একাই খুন, মুখ খুলছেন পিন্টু

ব্যবসায়ী প্রবীর হত্যা

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

এম এ খান মিঠু, নারায়ণগঞ্জ

অবশেষে নারায়ণগঞ্জের স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ হত্যার জট খুলতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। মনের ভেতরে পুষে রাখা ক্ষোভ থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে একাই নৃশংসভাবে খুন করেছেন পিন্টু। এরপর লাশ টুকরো করে ফেলে দেন নিজের ভাড়া বাসার সেপটিক ট্যাঙ্কে। সেখানে সব টুকরোর সংকুলান না হওয়ায় খণ্ডিত পা দুটি ফেলা হয় বাসার পাশের একটি নর্দমার ড্রেনে। এরপর ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে একের পর এক চতুরতার আশ্রয় নেন তিনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি তার। পুলিশের অব্যাহত জিজ্ঞাসাবাদে নতি স্বীকার করেন। জানান- কীভাবে, কী কারণে খুন করেছেন তিনি। এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার নিহত প্রবীর ঘোষের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে তার পরিবার জানিয়েছে।

রিমান্ডে প্রথম দিকে পুলিশকে বিভ্রান্তমূলক নানা তথ্য দিলেও বুধবার রাত থেকে মুখ খুলতে শুরু করেন পিন্টু। রাতেই বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয় তাকে নিয়ে। একে একে শনাক্ত করা হয় কোন দোকান থেকে চাপাতি কিনেছেন, কোন কামারের দোকানে সেটি শান দিয়েছেন, কোন দোকান থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগ কিনেছেন।

প্রবীর হত্যা মামলার তদন্ত-সংশ্নিষ্ট নারায়ণগঞ্জ ডিবি পুলিশের একটি সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। ওই সূত্র এও বলেছে, রিমান্ডের প্রথম দু'দিন পুলিশকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করেছেন পিন্টু। বাইপাস সার্জারির রোগী হওয়ার ফায়দা নিয়ে একের পর এক বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিতে থাকেন তিনি। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তারাও কৌশলের আশ্রয় নেন। 'সত্য কথা বললে পিন্টুকে ছেড়ে দেওয়া হবে'- এ আশ্বাস দিলে মুখ খুলতে শুরু করেন তিনি।

পিন্টু দেবনাথের ওপর শুধু প্রবীর ঘোষেরই নয়, অগাধ বিশ্বাস ছিল তার পরিবারেরও। ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ একাধিকবার পিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ করার বিষয়টি জানতে পেরে নিখোঁজ প্রবীরের পরিবার তাদের পরিচিত একজনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ পুলিশের কাছে তদবির করায়, যাতে বারবার হয়রানি না করা হয় পিন্টুকে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রবীর হত্যায় ব্যবহূত চাপাতিটি বাসার সামনের ময়লার ভাগাড়ে এবং চারারগোপ খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে রক্তাক্ত জামাকাপড়, বালিশ ও বিছানার চাদর। বুধবার রাতেই তাকে নিয়ে তার আমলাপাড়ার ভাড়া ফ্ল্যাটে যায় ডিবির একটি টিম। সেখানে দেখান- কীভাবে প্রবীরকে হত্যা করেছেন পিন্টু।

পুষে রাখা ক্ষোভ ও দোকান হারানোর ভয় থেকে হত্যার সিদ্ধান্ত :স্বর্ণপট্টি এলাকার পিন্টু, প্রবীর, উত্তম ও গোপী- ঘনিষ্ঠ চার বন্ধু হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে দুই বছর আগে পিন্টু হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তখন প্রবীরই তাকে ভারতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে এনেছিলেন। পিন্টু পুলিশকে জানিয়েছেন, ওই সময় ভারতে তুচ্ছ একটি বিষয় নিয়ে প্রবীর চড় মেরেছিলেন তাকে। ওই ঘটনা মনে পুষে রেখেছিলেন তিনি। এ ছাড়া স্বর্ণপট্টি এলাকার স্বর্ণ ভবনে বেশ কয়েক মাস আগে আরেকটি দোকান কেনেন পিন্টু। এতে প্রবীরের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধার নেন তিনি। সম্প্রতি ওই টাকা ফেরত চেয়ে চাপ দিচ্ছিলেন প্রবীর। টাকা দিতে না পারলে আকারে-ইঙ্গিতে দোকানটি তাকে লিখে দিতেও বলেন। এ বিষয়গুলো কেন্দ্র করে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এর আগেও তিনবার প্রবীরকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি, তবে পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় সম্ভব হয়নি তা। শেষমেশ ঈদের ছুটিতে লোকশূন্য পরিবেশে প্রবীরকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন পিন্টু।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড :পিন্টু জানান, ১৮ জুন রাত ৯টার পর প্রবীরকে তিনি নিজেই তার ফ্ল্যাটে নিয়ে আসেন টেলিফোন করে। এরপর স্প্রাইট ও বিস্কুট খেতে দেন তাকে। পিন্টু টেলিভিশন অন করে দিলে খেতে খেতে টিভি দেখছিলেন প্রবীর। ওই সময় পেছন থেকে চাপাতি দিয়ে তার ঘাড়ে প্রথমে সজোরে কোপ দেন পিন্টু। এতে প্রবীর বিছানার ওপর লুটিয়ে পড়ে ছটফট করতে থাকেন। তখন তার মুখের ওপর বালিশ চেপে ধরে চাপাতি দিয়ে উপর্যুপরি কোপাতে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে দেহ নিথর হয়ে গেলে খাট থেকে নামিয়ে টুকরো করা শুরু করেন। ওই সময় প্রবীরের অপর বন্ধু গোপী ফোন দেন প্রবীরকে। কিন্তু ফোন রিসিভ করে পিন্টু কোনো কথা বলেননি। রাত সাড়ে ১২টার দিকে টুকরোগুলো চারটি ব্যাগে ভরা হয়। প্রবীর ও নিজের রক্তাক্ত জামাকাপড়, বিছানার চাদর, বালিশ অন্য একটি ব্যাগে ভরে ফ্লোরের রক্ত ধুয়েমুছে গোসল করে পরিস্কার হন নিজে। মধ্যরাতে বাসার সেপটিক ট্যাঙ্কে ফেলতে শুরু করেন ব্যাগটি। কিন্তু সেপটিক ট্যাঙ্কে সংকুলান না হওয়ায় বাসার পাশের একটি নর্দমার ড্রেনে ফেলে দেন পা দুটি। আর চাপাতিটি ফেলে দেন বাসার সামনের ময়লার ভাগাড়ে। সেখান থেকে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ময়লা নিয়ে যাওয়ায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি ওটি।

লাশ গোপন করে পিন্টু নিজেই রাত দেড়টায় প্রবীরের খোঁজে তার বঙ্গবন্ধু সড়কের বাসায় যান। সেখানে গিয়ে তিনি জানান, প্রবীরকে ফোনে পাচ্ছেন না, তাই বাসায় এসেছেন।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পিন্টু জানিয়েছেন, প্রবীরকে হত্যার পরপরই হত্যা রহস্য ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করতে তার বিশ্বস্ত বাপেন ভৌমিককে প্রবীরের ফোনটি দিয়ে কুমিল্লার সীমান্ত অঞ্চলে ফেলে দিয়ে আসতে বলেন। এর আগে একটি খুদে বার্তা পাঠাতে প্রবীরের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে বলেন। বাপেন তা পাঠালেও প্রবীরের দামি মোবাইল ফোনের লোভ সামলাতে পারেনি। সিমটি কুমিল্লার সীমান্ত অঞ্চলে ফেলে দিলেও মোবাইল সেট নিয়ে ফিরে আসেন নারায়ণগঞ্জে। তারপর সেটিতে ৭ জুলাই নিজের সিম ভরে ব্যবহার শুরু করেন। আর এতেই সম্ভাব্য খুনিরা ধরা পড়ে।

