আজ ১৫ আগস্ট। বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অর্জন করে তার স্বাধীনতা। উপমহাদেশের হাজারো বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বাঙালি তার জাতিরাষ্ট্র গঠন করে। যে মহাপুরুষ এই অবহেলিত, নির্যাতিত এবং অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তিনি আর কেউ নন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবের জন্ম। গোপালগঞ্জে স্কুলজীবন শেষে ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে। মানুষের অধিকার আদায়ের দাবিতে স্কুলজীবনেই তার সোচ্চারিত হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত ছিল। প্রতিবাদের এই অবস্থান থেকে তার ভূমিকা পরবর্তীতে কোনো সময় পিছিয়ে থাকেনি। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ জীবনে তিনি তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের স্নেহভাজন হয়ে ওঠেন। তার চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সাহসিকতা তাকে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করে। ভারত বিভক্তির আন্দোলন-সংগ্রামে কলকাতার বাঙালি মুসলিম সমাজে শেখ মুজিব ছিল একটি গ্রহণযোগ্য নাম। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভক্তি শুরু হয়েছিল, তার ফলাফলে গঠিত হয় পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্র। সম্প্রদায় রূপান্তরিত হয় জাতিতে। যুগ যুগ ধরে সহাবস্থানে থাকা পরিবারগুলো সবাই হঠাৎ আপন থেকে যেন পর হয়ে গেল। সেদিনকার অসহায় জনগোষ্ঠীর হৃদয়বিদারক কান্না রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কানে পৌঁছাতে পারেনি। নিঃস্ব হয়ে মাতৃভূমি ছেড়েছিল লাখো অসহায় পরিবার।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় শেখ মুজিবের নতুন শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবন। যে আশা এবং উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠী শুরুতেই তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। চাপিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রভাষা উর্দুকে ঘিরে শুরু হয় বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াই। দীর্ঘ এই আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণে শেখ মুজিবের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। যুবনেতা থেকে রাজনৈতিক দলীয় প্রধান। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এক পর্যায়ে বাঙালি জাতির মুখপাত্র হয়ে দাঁড়ায়। '৫২-এর ভাষা আন্দোলন, '৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, '৬৩-এর রবীন্দ্রচর্চা আন্দোলন, '৬৪-এর সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন, '৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন এবং '৬৯-এর গণআন্দোলন বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখায়। পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের চক্রান্তে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন শেখ মুজিব। রাষ্ট্রদ্রোহের এই ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে পূর্ব বাংলার সমগ্র জনগোষ্ঠী। রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল বাঙালির রক্তে। গণআন্দোলনে পাকিস্তান সরকার এই আগরতলা মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য হয়েছিল। জাতির কাছে শেখ মুজিব হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির একক এবং অদ্বিতীয় নেতা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে পাকিস্তান আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় এবং প্রাদেশিক সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। স্বায়ত্তশাসনের নতুন স্বপ্নে বুক বেঁধেছিল বাংলার মানুষ। নির্বাচন ফলাফল যে বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশান্বিত করেছিল, পাকিস্তানের সামরিক জান্তার ষড়যন্ত্রে স্বল্প দিনেই তা নিরাশায় পরিণত হয়। নির্বাচনের এই ফলাফল অগ্রাহ্যের মধ্য দিয়ে কোনো আলোচনা ছাড়াই স্থগিত করা হয় ৩ মার্চের জাতীয় সংসদের অধিবেশন। সামরিক শাসকদের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শুরু হয় দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন। ৭ মার্চ '৭১ ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানের এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির এবং স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের দলীয় নির্দেশে চলতে শুরু করে পূর্ব বাংলার সব অফিস আদালত। অচল হয়ে পড়ে প্রশাসনের সব কর্মকাণ্ড। প্রশাসনের সব স্তরের বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই সংহতি হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসে বর্তমান দিন পর্যন্ত একটি দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এই অচলাবস্থায় সামরিক শাসকরা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। রাজনৈতিক আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণের মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে দুই ডিভিশন সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে স্থানান্ত্মরিত হয়। নগণ্য থেকে পূর্ব পাকিস্তানে শক্তিশালী হয়ে ওঠে পাঞ্জাবী সামরিক বাহিনীর অবস্থান। আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অজান্ত্মে ২৫শে মার্চ '৭১ সন্ধ্যায় পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি দেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এই মধ্যরাতেই হায়েনার মত নিরীহ বাঙ্গালীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী। ২৬শে মার্চ '৭১ এর প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরল্ফম্ন হয় বাঙ্গালীর মুক্তির লড়াই। বন্দী অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্ত্মরিত করা হয়। এই সংকটকালীন মুহুর্তে বাংলার অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল ভারতের সরকার ও জনগণ। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে গঠিত হয় বাংলাদেশ সরকার। কার্যকরী অবস্থান নিয়ে সংগঠিত হয় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী। বাংলাদেশ সরকারের কর্মদক্ষতা এবং মিত্র বাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে ১৬ই ডিসেম্বর '৭১ বাংলাদেশ শত্রল্ফম্নমুক্ত হয়। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ৯০ হাজারের অধিক সদস্য আত্মসমর্পণ করে। আন্দোলন-সংগ্রাম এবং এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যদিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে জন্ম নেয় একটি জাতিরাষ্ট্র। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শত্রল্ফম্নভূমি পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে ১০ই জানুয়ারী '৭২ বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবন সংগ্রামে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছেন। পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর দেশটির বুকে চেপে বসেছিল। একের পর এক সামরিক শাসনের যাঁতাকলে জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। বাস্তবে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে গণতন্ত্রের সুবাতাস কখনও ছিল না। পশ্চিমা হায়েনাদের হিংস্র নখেরাঘাত এবং দেশীয় সরীসৃপের বিষাক্ত ছোবলে বাঙালি জাতি ছিল অধিকার বঞ্চিত, নির্যাতিত এবং নিষ্পেষিত। জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রেই সৃষ্টি হয়েছিল বৈষম্যের পাহাড়। বঙ্গবন্ধু সব সময়ই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন এবং তিনি নিরপেক্ষ, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান সিয়াটো ও সেন্টো বা বাগদাদ চুক্তিতে যোগদান করে সার্বিকভাবে প্রবেশ করে মার্কিন বলয়ে। বঙ্গবন্ধু এই সময় পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই সামরিক চুক্তির বিরুদ্ধে যুক্ত বিবৃতি প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রচিন্তা ও চেতনায় ছিল নিরপেক্ষ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি অঙ্গীকারবদ্ধ করা হয়েছে।

