২ ফেব্রুয়ারি চলে গেল কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের জন্মদিন। এবারের জন্মদিনটি তার অন্যান্য জন্মদিনের চেয়ে আলাদা। যারা তার সাহিত্যের অনুরাগী ও তার ব্যক্তিসত্তার ভক্ত ছিলেন, তারা এতদিন হাসান আজিজুল হককে ফোনে কল করে কিংবা পত্রপত্রিকায় লিখে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে আসছেন। আমি রাজশাহী থাকতে দেখেছি, শহরে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্মদিন উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো, স্যার উপস্থিত থেকে সহাস্যে সকলের শুভেচ্ছা গ্রহণ করতেন। রাজধানী থেকে লেখক-সম্পাদকরা কল করে শুভেচ্ছা জানাতেন। তিনি ক্লান্তিহীন সকলের সঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু এবার আর তার মোবাইল কিংবা ল্যান্ডফোনটি বেজে ওঠেনি। আমার মতো কেউ কেউ হয়তো মোবাইলটি হাতে নিয়ে বসে থেকেছেন নির্বাক। মোবাইলের ওপাশ থেকে সেই হাসিমাখা গীতল কণ্ঠ আর শোনা যাবে না। তিনি এখন কথা বলেন নৈঃশব্দে, অন্তহীন মৌনতায়।
গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রয়াত হয়েছেন হাসান আজিজুল হক। বাংলা ছোটগল্পের পালাবদলের অন্যতম প্রধান লেখক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তাকে। ষাটের দশকের শুরুতে 'শকুন' গল্পটি লিখে তিনি দুই বাংলার লেখক ও সাহিত্যবোদ্ধাদের চমকে দেন। এরপর ১৯৬৪ সালে 'সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য' ও ১৯৬৮ সালে 'আত্মজা ও একটি করবী গাছ' প্রকাশের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন আমাদের ছোটগল্পের অন্যতম প্রধান ভাষ্যকার। এ দুটি বই লিখেই তিনি ১৯৭০ সালে পেয়ে যান বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। তার গল্পগ্রন্থ মোট ১০টি : 'সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য', 'আত্মজা ও একটি করবী গাছ', 'জীবন ঘষে আগুন', 'নামহীন গোত্রহীন', 'পাতালে হাসপাতালে', 'আমরা অপেক্ষা করছি', 'রোদে যাবো', 'মা-মেয়ের সংসার', 'বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প' এবং 'রাই কুড়িয়ে বেল'।
ছোটগল্পের পাশাপাশি তিনি তিনটি উপন্যাস লিখেছেন : 'শামুক', 'আগুনপাখি' ও 'সাবিত্রী উপাখ্যান'। 'শামুক' লিখেছিলেন পঞ্চাশের দশকে, গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে। 'আগুনপাখি' ও 'সাবিত্রী উপাখ্যান' প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ২০০৬ ও ২০১৩ সালে। বিষয়বস্তুর দিক থেকে তার উপন্যাস তার ছোটগল্পেরই সম্প্রসারণ। হাসান আজিজুল হক আখ্যানপ্রধান কথাসাহিত্যিক। তার কথাসাহিত্যের ধারাটি বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যগত এবং আগে-পরে জনপ্রিয়। কিন্তু তিনি সেই প্রচলিত গল্পের ধারাকে আরও সমৃদ্ধ ও সম্প্র্রসারিত করেছেন। নিজের একটি সিগনেচার তৈরি করেছেন ভাষা ও বিষয়বস্তুতে। বাংলাদেশের দেশভাগের সাহিত্যের স্বরূপ তিনি উন্মোচন করেছেন। এই বঙ্গের গণমানুষ ও প্রান্তিক মানুষ, দাঙ্গা, খরা, দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা, মুক্তিযুদ্ধ, রাঢ়বঙ্গের প্রকৃতি এসবই তার ছোটগল্পে ফটোগ্রাফিকভাবে চিত্রিত হয়েছে। হাসান আজিজুল হক নিজেই দেশভাগের মর্মন্তুদ ইতিহাসের প্রটাগনিস্ট। ফলে তিনি হয়ে উঠেছেন দেশভাগপরবর্তী অখণ্ড বাংলা ও উপনিবেশ-উত্তর বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর।
