বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশ গত বছরের তুলনায় ১০ ধাপ পিছিয়েছে। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে গত মঙ্গলবার রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) চলতি বছরের এই সূচক প্রকাশ করে। সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম (স্কোর ৩৬ দশমিক ৬৩)। সূচকে সবার শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে।

২০২১ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫২তম। আর ২০২০ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫১তম। অর্থাৎ গত দুই বছরের সূচকেও বাংলাদেশের এক ধাপ করে অবনতি হয়েছিল। আর অবনতির জন্য বিদ্যমান আইন কাঠামোকে দায়ী করছেন দেশের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ বিশিষ্টজন।

তাদের মতে, গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন কিছু আইন রয়েছে, যা নানাভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করছে। সাংবাদিক, সোর্স, হুইসেল ব্লোয়ারসহ গণমাধ্যম-সংশ্নিষ্টদের নিরাপত্তার বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত। এসব বিষয়ে কোনো আইন নেই। আবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট, মানহানিসহ সংশ্নিষ্ট যেসব আইন রয়েছে, তাও সমন্বিত নয়। নানাবিধ আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে সব সরকারের আমলেই সাংবাদিকদের হয়রানি করা হচ্ছে। গণমাধ্যমের স্ব্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সংস্কার হওয়া প্রয়োজন।

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, 'সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় যদি চায়, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংস্কারের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। এই আইনের যাতে অপপ্রয়োগ না হয়, সেদিকেও আমরা সচেষ্ট রয়েছি।'
তবে বাংলাদেশের গণমাধ্যম সূচক নিয়ে 'আরএসএফ'-এর প্রতিবেদন বিদ্বেষপ্রসূত ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

তিনি বলেছেন, যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্রমাগতভাবে বিদেশে অপপ্রচার চালাচ্ছে, সেসব সূত্র থেকে আরএসএফ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। নিজেরাও বাংলাদেশের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে যে রিপোর্ট দেয়, সেটির কোনো মূল্য নেই।
অবশ্য আরএসএফের প্রতিবেদনকে এড়িয়ে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মনজুরুল আহসান বুলবুল। তিনি সমকালকে বলেন, 'প্রতিবেদনটি দেশের জন্য লজ্জাজনক, দুঃখজনক। আমরা গণমাধ্যম সূচকে ১০ ধাপ পিছিয়েছি। কিন্তু এখন এটাকে প্রত্যাখ্যান করলাম বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এই প্রতিবেদনের মধ্যে অনেক বিশ্নেষণ আছে। সেটা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এর জন্য শুধু সরকার দায়ী নয়; রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের বাইরে যেসব শক্তি আছে, সেসবও দায়ী। এগুলোকে চিহ্নিত করে সূচকের উন্নতির জন্য যার যা দায়িত্ব, তা পালন করতে হবে।'

প্রতিবেদন বিশ্নেষণ করে তিনি বলেন, প্রতিবেদনে যে চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে বাংলাদেশের গণমাধ্যম সূচকের অবনতি দেখানো হয়েছে, সেগুলোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। দেখা যায় রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রধানত এই অবনতির জন্য দায়ী। রাজনৈতিক সূচকের অবনতি ধারাবাহিকভাবে হয়েছে। সব সরকারের আমলেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও দলীয় অঙ্গসংগঠন-সমর্থকরা গণমাধ্যমের ওপর চড়াও হয় নানাভাবে। সেটি বর্তমান সরকারের সময়েও হয়েছে।

অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে ইতিবাচক কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভালো হওয়ার জন্য ধনিক শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে এবং তাদের অনেকেই গণমাধ্যমের মালিক হয়েছেন। এখন তারা গণমাধ্যমগুলোকে নিজেদের প্রভাবের জন্য এবং মুনাফা অর্জনের জন্য ব্যবহার করেন। মালিকরা নানাভাবে সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখেন এবং যার প্রভাব গণমাধ্যমগুলোর সম্পাদকীয় নীতিমালার মধ্যে পড়ে। তাই প্রতিবেদনটি বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, এখানে রাষ্ট্র দায়ী নয়। রাষ্ট্রের বাইরে শক্তি, অর্থাৎ মালিকের স্বার্থগত বিষয় কাজ করেছে।