বাঙালি কোনো সময় স্ব-শাসিত হয়নি। হাজারো বছর এই বাংলা-বাঙালি সব সময় বহিরাগতদের দ্বারা শাসিত এবং শোষিত হয়েছে। গোষ্ঠী চরিত্রে কোথাও যেন শাসকের মানসিকতার অভাব ছিল বলে অনেকেই ধারণা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রথম বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সফলতা পেয়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থায় শুরু হয়েছিল একটি জাতির নবযাত্রা। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে পুনর্বাসন ও প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন ছিল সময়ের দাবি। পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তা-সেতু নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনসহ জরুরি খাদ্যশস্য সহযোগিতার বিষয়টি ছিল অগ্রগণ্য। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে এই সময় সহযোগিতা নিয়ে ভারত-রাশিয়াসহ অনেক বন্ধু দেশ এগিয়ে আসে। রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রায় সব অংশ ধীরে ধীরে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে শুরু করে। ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব সময়কালের প্রায় সব বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারী রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে এবং সেনাবাহিনীতে সমন্বিত হয়। বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক বিশ্বাস ছিল স্মরণকালে বাঙালি এই প্রথম তার জাতিরাষ্ট্র পেয়েছে। সেখানে আর বিভক্তি কেন। সব বাঙালির ঠিকানা এই বাংলাদেশ। অসহযোগ আন্দোলন সময়কালে সব স্তরের সরকারি, আধা সরকারি এবং বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পালন করেছে। দেশ গঠনেও এখন সবাই তার পেছনে এসে দাঁড়াবে। হাতে হাত মিলিয়ে সবাই একসঙ্গে চলবে। এমনি এক বিশ্বাসে এবং সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের সব কার্যক্রম পরিচালনায় সমন্বিত হয় প্রায় সব স্তরের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরা। ১৯৭২-৭৩ সময়কালে পাকিস্তান থেকে আগত সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিবর্গের অধিকাংশই একই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ হয়ে ওঠে। যদিও মুক্তিযুদ্ধ সময়কালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা যাচাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক চারটি স্ট্ক্রুটিনি কমিটি গঠিত হলেও বাস্তবে তা খুব কার্যকারিতা পায়নি।

