাগ্য গড়েছেন, তারাই এমন অভিযোগ তুলছেন।

অন্যদিকে বিএনপিতে এ আসনের সাবেক এমপি এবং দলটির উত্তর জেলা শাখার সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদও সংগঠনের একটি বড় অংশকে কোণঠাসা করে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে হিজলা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নুরুল আলম রাজু বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে যারা দলের কর্মসূচি থেকে দূরে রয়েছেন, তারাই দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। বাস্তবতা হলো, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ বিএনপিতে কোনো বিভেদ নেই।

এ আসনে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বর্তমান এমপি পংকজ দেবনাথ, দলের মহানগর সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম, সাবেক এমপি মহিউদ্দিন আহম্মেদের মেয়ে ও দলের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহম্মেদ এবং ২০০১ সালে মনোনয়ন পাওয়া মেজর (অব.) মহসিন সিকদার।

পংকজ দেবনাথ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনায় অবহেলিত হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উন্নয়নের মহাসড়কে সংযুক্ত হয়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশালের বিশাল জনসমুদ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যত প্রকল্পের উদ্বোধন ও ফলক উন্মোচন করেছেন, সেগুলোর ১৫টিই হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের। তার সময়ে পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে কাজীরহাটে নতুন থানা হয়েছে। নদীভাঙন প্রতিরোধে এবং চরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা শহরের সঙ্গে মেহেন্দীগঞ্জের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করতে কদমতলীতে সেতু নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে গত চার বছরে এই আসনে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা স্বাধীনতার পর আর হয়নি। এ কারণে তিনি আবারও দলের মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করছেন।

অ্যাডভোকেট আফজালুল করিম বলেন, ২০০১ সালে মনোনয়ন পেলেও তাকে জোর করে হারানো হয়েছে। ২০০৮ সালে মনোনয়ন পেলেও তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের স্বার্থে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। তার ত্যাগ ও আনুগত্য বিবেচনায় এনে দল তাকে আগামী নির্বাচনেও মনোনয়ন দেবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি। তার মতে, দুই উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে তার নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। তার বাবা এ কে এম নুরুল করিম এ আসনে দুবারের এমপি। প্রবীণ নেতারাও তাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চাইছেন।

ড. শাম্মী আহম্মেদ জানান, মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়ে তিনি দলের কারও সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। কে দলের মনোনয়ন পাবেন, সে সিদ্ধান্ত নেবেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী তাকে মনোনয়ন দিলে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে ভোটযুদ্ধে নামবেন। অন্য কেউ দলের মনোনয়ন পেলে নৌকা প্রতীকের পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে অংশ নেবেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে সামগ্রিকভাবে বিপর্যয় ঘটে। বরিশাল বিভাগের ২১টি আসনের মাত্র দুটিতে জয়ী হয় বিএনপি। এ দুটির একটি এই বরিশাল-৪ আসন। আগামী নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক এমপি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ, সাবেক এমপি শাহ মোহাম্মদ আবুল হোসাইন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাজীব আহসান, যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক হাওলাদার, যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নুরুর রহমান জাহাঙ্গীর ও যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন। সংস্কারপন্থি ইস্যু নিয়ে বিরাজমান সংকট দূর হলে শাহ মোহাম্মদ আবুল হোসাইন এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে পারেন বলে তার অনুসারীরা মনে করছেন।

তবে হিজলা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নুরুল আলম রাজু বলেন, মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা সুসংগঠিত। তা ছাড়া দীর্ঘদিন পদ আটকে রাখা নিষ্ফ্ক্রিয়দের বাদ দিয়ে হিজলা উপজেলায় নতুন কমিটি গঠনের পর নেতাকর্মীদের মধ্যে সক্রিয়তা দেখা দিয়েছে। যদিও পদবঞ্চিতরা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে আঁতাত করে দলের ক্ষতি করতে চাইছে। কিন্তু এতে দলে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না।

মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের পর এবং ২০০৮ সালে এমপি হওয়ার পরও তিনি মাঠে রয়েছেন। আওয়ামী লীগের নির্যাতন উপেক্ষা করে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তার অভিযোগ, এমপি হওয়ার পরও তিনি নির্ভয়ে এলাকায় যেতে পারেননি। যখনই এলাকায় গেছেন, তখনই হামলার শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, হাতেগোনা কয়েকজন নেতা দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলেও কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেননি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি নেতাকর্মীরা অবিচল রয়েছেন। দলের প্রতি দরদ এবং নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে রাখার পুরস্কার তিনি পাবেন বলে আশা রয়েছে তার।

সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেফতার হওয়ার আগে রাজীব আহসান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এখনও তিনি এলাকায় গিয়ে প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি। কারণ, আগেভাগে মাঠে নামলে দলেও বিভক্তি বাড়ে। তবে আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন চাইবেন তিনি।

অ্যাডভোকেট আবদুল খালেক হাওলাদার বলেন, আগে দুবার মনোনয়ন চেয়ে না পেলেও দলের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম চালিয়েছিলেন। এ কারণে আগামী নির্বাচনে আর বঞ্চিত হবেন না বলে মনে করছেন তিনি।

নুরুর রহমান জাহাঙ্গীর জানান, একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে তিনি সব সময়ই প্রতিটি সংকটে দলের সঙ্গে থেকেছেন। নেতাকর্মীদের দুঃসময়ে তাদের পাশে থেকেছেন। আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাবেন বলে মনে করছেন তিনি।

অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সব সময়ই তার যোগাযোগ রয়েছে। তিনি আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এবারই প্রথমবারের মতো দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান তিনি।

এ আসনে জাতীয় পার্টির নাসির উদ্দিন সাথী, ইসলামী আন্দোলনের সৈয়দ এছাহাক মোহাম্মদ আবুল খায়ের, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির অর্থ সম্পাদক আবদুল মজিদ আকন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

বিষয় : ভোটের হাওয়া

পরবর্তী খবর পড়ুন : ভালোবাসার সঙ্গী

আরও পড়ুন

রাষ্ট্রপতির সহায়তা চেয়ে চিঠি দেবে ঐক্যফ্রন্ট

রাষ্ট্রপতির সহায়তা চেয়ে চিঠি দেবে ঐক্যফ্রন্ট

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে রাষ্ট্রপতির সহায়তা চেয়ে ...

এরশাদ কোথায়

এরশাদ কোথায়

অজ্ঞাত স্থানে 'বিশ্রাম নিচ্ছেন' জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ ...

প্রার্থীর যোগ্যতা অযোগ্যতা প্রশ্নে দ্বিধায় ইসি

প্রার্থীর যোগ্যতা অযোগ্যতা প্রশ্নে দ্বিধায় ইসি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার মানদণ্ড ...

নৌকায় চড়তে চান শতাধিক ব্যবসায়ী

নৌকায় চড়তে চান শতাধিক ব্যবসায়ী

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ব্যানারে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ...

নওয়াব ফয়জুন্নেছার বাড়ি হবে উন্মুক্ত জাদুঘর

নওয়াব ফয়জুন্নেছার বাড়ি হবে উন্মুক্ত জাদুঘর

ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী উপমহাদেশের একমাত্র নারী নওয়াব। কুমিল্লার লাকসাম থেকে আধা ...

আসামিকে জামিন পাইয়ে দিলেন দুদক পিপি

আসামিকে জামিন পাইয়ে দিলেন দুদক পিপি

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রামের পিপির সুপারিশে ১৩৫ কোটি টাকা ...

মৃত্যুফাঁদ থেকে সাবধান

মৃত্যুফাঁদ থেকে সাবধান

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সড়কের আশপাশে এবং বাসাবাড়িতে গ্যাস পাইপলাইন ...

'মি টু আন্দোলন পুরুষের বিরুদ্ধে নয়'

'মি টু আন্দোলন পুরুষের বিরুদ্ধে নয়'

বিশ্বজুড়ে শুরু হওয়া যৌন নিপীড়ন বিরোধী #মি টু আন্দোলনের ঢেউ ...