জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে সপরিবারে হত্যা করা হয়। একই ভোরে আরও তিনটি হত্যাকাণ্ডে ঘাতকদের গুলি ও কামানের গোলায় নিহত হন ২৩ জন। ৪৬ বছরেও এসব হত্যার বিচার হয়নি। কবে হবে, তাও কেউ জানেন না।

এই নিহতের মধ্যে রয়েছেন বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি তৎকালীন পানি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি। এসব ঘটনায় পৃথক তিনটি হত্যা মামলা হয়েছে। গত ২৬ বছর ধরে বিচারও চলছে ঢাকার আদালতে। তবে কোনোটিরই বিচার শেষ হয়নি। এরমধ্যে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে গত দুই বছরে এসব মামলার শুনানি হয়নি একদিনও।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, 'যত সময়ই লাগুক, এসব হত্যার বিচার একদিন হবেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতেই এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার করা হবে।'

পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল্লাহ আবু বলেন, হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে দীর্ঘদিন মামলার বিচারকাজ বন্ধ ছিল। পরে ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পর বিচারকাজ শুরু হলেও করোনার কারণে তাও থমকে আছে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নিম্ন আদালতে নিয়মিত বিচারকাজ শুরু হবে। আশা করছি তখন এই তিন মামলার বিচারকাজেও গতি আসবে। রাষ্ট্রপক্ষও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

সেরনিয়াবাত হত্যা: মামলার বিবরণে জানা যায়, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি তৎকালীন পানি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়িতে হামলা চালায় সেনা সদস্যরা। হামলাকারী সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, আজিজ পাশা ও নুরুল হুদা বাসার ভেতরে ঢুকে অস্ত্রের মুখে সব সদস্যকে ড্রয়িংরুমে জড়ো করে। এক পর্যায়ে ব্রাশফায়ার করে আবদুর রব সেরনিয়াবাতসহ আটজনকে হত্যা করে ঘাতকরা।

নিহত অন্যরা হলেন- আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, মেয়ে বেবি সেরনিয়াবাত, চাচাতো ভাই শহীদ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত হাসানাত বাবু (আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে), গৃহপরিচারিকা লক্ষ্মীর মা ও গৃহপরিচারক পোটকা ও আবদুর রহিম খান রিন্টু।

১৯৯৬ সালের ২১ অক্টোবর আবুল হাসানাতের স্ত্রী শাহান আরা বেগম বাদী হয়ে ঢাকার রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় মেজর শাহরিয়ার, মেজর আজিজ পাশা, ক্যাপ্টেন মাজেদ, ক্যাপ্টেন নুরুল হুদা হিরুকে আসামি করা হয়। ১৯৯৭ সালের ৩০ জুলাই ১৫ সাবেক সেনা কর্মকর্তাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আল মামুনের আদালতে বিচারাধীন।

এ বিষয়ে ওই আদালতের প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার দুলাল বলেন, চার্জশিটভুক্ত ১৬ আসামির মধ্যে পাঁচ আসামির মৃত্যুদ এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় অনুসারে কার্যকর হয়েছে। অন্য আসামিরা এখনও পলাতক। করোনার কারণে স্বাভাবিক বিচারকাজ বন্ধ রয়েছে।

শেখ ফজলুল হক মনি হত্যা: মামলার বিবরণে জানা যায়, ২৫-৩০ জনের একটি দল পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শেখ ফজলুল হক মনির ১৩/১ ধানমন্ডির বাসায় আক্রমণ চালায়। ওই সময় তারা খুন করে শেখ ফজলুল হক মনি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনিকে। ১৯৯৬ সালের ২০ নভেম্বর ধানমন্ডি থানায় ১৮ জনকে আসামি করে মামলা হলেও মামলাটির কোনো অগ্রগতি নেই। ওই মামলায় সাবেক উপমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুরসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়। তদন্তের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২০০২ সালের ২২ আগস্ট মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তবে সংশ্নিষ্ট কেউই বলতে পারছেন না মামলাটি এখন কোথায় থেমে আছে।

মোহাম্মদপুরে মর্টার হামলা: পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বিপথগামী সেনা সদস্যরা বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আক্রমণের সময় কামানের গোলা ছুড়লে তা গিয়ে মোহাম্মদপুরে শেরশাহ সুরি রোডের ৮ ও ৯ এবং ১৯৬ ও ১৯৭ নম্বর বাড়ির (বস্তি) ওপর পড়ে। এতে নিহত হন নারী, শিশুসহ ১৩ জন ও আহত প্রায় ৪০ জনের মধ্যে কয়েকজন পুরুষ পঙ্গু হয়ে যান।

নিহতরা হলেন রিজিয়া বেগম ও তার ছয় মাসের মেয়ে নাসিমা, কাশেদা বেগম, ছাবেরা বেগম, সাফিয়া খাতুন, আনোয়ার বেগম (প্রথম), ময়ফুল বিবি, আনোয়ার বেগম (দ্বিতীয়), হাবিবুর রহমান, আবদুল্লাহ, রফিজল, আমিন উদ্দিন আহম্মেদ ও শাহাব উদ্দিন আহম্মেদ।

এ ঘটনায় ৮ নম্বর বাড়ির মালিক মোহাম্মদ আলী বাদী হয়ে ১৯৯৬ সালের ২৯ নভেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০০৬ সালের ১ নভেম্বর এ মামলায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। তবে ১৭ আসামির মধ্যে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

মামলার বাকি ১২ আসামির মধ্যে ১১ জনই পলাতক। জানা গেছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ মারা গেছে। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

বর্তমানে ঢাকার মহানগর চতুর্থ অতিরিক্ত দায়রা জজ নুরুল আমিনের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এ মামলায় ৫৮ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ১৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে।