যশোর সদরের কাশিমপুর ইউনিয়নের বর্গাচাষি ইউসুফ আলী। অন্যের জমি চাষ করে উপার্জিত সামান্য আয়ে চার সদস্যের সংসার চালাতে এমনিতেই হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে কয়েক বছর আগে তার ছোট মেয়ে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত বলে ধরা পড়ে। প্রতি মাসে দু'ব্যাগ রক্ত দিতে হয় তাকে। এই রক্ত জোগাড় করতে গিয়ে তাকে পড়তে হয় দারুণ বিপাকে। রক্ত কেনার টাকা আর রক্তদাতা সংগ্রহ করা হয়ে পড়েছিল দুঃসাধ্য।
ঠিক এমনই সময় তার পাশে দাঁড়ায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন 'ইচ্ছা পূরণ'। ইউসুফ আলীকে এখন আর রক্তের জন্য ছুটে বেড়াতে হয় না। নির্দিষ্ট সময় এলে সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তার মেয়েকে। আলাপকালে তিনি বলেন, 'এরা সহানুভূতির হাত না বাড়ালে হয়তো আমার মেয়েটির জীবনপ্রদীপ নিভে যেত।'
'ইচ্ছা পূরণ'-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সাদ ইমাম জানান, বর্তমানে তারা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ২০ শিশুকে নিয়মিত রক্ত দিচ্ছেন। এসব শিশুর মধ্যে কারও মাসে এক ব্যাগ, কারও দু'ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। সংগঠনটির উদ্যোগে গত দেড় বছরে ১৩ হাজার রোগীকে রক্ত দান করা হয়েছে।
ইচ্ছা পূরণের পথচলা বেশিদিনের নয়। ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি যশোর শহর ও শহরতলির ৫০ তরুণ মিলে গঠন করেন সংগঠনটি। শুরুতে যশোর শহরকেন্দ্রিক কাজ করলেও মাত্র ক'মাসেই তাদের কাজের ব্যাপ্তি ঘটেছে বেশ কয়েকটি জেলায়। বর্তমানে সাত শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক রক্তদাতা সংগ্রহ এবং অসহায় মানুষের জন্য কাজ করছেন।
তরুণরাই পারে সমাজকে এগিয়ে নিতে- এই স্লোগান ধারণ করে রক্তদান ছাড়াও সংগঠনটি গ্রাম পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে আগ্রহী করে গড়ে তুলতে কাজ করছে। খেলাধুলার মান উন্নয়ন ও নেশামুক্ত সমাজ গঠনের জন্যও নিয়েছে ব্যতিক্রমী নানা উদ্যোগ। এসব উদ্যোগের মধ্যে ফুড ব্যাংকিং, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণে কাজ ও বিনামূল্যে দুস্থ রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স সেবা, বৃক্ষরোপণ। সবচেয়ে প্রশংসার ব্যাপার হলো, এসব কাজে তারা কারও সাহায্যের জন্য তাকিয়ে থাকেন না। সংগঠনের সদস্যদের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে নয়তো তাদের উপার্জিত অর্থের একটা অংশ দিয়েই চলে সব কার্যক্রম।
ইচ্ছা পূরণের সভাপতি সাদ ইমাম জানান, নিয়মিত এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি তারা যশোর সদরের কাশিমপুর ইউনিয়নের এনায়েতপুরকে আদর্শ গ্রাম গড়তে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এ লক্ষ্যে গত সেপ্টেম্বর থেকে তারা কাজ শুরু করেছেন। এ গ্রামের প্রত্যেকটি পরিবারকে তারা স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চান। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে গ্রামটি দারিদ্র্যমুক্ত করার পাশাপাশি শতভাগ অক্ষরজ্ঞান নিশ্চিতে কাজ করছেন। এ ছাড়া গ্রামের প্রত্যেক বাড়ি থেকে অন্তত দু'জন রক্তদাতা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ইতোমধ্যে গ্রামের সব নারী-পুরুষের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় সম্পন্ন হয়েছে। গ্রামটিকে মডেল গ্রাম হিসেবে পরিচিত করতে চান তারা।
এনায়েতপুরের বাসিন্দা যশোর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি হারুণ অর রশিদ বলেন, উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। গ্রামের মানুষ স্বতঃস্টর্ম্ফূভাবে তাদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে।
এতিম শিশুদের আত্মনির্ভর করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংগঠনের সদস্যদের জমানো অর্থে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে ইচ্ছা পূরণ। সব মহলের মাঝে সাড়া জাগিয়েছে তারুণ্যনির্ভর নবীন এ সংগঠন।

লেখক: যশোর প্রতিনিধি

মন্তব্য করুন