খুনের পর অস্বস্তিতে ছিলেন পিন্টু :প্রবীরকে হত্যার পর থেকে এক ধরনের অস্বস্তিতে ভুগছিলেন পিন্টু। বাপেন কুমিল্লা থেকে ফিরে এলে তাকে তার নিজের ফ্ল্যাটে থাকতে বলেন তাই। কিন্তু সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে ক'দিন পর দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে পিন্টু সেপটিক ট্যাঙ্কের মুখে বালু ফেলেন, যাতে দুর্গন্ধ বাইরে না আসতে পারে। একপর্যায়ে সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে লাশের টুকরোগুলো তুলে অন্যত্র সরিয়ে ফেলারও পরিকল্পনা করেন তিনি। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি।

পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে ৩ কিলারের গল্প :রিমান্ডে প্রথম দিকে পুলিশকে বিভ্রান্ত করে তথ্য দেন পিন্টু। প্রথমে পুলিশকে জানান, খুন করেননি তিনি। খুনের জন্য তিনজন কিলারকে ভাড়া করেছিলেন। তাদের সঙ্গে বাপেনও ছিল। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা খুনিদের নাম ও ঠিকানা জানতে চাইলে তা জানাতে পারেননি। ওই সময় পুলিশ ভেবেছিল, পিন্টু খুনিদের আড়াল করতে চাইছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের জেরার মুখে পিন্টু স্বীকার করেন- প্রবীরকে একাই খুন করেছেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) নূরে আলম বলেন, প্রথম দিকে পিন্টু পুলিশকে বিভ্রান্ত করেছেন। তাই এখন যেসব তথ্য দিচ্ছেন, সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় তার বক্তব্য প্রদান না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কোনো কিছুই বিশ্বাস করব না।

উল্লেখ্য, গত ১৮ জুন রাতে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন নারায়ণগঞ্জ নগরের কালীরবাজার স্বর্ণপট্টি এলাকার জুয়েলারি ব্যবসায়ী ভোলানাথ জুয়েলার্সের মালিক প্রবীর ঘোষ। ২২ দিন পর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পিন্টু দেবনাথের আমলাপাড়া এলাকার ভাড়া বাসার সেপটিক ট্যাঙ্ক থেকে খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয় তার।

Best Electronics
বিএনপি-জামায়াত 'পাতানো খেলা'

বিএনপি-জামায়াত 'পাতানো খেলা'

সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থিতার সিদ্ধান্তে এখনও ...

সর্বত্রই নৌকা, ধানের শীষের দেখা নেই

সর্বত্রই নৌকা, ধানের শীষের দেখা নেই

ভোরে ট্রেন থেকে নেমে রাজশাহীর পরিপাটি স্টেশন চত্বরে পা রেখেই ...

কাউন্সিলর পদেও 'দলীয় প্রতীক'

কাউন্সিলর পদেও 'দলীয় প্রতীক'

বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি) নির্বাচনের মাঠে ক্রমে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। সময় ...

বিশ্বকাপের সেরা পাঁচ গোল

বিশ্বকাপের সেরা পাঁচ গোল

গোলের খেলা ফুটবল। গোল না হলে কেমন যেন পানসে মনে ...

ক্রোয়েশিয়ার কান্না বৃষ্টি হয়ে নামল

ক্রোয়েশিয়ার কান্না বৃষ্টি হয়ে নামল

‘আমরা কাঁদছি কোথায়। এ তো কেবল বৃষ্টির ঝটকা।’ ম্যাচ শেষে ...

বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান এমবাপ্পে

বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান এমবাপ্পে

এমবাপ্পেকে উদীয়মান তারকা বলা হয়তো ঠিক হবে না। বিশ্বকাপের আগেই ...

বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার মডরিচ

বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার মডরিচ

ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বকাপ ফাইনালে তোলার বড় অবদার লুকা মডরিচের। ফাইনালেও ক্রোয়েশিয়া ...

হ্যারি কেনের গোল্ডেন বুট

হ্যারি কেনের গোল্ডেন বুট

ফাইনালে খেলার কথা ছিল তার। তবে ক্রোয়েশিয়া বাধা পেরুতে পারেননি ...