অবিভক্ত ভারতের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে তার জন্ম। এই যবগ্রামই তার সাহিত্যের কেন্দ্রীয় ভূমি। স্মৃতিতে তিনি বারবার ফিরে গেছেন এখানে। স্মৃতি থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, ততই নির্মোহ থেকে, ততই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় নিজেকে। তাই তো তিনি সত্তর বছর বয়সে এসে আলাদা করে লিখতে শুরু করলেন তার শৈশব-কৈশোর নিয়ে। গল্প লেখা প্রায় ছেড়ে দিয়ে লিখলেন চার খণ্ডে আত্মস্মৃতি ও স্মৃতিকহনমূলক গ্রন্থ : 'ফিরে যাই ফিরে আসি', 'উঁকি দিয়ে দিগন্ত', 'এই পুরাতন আখরগুলি' ও 'দুয়ার হতে দূরে'। বাংলা ভাষায় আত্মজীবনীমূলক সাহিত্যে সেও এক অমর সৃষ্টি।
হাসান আজিজুল হকের স্মৃতিকথা মূলত সেলুলয়েড-পর্দায় সমান্তরালে দুটি চরিত্রের গল্প উপস্থাপনের মতো। একদিকে ১৯৪০-এর দশকের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে বেড়ে উঠছে একটি কিশোর। জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান যা পাচ্ছে তাই লুটেপুটে খাচ্ছে সে। একটু বোকা, একটু খেয়ালি, একটু বেখেয়ালি, একটু নির্জীব, একটু ডানপিটে স্বভাবের সেই কিশোরের অল্প অল্প করে বেড়া ওঠার গল্প শোনাচ্ছেন কিশোরের সময় থেকে প্রায় ষাট বছর ছিটকে অন্য এক দেশে (রাজশাহী, বাংলাদেশ) বসে যেন অন্য এক মানুষ। তিনি দর্শনের অধ্যাপক। সমাজ, ইতিহাস এবং রাজনীতিসচেতন লেখক। তার ভেতর ভর করে ওই কিশোর সব লিখিয়ে নিচ্ছে, যেন কিশোরের সঙ্গে তার সম্পর্ক জাতিস্মরের মতো কোনো এক জন্মে। তবে সম্পর্কটা আর এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়, কেননা পাঠক যখন পড়ছে তখন দুটি চরিত্রই দুই প্রেক্ষাপটে সমসাময়িক হয়ে উঠেছে। পর্দায় পালা করে দু'জনকে দেখা যাচ্ছে। দু'জনকে যেমন মেলানো যাচ্ছে তেমন আলাদাও করা যাচ্ছে।
স্মৃতিকথার প্রথম পর্ব 'ফিরে যাই ফিরে আসি' এ কালের হাসান গুরুত্বপূর্ণ এক কথা দিয়ে শুরু করেছেন : 'স্মৃতিকে কতটা পিছনে নেওয়া যায়, নিশ্চয়ই চেতনার পিছনে নয়। আমার ধারণা শুধুমাত্র চেতনাতেও স্মৃতি নেই, যদি থাকেও তা আধো অন্ধকারেই ডুবে থাকে। আত্মচেতনা থেকেই স্মৃতির শুরু। জন্মের পর থেকে চেতনা আছে, গূঢ় রহস্যময় চেতনা কিন্তু স্মৃতি নেই। চেতনা-আত্মচেতনার মাঝখানের সান্ধ্য জায়গায়টায় অনেকবার ফিরে ফিরে যেতে চেয়েছি। তাই ফিরে যাই, ফিরে আসি।'
কী চমৎকার বলে দিলেন, আত্মচেতনা থেকেই স্মৃতির শুরু।
