শোষিত-বঞ্চিত-নিষ্পেষিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এসব দাবি উত্থাপনের পর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা চালায়। বঙ্গবন্ধু ওই সম্মেলন বর্জন করেন। '৬৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় ৬ দফা প্রস্তাব অনুমোদিত হয় এবং দাবিগুলো আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। খুব দ্রুতই ৬ দফা দাবি বাঙালির প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়। সূচিত হয় তীব্র ছাত্র-গণআন্দোলন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মী, ছাত্র-শ্রমিক-যুবকদের গ্রেপ্তার করে বেআইনিভাবে কারারুদ্ধ করে।
৬ দফা দাবির আন্দোলনকে নস্যাৎ করার অভিপ্রায়ে শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধিমালা, ১৯৬৫-এর বিধি ৩২ বলে ১৯৬৬ সালে ৮ মে নির্যাতনমূলক আটকাদেশ প্রদান করে। একই বছরের ২৯ মে আরও একটি আটকাদেশ জারি করা হয়। তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্টে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে উভয় আটকাদেশ চ্যালেঞ্জ করেন রেজাউল মালিক। উভয় মামলা একত্রে শুনানি হয়। বিচারপতি বাকের, বিচারপতি আবদুল্লাহ এবং বিচারপতি আবদুল হাকিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে উভয় মামলা একত্রে শুনানি ও পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে পুনঃশুনানি হয়। বিচারপতি বাকের ও বিচারপতি আবদুল হাকিম রুল দুটি খারিজ করে আটকাদেশ বহাল রাখেন। বিচারপতি আবদুল্লাহ তাদের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করে আটকাদেশ বেআইনি ঘোষণা করেন। বিচারপতি আবদুল্লাহ তার রায়ে সৈয়দ ফজলুল হক বনাম সরকার মামলায় (বিবিধ মামলা নং-৯৫/১৯৬৬) প্রদত্ত রায় উল্লেখ করে অভিমত ব্যক্ত করেন, 'উপরোক্ত মামলায় ছয় দফা কর্মসূচির বিচারিক মীমাংসা করা হয়েছে। বিচারপতি বাকের ও বিচারপতি আবদুল হাকিম ওই মামলায় অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, ছয় দফা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করায় কোনো অপরাধ হয়নি।'
বিচারপতি আবদুল্লাহ উপরোক্ত রায়ের ভিত্তিতে অভিমত দেন যে, "আমার বিজ্ঞ ভ্রাতৃদ্বয় (বিচারকবৃন্দ) জনাব আবদুস সালাম খানের (আইনজীবী) এই যুক্তি গ্রহণ করেছেন যে, সুপ্রিম কোর্ট কিংবা হাইকোর্ট কোনো আদালতই কখনও ছয় দফা কর্মসূচিকে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড বলে বর্ণনা করেননি এবং এই প্রেক্ষিতে 'ছয় দফা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড' হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে আটককারী কর্তৃপক্ষ সঠিক ছিল না। আমার বিজ্ঞ ভ্রাতৃদ্বয় 'ছয় দফা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড' হিসেবে বিবেচনা করেন না এবং তারা এই সিদ্ধান্ত পর্যন্ত দিয়েছেন যে, কেবল ছয় দফা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করাই আটকের জন্য যথেষ্ট- আটককারী কর্তৃপক্ষ এরকম একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই মামলায় বিজ্ঞ ভ্রাতৃদ্বয় রুল চূড়ান্ত (অ্যাবসলিউট) করেন।"
বিচারপতি আবদুল্লাহ আরও অভিমত দেন যে, ''আওয়ামী লীগ দেশে ক্রিয়াশীল একটি রাজনৈতিক দল। তারা ছয় দফা কর্মসূচিকে নিজেদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছে। ছয় দফা কর্মসূচির মূল কথা হলো ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পাকিস্তানের উভয় অংশের জন্য সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া। স্বীকৃতমতেই সরকার কর্তৃক ছয় দফা কর্মসূচি বা দলের কর্মকাণ্ডকে পলিটিক্যাল পার্টিজ অ্যাক্টের ছয় ধারা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের কাছে রেফার করার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে আটককৃত যিনি এই দলের সভাপতি (বঙ্গবন্ধু) তিনি ছয় দফা কর্মসূচিকে জনগণের সামনে তুলে ধরতে গিয়ে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছেন- এটা বলা যাবে না। সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এসব বক্তৃতা সংকীর্ণতা সৃষ্টি করছে। আটককৃত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যাতে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে। দাবি করা হয়, এভাবে আটককৃত পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, যা পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্ট করবে। আমি বক্তৃতাগুলো মনোযোগ সহকারে পড়েছি এবং এরকম কোনো ইঙ্গিত খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছি। প্রতীয়মান হয় যে, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহও ছয় দফা কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করায় আটককৃত ক্ষুব্ধ হয়েছেন এবং সে কারণে পশ্চিম পাকিস্তানি ভ্রাতাদের পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি কথিত যে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে সেই ব্যাপারে উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করেছেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) আরও উল্লেখ করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছাড় দেওয়ার মাধ্যমে জাতীয় পরিষদে প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমতার নীতি থেকে সরে এসেছে। পূর্ব পাকিস্তান কর্তৃক পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে ছাড় দেওয়ার আরও কিছু নজির তুলে ধরেন। তিনি যুক্তি দেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানের উচিত প্রতিদান দেওয়া। তিনি পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে প্রচারণা চালান এবং গত সেপ্টেম্বরের যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের অতি প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। পুরো বক্তৃতার সারমর্ম ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি বা সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ানো নয়, বরং সর্বশেষ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের অতি প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা। এটা সত্য যে, ভাষা প্রায়ই জোরালো, তবে কোনো একটি উদ্দেশ্যের প্রচারমূলক যে কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতায় যা হয় তার বেশি নয়। আমরা বক্তব্যগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত যেতে চাই না, তবে এগুলোর ব্যাপারে সরকারের ব্যাখ্যা যৌক্তিক নয়; এবং এটা এই দাবিকেই সমর্থন করে যে, সরকার বক্তব্যগুলোকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে, যা ইঙ্গিত করে, সরকারের উদ্দেশ্য হলো পলিটিক্যাল পার্টিজ অ্যাক্ট-এর অধীনে ব্যবস্থা না নিয়ে ছয় দফা কর্মসূচিকে বন্ধ করে দেওয়া।"