তৃতীয় মানদণ্ড, অর্থাৎ সামাজিক সূচকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু যারা, তাদের নিয়ে ভালো, অর্থাৎ মৌলিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় না। এর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, এটি ঢালাওভাবে বলা হয়েছে। বাংলাদেশে যথেষ্ট ভালো প্রতিবেদন করা হয়। প্রতিবেদনে সোশ্যাল মিডিয়া, অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় অংশ জঙ্গি-জিহাদিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটিও রাষ্ট্রীয় শক্তির কোনো দোষ নয়। তবে অদক্ষতাবশত রাষ্ট্র এটিকে মোকাবিলা করতে পারছে না।

তিনি আরও বলেন, 'চতুর্থ মানদণ্ড হলো আইনি সূচক, সেটি হলো ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট। এই আইনের আওতায় গত ২৬ মাসে প্রায় ৯০০ মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ১৪ ভাগ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। অধিকাংশ মামলাই করেছে সরকারদলীয় সমর্থকরা। কাজেই এ আইনের অপপ্রয়োগের ফলে সাংবাদিকরা নিগৃহীত হচ্ছেন। এখন এই চারটি সূচক বিশ্নেষণে দেখা যায়, সরকার ও সরকারি দল, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের বাইরের শক্তি সবই সূচকের অবনতির জন্য দায়ী। এ জন্য সরকার, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল যার যা দায়িত্ব- তা পালন করতে হবে। তাহলেই এর থেকে আমাদের পরিত্রাণ হতে পারে।'

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক সমকালকে বলেন, 'সাম্প্রতিককালে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সার্বিকভাবে আরও ক্ষুণ্ণ হয়েছে। ১৮০টি দেশের মধ্যে আমাদের ১৬২তম অবস্থান অত্যন্ত লজ্জাস্কর। আরও ধ্রুব সত্য, বিশ্বে দু-তিনটি দেশ ছাড়া (চীন-সিঙ্গাপুর) গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে কোনো দেশেরই উন্নয়ন হয়নি। গত কয়েক দশকে অন্তত শখানেক দেশ গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই প্রচেষ্টা চালিয়েছে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে দেশগুলো ব্যর্থ হয়েছে। তাই আমাদের গণমাধ্যমকে চরমভাবে নিয়ন্ত্রণ করে মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু, বিদ্যুতায়ন ইত্যাদি নির্ভর উন্নয়ন প্রচেষ্টাও সফল হবে না।'

তিনি আরও বলেন, 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন গণমাধ্যমসহ যে কোনো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরা সরকারের একটি মোক্ষম অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। যত দিন এই অস্ত্রের ব্যবহার থাকবে, তত দিন বিশ্বের বাকস্বাধীনতার সূচকে আমরা তলানিতেই থেকে যাব।'

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম সমকালকে বলেন, 'সার্বিকভাবে গণমাধ্যম সূচকের নিম্নদিকে যাওয়ার প্রধানতম কারণ হচ্ছে আমাদের আইন কাঠামো। যদিও আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। তবে আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা প্রকট। নতুন নতুন আইন হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক যেসব মানদণ্ড আছে, যার ভিত্তিতে এসব সূচক করা হয়, সেখানে অনেক ধরনের ফ্যাক্টর আছে; যার সীমাবদ্ধতাগুলো রয়েছে আমাদের আইনি কাঠামোতে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এরই মধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মী আইন যেটা করা হচ্ছে, সেটার মাধ্যমে গণমাধ্যমকর্মীদের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে গণমাধ্যম ও কর্মরত কর্মীদের আরও বেশি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে নিয়ে আসা হচ্ছে। তা ছাড়া বিদ্যমান আইনের প্রয়োগেও সমস্যা রয়েছে।'

