ধানমন্ডি ৩২-এর ৬৭৭ নম্বর বাড়ি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার শ্রাবণের শেষ দিনে বাড়িটির চারপাশে তখন ভোরের আলো ফুটি ফুটি করছে। ঘড়ির কাঁটা ভোর ৫টার ঘর ছোঁয়নি। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি।

এমনি মায়াবী, মোহময় মুহূর্তে ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটাতে বাড়িটি লক্ষ্য করে দক্ষিণ দিক থেকে শুরু হয় ভয়াল আক্রমণ। ঘাতকের নির্দয় বুলেটের আঘাতে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয় বাংলাদেশ। সপরিবারে শহীদ হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাবা-মা, চাচা, ভাই-ভাবিসহ নিকটাত্মীয়দের হারান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি আড়াই তলা। তিনি সেদিন ছিলেন দুই কক্ষবিশিষ্ট দোতলায়। বিপথগামী সেনাসদস্যদের হামলার খবর পেয়েই তিনি ইন্টারকম টেলিফোনে তার ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মুহিতুল ইসলামকে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন লাগাতে বলেন। কিন্তু সংযোগ হচ্ছিল না। তখন বঙ্গবন্ধু নিজেই তার কক্ষের দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন।

এক পর্যায়ে একঝাঁক গুলি বাড়িটির দক্ষিণ দিকের জানালার কাঁচ ভেঙে অফিস কক্ষের দেয়ালে বিদ্ধ হয়। এরপর অবিরত গুলি আসতেই থাকে। গুলি একটু থেমে এলে দোতলায় নিজের কক্ষে গিয়ে বঙ্গবন্ধু এ আক্রমণের সংবাদ দেন তার মিলিটারি সেক্রেটারি কর্নেল জামিল উদ্দিনকে। খবরটি জানান সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কেএম সফিউল্লাহকেও।

টেলিফোনে কথা বলার পর বন্ধ দরজা খুলে বাইরে আসেন অকুতোভয় বঙ্গবন্ধু। ওই সময়ে মেজর একেএম মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে বিপথগামী সেনাসদস্যরা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে। ওই সময় রাষ্ট্রপতি তার সিঁড়ি বারান্দায় মেজর একেএম মহিউদ্দিনকে চড়া সুরে ধমক দিয়ে এসবের কারণ জানতে চান।

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে মেজর একেএম মহিউদ্দিন খুব ঘাবড়ে যায়। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বঙ্গবন্ধু স্বাভাবিক কণ্ঠে জানতে চান, 'তোরা কী চাস? তোরা কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে? কী করবি? বেয়াদবি করছস কেন?' এরপর তিনি সিঁড়ির কয়েক ধাপ নামতেই নিচের দিকে সাত থেকে আট ফুট দূরে অবস্থানরত দুই ঘাতক মেজর নূর চৌধুরী ও মেজর বজলুল হুদার স্বয়ংক্রিয় স্টেনগান থেকে একের পর এক বেরিয়ে আসে ১৮টি বুলেট। সিঁড়ির ওপর গড়িয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে সিঁড়ি বেয়ে।

সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। ব্রাশফায়ারে বঙ্গবন্ধুর বুক ঝাঁঝরা হয়ে যায়। পেট, পা ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ছিল গুলিবিদ্ধ। একটি গুলি লাগে মাথার পেছন দিকে। ৯টি গুলি চক্রাকারে বুকের নিচে বিদ্ধ হয়। খুনিদের পৈশাচিক নির্মমতা-বর্বরতা ছিল চরম পর্যায়ের। মৃত্যু নিশ্চিত করার পরও তারা বঙ্গবন্ধুর দু'পায়ের গোড়ালির রগ কাটে। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর পরনে ছিল সাদা গেঞ্জি, পাঞ্জাবি এবং সাদা-কালো চেক লুঙ্গি। পাঞ্জাবির পকেটে ছিল চশমা।

এর আগে গৃহকর্মী আবদুর রহমান শেখ রমা তিনতলায় গিয়ে শেখ কামালকে ঘুম থেকে উঠিয়ে সেনা আক্রমণের খবর দেন। তিনি ওপর থেকে নিচে নেমে এলে মেজর বজলুল হুদা তিন থেকে চারজন কালো ও খাকি পোশাকধারী সশস্ত্র সেনাসদস্য পরিবেষ্টিত হয়ে শেখ কামালের পায়ে গুলি চালান। তিনি নিজের পরিচয় দিলে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় তাকে।