বঙ্গবন্ধুকে আটকাদেশ দেওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তিনি ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ ঢাকা স্টেডিয়ামের জনসভায় ৬ দফা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ক্ষতিকর বক্তব্য তথা সরকারের সমালোচনা করে পাকিস্তানের নাগরিকদের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বৈরিতা ও ঘৃণার মনোভাব জাগাতে ও জনগণের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। এ প্রসঙ্গে বিচারপতি আবদুল্লাহর পর্যবেক্ষণ হলো- "আটককৃত (বঙ্গবন্ধু) পাকিস্তানের নাগরিকদের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বৈরিতা ও ঘৃণার মনোভাব জাগিয়ে তোলা এবং জনগণের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চেয়েছেন, এটা আটককারী কর্তৃপক্ষের অনুমান মাত্র। বক্তৃতায় ছয় দফা দাবি ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং জনগণের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের কথিত লঙ্ঘনের জন্য বর্তমান সরকারের সমালোচনা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখান থেকে তারা এই অনুমান করেছেন। যদি তাই হয়, তাহলে শুধু একটি বক্তৃতা দ্বারা কোনো যুক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি এই মর্মে সন্তুষ্ট হতে পারেন না যে, আটককৃত কোনো ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড করতে উদ্যত হয়েছেন কিংবা করার সম্ভাবনা রয়েছে।"
১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দাবির সমর্থনে আউটার স্টেডিয়ামে জনসভায় যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তার কারণে তাকে আটকাদেশ দেওয়ার পাশাপাশি পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধিমালার বিধি ৪১ ও ৪৭-এর বিভিন্ন উপবিধি ভঙ্গের অভিযোগে ঢাকার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। বিচারে ম্যাজিস্ট্রেট বিধি ৪৭(৫) ও ৪১(৬) এর অধীনে দোষী সাব্যস্ত করে ১৫ মাসের বিনাশ্রম সাজা প্রদান করেন। আপিলে আদালত সাজা কমিয়ে আট মাস করেন। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন। বিচারপতি আবদুল হাকিম রিভিশন শুনানি শেষে রুল চূড়ান্ত করে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে প্রদত্ত দোষী সাব্যস্ত করার রায় ও আদেশ বাতিল করে খালাস প্রদান করেন।
বিচারপতি আবদুল হাকিম তার রায়ে ৬ দফা ও তার সমর্থনে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা প্রসঙ্গে অভিমত দিয়েছেন যে, "দরখাস্তকারীর বক্তৃতা এই প্রেক্ষাপটেই বিবেচনা করতে হবে যে, বক্তা একটি রাজনৈতিক দল, অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সভাপতি। দলটির ছয় দফা কর্মসূচি সরকার নিষিদ্ধ করেনি কিংবা তা অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি। একটি দলের সভাপতি হিসেবে বক্তা তার কর্মসূচি নিয়ে অগ্রসর হওয়া এবং তার মতামত প্রচার করার অধিকার রাখেন। সাংবিধানিক বিধিবিধান বিবেচনা করলে ছয় দফা কর্মসূচির সমর্থনে কথা বলা এবং দেশের কল্যাণের জন্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করার অধিকার তার রয়েছে। এই মামলায় বক্তা ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানের একটি জনসভায় বক্তৃতা করেছেন এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকার পুনঃপ্রবর্তন, পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ, কেন্দ্রীয় রাজস্ব প্রদেশগুলোতে বিতরণ, প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের আত্মনির্ভরশীলতা ইত্যাদি দাবি জানিয়েছেন। তার জোরালো বক্তৃতায় তিনি অন্যান্য বিষয়েও কথা বলেছেন এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেছেন। পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সমালোচনাও করেছেন এবং কিছু বড় ব্যবসায়ীর নিন্দা করেছেন। নিঃসন্দেহে বক্তা ছয় দফা কর্মসূচি সম্বন্ধে শ্রোতাদের মনে দাগ কাটার জন্য এবং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও উদ্ধত শব্দ ব্যবহার করেছেন। তিনি বেশ কিছু সহিংস শব্দও উচ্চারণ করেছেন এবং মনে হয় উত্তেজনার এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন যে, কোথাও কোথাও তার বক্তব্যের খেই রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু একটা বিষয় পরিস্কার যে, এই বক্তৃতায় এমন কিছু বিষয় উঠে এসেছে, যা তেতো লাগলেও তথ্যগতভাবে সঠিক এবং তা অপ্রীতিকর সত্য।"
৬ দফা সম্পর্কে তৎকালীন ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতিগণের অভিমত ও পর্যবেক্ষণ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, ৬ দফা দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণের অধিকার আদায় ও বৈষম্য দূরীকরণের ন্যায়সংগত ও যৌক্তিক দাবি। 'শেখ মুজিব বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন শুরু করেছে'-পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগী রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও আমলাদের এ অভিযোগ ছিল অসার ও ভিত্তিহীন।

বিচারপতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ এবং সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, বাংলাদেশ