কিশোর হাসান শুধু নিজের জগৎটাই দেখে না, ফাঁকি দিয়ে অন্যদেরটাও দেখে নেয়। গাছে উঠে পাখিদের ডিম ভেঙে দেওয়া, জলে লাফ দেওয়া, বুনোসুতার শাদাফুল, তার মিষ্টি গন্ধ, শরতের একগাদা তারা- এগুলো তার নিজস্ব জগৎ। হিন্দু-মুসলিমের পীর মানত, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ দ্বিখণ্ডিত হওয়া, দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ- এগুলো তখন অন্যদের জগৎ। সেই জগতের সব মারপ্যাঁচ বুঝে উঠতে না পারলেও খালি চোখে দেখে গেছে। এখন যে হাসান তার শব্দবুননের মাধ্যমে আমাদের ইতিহাস পাঠ করিয়ে চলেছেন তার রসদ জোগাড় করেছিল সেদিনের সেই কিশোর হাসান। একটা হাহাকারের ভেতর বেড়ে ওঠা তার। উদার প্রকৃতি-মাতা কী এক অজানা কারণে রাঢ়বঙ্গের প্রতি নাখোশ ছিলেন। হাসানের ভাষায় : 'হতচ্ছাড়া গাঁ আমাদের। দেখতে একটুত ভালো না। সব কিছুর টানাটানি, না কি আছে ছাই এই গাঁয়ে? ভালো কুলগাছ, পেয়ারাগাছ, জামগাছ নেই। একটু সবুজ খুঁজে পাওয়া যে কী মুশকিল এখানে? সব ধুলোয় ভরা। খাবার কি জোটে কপালে? আমরা তাই ভাত খাই আর ডাল খাই। ডাল খাই আর ভাত খাই। ... আর কিছু পাওয়া যায় না। মোটা ভাত, মোটা খাওয়া একটা ফল পাই না যে চুষি, একটা ফুল পাই না যে তার রং দেখে খানিকটা সময় কাটাই, গন্ধ শুঁকি। এমন খালি আমাদের দেশ। আর আকাশ যেন স্কেলের গায়ে পেন্সিল ঘষা। ধুলো আর ধোঁয়া লেপা।'
এই আপাত হতচ্ছাড়া প্রকৃতির অকৃত্রিম মায়া তিনি ভোলেননি। স্মৃতি দিয়ে আগলে রেখেছেন, প্রয়োজনে বিনির্মাণ করেছেন। যে ভাঙনের ইতিহাস তাকে সরিয়ে নিয়েছে পিতৃমাতৃভূমি থেকে, সেই ইতিহাসকে তিনি দেখতে চেয়েছেন অতল থেকে। তাই তো সৃজনশীল সাহিত্যের পাশাপাশি রচনা করেছেন চিন্তাশীল প্রবন্ধ। সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা, রাজনীতি, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে তিনি বিপুল মননশীল প্রবন্ধ লিখেছেন।
তার কথাসাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক পরিচয়ের মাঝে চাপা পড়ে গেছে তার আরও এক সুকীর্তি। তিনি বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ এক শিশুসাহিত্যিক। গল্প-প্রবন্ধের মতো এখানে তার সৃষ্টি বিপুল নয়। মাত্র দুটি বই লিখেছেন শিশুদের জন্য : 'লাল ঘোড়া আমি' ও 'ফুটবল থেকে সাবধান'। 'লাল ঘোড়া আমি' একটি উপন্যাসিকা বা বড়গল্প। অন্যটি একটি গল্পগ্রন্থ, সাতটি ক্ষীণকায় গল্প আছে এখানে। হাসানের অন্য কোনো লেখায় যে শিশু-কিশোরের উপস্থিতি ঘটেনি তা কিন্তু নয়। তার বিখ্যাত 'শকুন' গল্পটির কথা এ ক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে- 'কয়েকটি ছেলে বসে ছিল সন্ধ্যার পর। তেঁতুলগাছটার দিকে পিছন ফিরে। খালি গায়ে ময়লা হাফশার্টকে আসন করে। গোল হয়ে পা ছড়িয়ে গল্প করছিল।' কয়েকটি কৌতূহলী কিশোরের একটি শকুনকেন্দ্রিক সন্ধ্যা ও রাত্রি যাপনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় পুরো গল্প। শেষ অবধি সেখান থেকে যে সত্য বের হয়ে আসে, সে সত্যের নাগাল শিশু-কিশোররা পায় না। এ ছাড়া গল্পটিতে গদ্যের গাঁথুনি, শব্দের সংস্থাপন, উপমার উপস্থাপন কোনোকিছুই শিশু-কিশোর উপযোগী নয়। তাই শেষতক গল্পটি হয়ে ওঠে একটি সিরিয়াস বড়দের গল্প। 