৯ মাসে পদ্মা-যমুনার পানি অনেকদূর গড়িয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সবাই যেমন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না, ঠিক একইভাবে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তান সরকারে কর্মরত থাকা সব কর্মকর্তা-কর্মচারী বঙ্গবন্ধুর এই আদর্শের বিরোধীও ছিলেন না। বাস্তবে স্বাধীনতা-পরবর্তীতে ব্যক্তির এই বিশ্বস্ততা নিরূপণের বিষয়টি সব সময় মূল্যায়নের বাইরে থেকে গেছে। তথ্যানুসন্ধানে বর্তমানে অনেক গবেষকের জিজ্ঞাস্য, যদি '৭১-এর যুদ্ধে ভারত পাকিস্তানের কাছে পরাজিত হতো, তাহলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিবর্গের অবস্থা কী হতে পারত? প্রবাসী সরকার এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে ভারত সরকারের সহযোগিতা এবং ভূমি ব্যবহারের বিষয়টি কতটুকু সম্ভবপর ছিল? অপরদিকে পাকিস্তানের বিজয়ে সরকারের পক্ষ অবলম্বনকারী বাঙালি সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কতভাবে পুরস্কৃত হতে পারতেন? মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে হয়তো এটি একটি বড় গবেষণার বিষয় বলে অনেকেই ধারণা করেন। নতুন প্রজন্মের গবেষকরা হয়তো তাদের পূর্বপুরুষের গর্বিত ইতিহাসের সন্ধানে এসব বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন করবে।

দেশ গঠনে বঙ্গবন্ধু অনেকাংশে সফলতা পেয়েছিলেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প গৃহীত হয়েছিল। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও বৈষম্য দূর করার জন্য গ্রহণ করা হয়েছিল নানান কর্মসূচি। একই সময়ে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, ইসলামী সম্মেলনে যোগদানের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর একটি শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তার বাংলায় ভাষণ বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক অবস্থানে উন্নীত করে। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। মাত্র এক বছরে দেশের সংবিধান প্রণয়ন এবং দুই বছরের মধ্যে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় দেশে সাধারণ নির্বাচন প্রদান ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।

বাঙালি জাতি নতুন এক স্বপ্ন ও আশা নিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সফলতা পেলেও স্বাধীনতা-পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও '৪৭-এর দেশভাগের মুসলিম জাতীয়তাবাদ এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে সার্বিক সমন্বয় গড়ে ওঠেনি। বিভক্তি দেখা দেয় সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন স্তরে। ধীরে ধীরে ঢিলে হতে থাকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের প্রশাসনিক কাঠামোর বন্ধন। মানবসৃষ্ট খাদ্যাভাব, তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আন্দোলনসহ নানাবিধ বিচ্ছিন্ন ঘটনা এই সময় রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আঘাত করে। সুযোগ পেয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক শত্রুদের হাতের পুতুল হয়ে ওঠে দেশের কিছু রাজনীতিবিদ এবং সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা। রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নিয়োগপ্রাপ্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অগোচরেই থেকে যায় ষড়যন্ত্রের সব পরিকল্পনা। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মধ্যে বিপথগামী সামরিক বাহিনীর একদল ঘাতকের হাতে সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) এবং শেখ রেহানা দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে সেদিন রক্ষা পেয়েছিলেন ঘাতকদের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড থেকে।

আজ শোকাবহ আগস্টের সেই দিন। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এই দীর্ঘ সময়ে অনেকবার দেশ ও জাতিকে বিপথগামী করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে '৪৭-এর দেশভাগের মুসলিম জাতীয়তাবাদকে পুনঃস্থাপিত করার চেষ্টা হয়েছে। বিকৃত তথ্য সংযুক্তি দিয়ে লিখিত হয়েছে জাতির ইতিহাস। হত্যাকারীদের বিচার থেকে রেহাই দিয়ে জারি করা হয়েছিল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। আজ দেরিতে হলেও সেই অধ্যাদেশ বাতিলের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কয়েকজনের দণ্ডাদেশও কার্যকর করা হয়েছে। ঘাতকরা জাতির পিতাকে হত্যা করলেও বাঙালির হৃদয় থেকে তাকে মুছে ফেলতে পারেনি। তাই এখনও তার আদর্শ ও স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। এখনও তার নামেই হয় মুক্তির জয়ধ্বনি। আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তার সফল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃত। জাতীয় উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশের অবস্থান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আজ বাংলাদেশ সমাদৃত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে দেশ-জাতি এগিয়ে যাবে- এটাই সবার কাম্য।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

বিষয় : এএসএম সামছুল আরেফিন

মন্তব্য করুন