তার মতে, আমাদের আইনি কাঠামোটা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ব্যাহত করছে। আমাদের সমন্বিত কোনো আইন নেই। বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের কর্মক্ষেত্রে আরও সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ জন্যই সূচকের অবনতি হয়েছে।

পরিত্রাণ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বিশিষ্ট এই গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব বলেন, কিছু কিছু আইন বাতিল করা দরকার। কারণ, আমাদের আইনগুলো সব সময় গণমাধ্যমের কর্মক্ষেত্রকে সীমাবদ্ধ করে। কিন্তু আইনগুলো হওয়া দরকার গণমাধ্যমকে উৎসাহিত করার জন্য। গণমাধ্যম যাতে সঠিকভাবে তার কার্যসম্পাদন করতে পারে, সে জন্য আইনের মাধ্যমে সাংবাদিক, সোর্স, হুইসেল ব্লোয়ারদের প্রটেকশন নিশ্চিত করা দরকার। বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে এ রকম আইন আছে। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের সাপোর্টিভ কোনো আইনই নেই। এখনও অফিসিয়াল সিক্রেসি অ্যাক্ট কার্যকর রয়েছে। যদিও তথ্য অধিকার আইনে বলা আছে, যেখানে এই দুটি আইনের মধ্যে সাংঘর্ষিক হবে, সেখানে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হবে। কিন্তু উল্টোটাও প্রয়োগ হচ্ছে। সাংবাদিকদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। এ জন্য আইনি কাঠামোর সংস্কারের মাধ্যমে গণমাধ্যমের কর্মপরিবেশে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির উন্নয়নে উদ্যোগ নিতে হবে।

বিএফইউজের সভাপতি ওমর ফারুক সমকালকে বলেন, 'গণমাধ্যম-সংশ্নিষ্ট আইনগুলোর সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতার ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাও প্রকট। এ কারণে সাংবাদিকরা অনিশ্চয়তায় ভোগেন। সার্বিকভাবে এসবেরই প্রতিফলন ঘটেছে আরএসএফের প্রতিবেদনে। '

একনজরে আরএসএফের প্রতিবেদন :এবারের সূচকে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার ছাড়া বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত (১৫০), পাকিস্তান (১৫৭), শ্রীলঙ্কা (১৪৬), আফগানিস্তান (১৫৬), নেপাল (৭৬), মালদ্বীপ (৮৭), ভুটান (৩৩)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, তার ভিত্তিতে ২০০২ সাল থেকে আরএসএফ এই সূচক প্রকাশ করে আসছে। ২০১৩ সাল থেকে এই সূচকে বাংলাদেশ আছে। ২০২২ সালে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে একজন সাংবাদিক নিহত ও তিনজন কারাবন্দি বলে আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সূচক অনুযায়ী, বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে উত্তর কোরিয়া ১৮০তম (স্কোর ১৩ দশমিক ৯২)। খারাপের দিক দিয়ে দ্বিতীয় ইরিত্রিয়া, তৃতীয় ইরান, চতুর্থ তুর্কমেনিস্তান, পঞ্চম মিয়ানমার, ষষ্ঠ চীন, সপ্তম ভিয়েতনাম, অষ্টম কিউবা, নবম ইরাক ও দশম অবস্থানে রয়েছে সিরিয়া। সূচকে রাশিয়ার অবস্থান ১৫৫তম। আর সবচেয়ে বেশি সংবাদমাধ্যমে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা দেশগুলোর মধ্যে নরওয়ের (স্কোর ৯২ দশমিক ৬৫); পরে রয়েছে ডেনমার্ক, সুইডেন, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, পর্তুগাল, কোস্টারিকা, লিথুয়ানিয়া ও লিচেনস্টাইন।