'শকুন' গল্পের কিছুকাল পরেই রচনা করেন 'একটি আত্মরক্ষার কাহিনী' গল্পটি। কিশোর রেজার বয়ঃসন্ধিকালের মানসিক ও শারীরিক যে টানাপোড়েন তার উপস্থিতি ঘটেছে এই গল্পে। গল্পটি যথার্থ কিশোর উপযোগী গল্প হয়ে উঠেছে। পরের বছর রচনা করেন আরও একটু গভীর জীবনবোধ সর্বস্ব 'সারাদুপুর' (১৯৬৪) গল্পটি। কাঁকন নামক নিঃসঙ্গ এক কিশোরের আত্মোপলব্ধির গল্প এটা। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে ওঠে তার হাহাকার, হতাশা ও জীবন সম্পর্কে কৌতূহল। অগ্রগণ্য আলোচকদের পাশাপাশি লেখক নিজেও হয়তো এটাকে বড়দের গল্প হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। হাসান আজিজুল হক আত্মজীবনী লিখেছেন, সেখানেও একজন শিশু ও কিশোর হাসান আজিজুল হকের জীবনবৃত্তান্ত বিধৃত হলেও সেটা মূলত বড়দের জন্যই লেখা। সেই হিসাবে পরিকল্পনা করে শিশুদের জন্য লিখেছেন উল্লিখিত দুটি বই। শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় 'লাল ঘোড়া আমি' (১৯৮৪)। এটি একটি ঘোড়ার আত্মজৈবনিক উপন্যাস। এ ধরনের বইকে ইংরেজিতে 'ভরপঃরড়হধষ ঢ়ড়হু নড়ড়শ' বলা হয়। ঘোড়াটি নিজেই বলে চলেছে তার আত্মকথা। হাসান আজিজুল হক এখানে একটি ঘোড়ার মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন, অর্থাৎ তিনি এখানে ঘোড়ার চোখ দিয়ে পৃথিবীর প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎ প্রত্যক্ষ করছেন। আর প্রত্যক্ষ করছেন মানুষ। হাসান আজিজুল হক খানিকটা শিশু-কিশোরের অবস্থানে নেমে এসে এবং কিছুটা নিজের অবস্থানে অবস্থান করে তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন মানুষের ভেতরকার নোংরামির কথা। মানুষের ভেতর-বাহির নেড়েচেড়ে ওলটপালট করে দেখিয়ে দিচ্ছেন মানুষ হওয়ার যন্ত্রণাটা আসলে কোথায়। এইদিক থেকে গল্পটি একটি সোশ্যাল-পলিটিক্যাল এলিগরি। ঘোড়াটি এমন একটি শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে যে শ্রেণির মানুষ সামাজিক ও রাজনৈতিক সবদিক থেকে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাদের সবকিছুই সহ্য করতে হয় নীরবে।
এভাবে হাসান আজিজুল হক তার সমগ্র সাহিত্যে আমাদের ইতিহাস, মন ও মননের দিশা অন্বেষণ করেছেন। তার অনুসন্ধান হয়ে উঠেছে একটি জাতিগত অনুসন্ধান। এই কারণে তার পরবর্তী প্রজন্মের লেখকরা জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে তার সাহিত্য ও চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। আমাদের সাহিত্যের ঐতিহ্য এবং বাংলার ইতিহাস ও সমাজ সম্পর্কে সচেতন করে তোলার জন্য তার গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ তরুণ লেখকদের স্কুলিংয়ে কাজ করতে পারে।
মৃত্যুর পর প্রথম জন্মদিন। তার এই সশরীরে আমাদের সামনে না-থাকা, তার সৃষ্টিকে আরও প্রবলভাবে আমাদের পাঠ ও অনুধ্যানের বিষয় করে তুলেছে। আমরা এখন হাসান আজিজুল হককে ধারণ করব আমাদের পাঠ ও চর্চায়। যেভাবে তিনি তার ব্যক্তিগত স্মৃতিকে সৃষ্টির প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেছেন, আমরা, তার উত্তর প্রজন্মের লেখকরাও, তার স্মৃতিকে সেভাবে বহন করতে চাই।
শুভ জন্মদিন স্যার। আপনার প্রতি শ্রদ্ধা অনিঃশেষ।