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সঙ্গে ছিলেন সুলতানা কামাল খুকু, শেখ জামাল, পারভীন জামাল রোজী, শেখ রাসেল ও বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসের। আবদুর রহমান শেখ রমাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কথা ফজিলাতুন নেছাকে জানান। এ সময় সেনাসদস্যরা দরজা ভাঙার চেষ্টা করলে তিনি 'মরলে সবাই একসঙ্গে মরব'- এ কথা বলে দরজা খুলে দেন।

লে. কর্নেল আজিজ পাশাসহ বিপথগামী সেনাসদস্যরা ফজিলাতুন নেছা, শেখ আবু নাসের, শেখ রাসেল ও আবদুর রহমান শেখ রমাকে সিঁড়ি দিয়ে নিয়ে যায়। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ দেখে ফজিলাতুন নেছা কান্নায় ভেঙে পড়েন। চিৎকার দিয়ে বলেন, 'আমি যাব না। আমাকে এখানেই মেরে ফেল।' কিন্তু সৈন্যরা তাকে দোতলায় তার কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে লে. কর্নেল আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেহ উদ্দিনের গুলিতে শহীদ হন বঙ্গমাতা।

এরপর ঘাতকের বুলেটের আঘাতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন শেখ জামাল, সুলতানা কামাল খুকু ও পারভীন জামাল রোজী। ফজিলাতুন নেছা মুজিবের নিথর দেহটি দরজার পাশে পড়ে থাকে। বাঁ দিকে পড়ে থাকে শেখ জামালের মৃতদেহ। পারভীন জামাল রোজীর মুখে গুলি লাগে। রক্তক্ষরণে বিবর্ণ হয়ে যায় সুলতানা কামাল খুকুর মুখ। সৈন্যরা শেখ আবু নাসের, শেখ রাসেল ও আবদুর রহমান শেখ রমাকে নিচে নামিয়ে আনে। বাথরুমে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয় শেখ আবু নাসেরকে। মৃত্যুর আগে পানি চেয়েও পাননি তিনি।

ভীত-বিহ্বল শিশু শেখ রাসেলকে নিচে নিয়ে আসে আরেক দল সেনাসদস্য। ভয়ে আড়ষ্ট শেখ রাসেল তখন আ ফ ম মুহিতুল ইসলামকে জড়িয়ে ধরে জানতে চায়, 'ভাইয়া, আমাকে মারবে না তো?' তখনই এক সৈন্য শেখ রাসেলকে আলাদা করে ফেলে। রাসেল তার মায়ের কাছে যাওয়ার আকুতি জানায়। এ সময় মেজর আজিজ পাশা এক সৈন্যকে দিয়ে তাকে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতে বলেন। সৈন্যটি তাকে দোতলায় নিয়ে যায়।

সেখানে মায়ের রক্তমাখা মরদেহ দেখার পর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে শেখ রাসেল মিনতি করে, 'আমাকে হাসু (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডাকনাম) আপার কাছে পাঠিয়ে দাও।' কিন্তু সৈন্যদের মন গলেনি। গুলি চালিয়ে রাসেলকে নির্মমভাবে হত্যা করে তারা। গুলিতে তার চোখ বেরিয়ে যায়। থেঁতলে যায় মাথার পেছনের অংশ। শেখ রাসেল ছিল ঘাতকের শেষ শিকার। তাকে খুন করার পর উদ্ধত কণ্ঠে সৈন্যরা তাদের কর্মকর্তাদের জানায়, 'স্যার, সব শেষ।'

কলঙ্কিত এই হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর কাছে আবদার করেছিলেন, তিনি বিদেশে যাবেন না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'মা তুই যা। জামাইয়ের (প্রয়াত পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ মিয়া) অসুবিধা হচ্ছে। সঙ্গে রেহানাও যাক।' পিতার কথার অবাধ্য হননি তারা। এ কারণেই ১৫ আগস্ট বেঁচে যান দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। এখন স্বজন হারানোর অশেষ শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে পিতার অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তথ্যসূত্র: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের প্রকাশনা, শেখ হাসিনা ও বেবী মওদুদ সম্পাদিত '১৫ আগস্ট ১৯৭৫'