বাবা ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। বাবা-মা ও পাঁচ ভাইবোনের সংসারে ছিল না সচ্ছলতা। তাই স্কুলজীবন থেকেই নকশিকাঁথা সেলাই করে খরচ চালানো শুরু করেন। বাবার দেওয়া অর্থ এবং নিজের আয়ের টাকাতেই ২০০১ সালে নগরীর সুন্দরবন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন কাজী নাসরিন আকতার শান্তা।
ততদিনে হাতের কাজের সুনাম ছড়িয়েছে আশপাশের পাড়ায়। এরপর নকশিকাঁথা ছেড়ে ব্লক-বাটিকের কামিজ তৈরি শুরু করেন। দৃষ্টিনন্দন বুটিকসের কাজ এবং নিখুঁত সেলাইয়ের কারণে এলাকার অধিকাংশ বাড়ি থেকেই কাজ আসতে থাকে। দু-একজন তখন পরামর্শ দেন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য। কিন্তু বাদ সাধে বাবা ও বড় ভাইয়েরা। পরিবারের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রশিক্ষণ চলতে থাকে।
কাজী নাসরিন আকতার জানান, বিউটিফিকেশনের কোর্স করে পার্লার চালু করতে গেলেই বাদ সাধে পরিবার। ঘরের মেয়ে বাইরে পার্লার করবে কেন? ভাইদের হাতে লাঞ্ছিতও হতে হয় তাকে। একপর্যায়ে বাবা-মাকে নিয়ে নিজেই পৃথক ভাড়া বাসায় চলে আসেন নাসরিন আকতার। ততদিনে বুটিকসের কাজের পাশাপাশি রান্না, বিউটিফিকেশন ও সেলাইয়ের কাজে দক্ষতা তৈরি হয়েছে। নিজেও প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছেন। ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করে তার তৈরি করা 'উইমেন্স হ্যাভেন'। সেই থেকে সাফল্যের শুরু।
বর্তমানে খুলনায় 'উইমেন্স হ্যাভেন'-এর তিনটি শাখা রয়েছে। সেখানে কাজ করেন ৪৬ নারী। পাশাপাশি 'উইমেন্স হ্যাভেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' গড়ে তুলেছেন তিনি। গত পাঁচ বছরে এই কেন্দ্রে বিউটি পার্লার, দর্জি বিজ্ঞান, ব্লক-বাটিক, নকশিকাঁথা সেলাই, অ্যামবুশ ও রান্না করা ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে খুলনা নগরী ও পার্শ্ববর্তী উপজেলার প্রায় দেড় হাজার নারীকে। এর মধ্যে ২০ জনের এখন খুলনা নগরীতে নিজস্ব বিউটি পার্লার রয়েছে, যেখানে কাজ করেন শতাধিক নারী।
এ ছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। যুব উন্নয়নের হয়ে ওই গ্রামের এক হাজার নারীকে সেলাই, পার্লার, রান্নার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। রূপসার মাছুয়াডাঙ্গা গ্রামকে বেকারমুক্ত ঘোষণার অন্যতম কারিগরও তিনি।
নগরীর রয়েল চত্বরের পাশে উইমেন্স হ্যাভেনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১২ অক্টোবর দুপুরে কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৩০ জন নারীকে সেলাই প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন কাজী নাসরিন আকতার শান্তা। তিনি জানান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সেলাইয়ের পাশাপাশি বিউটি পার্লার, দর্জি বিজ্ঞান, ব্লক-বাটিক, নকশিকাঁথা সেলাই, অ্যামবুশ ও রান্না ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কেন্দ্রে প্রধান প্রশিক্ষক তিনি নিজেই। কাজী নাসরিন জানান, দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই সংসারে টানাপোড়েন ছিল। এ জন্য ছোটবেলা থেকে কিছু করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা মনের ভেতর কাজ করত। কিন্তু পরিবার থেকে সবাই চাইত যে পড়ালেখা শেষ করে ভালো একটা চাকরি করি। কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল নিজে কিছু করার। সে অনুযায়ী চেষ্টাও করতে থাকি। দুঃখের বিষয়, সবচেয়ে বেশি বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমার পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু ইচ্ছাশক্তি ও মনোবলের কারণে পরিবার ও সামাজ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, নিজের একটি প্রতিষ্ঠান চালানোর মতো কোনো কিছুই ছিল না তার। বাড়িতে নিজে কাজ করে যে আয় হতো, তা দিয়ে লেখাপড়া ও সংসার খরচেই বেশি ব্যয় হতো। কিন্তু নিজে কিছু করার তাগিদ বরাবরই অনুভব করতেন। নিজের কাজ সবার সামনে তুলে ধরতে যেখানেই মেলার আয়োজন হতো, পণ্য নিয়ে ছুটে যেতেন তিনি। খুলনার বিভিন্ন বস্ত্র, কুটিরশিল্প, হস্তমেলায় স্টল দিয়ে প্রথম, দ্বিতীয় হতে থাকেন। তখন আত্মবিশ্বাস বেড়ে যেতে থাকে।
মেলায় অংশ নিতে নিতেই মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরসহ সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় হতে থাকে। তারাই তখন উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে উৎসাহ দিতে থাকেন। এ জন্য যুব উন্নয়নের প্রতিটি ট্রেডেই প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। সব প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর 'আত্মকর্মী থেকে উদ্যোক্তা উন্নয়ন', যুব বিনিময় কর্মসূচি ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রশিক্ষণও নেওয়া রয়েছে তার।
কাজের সাফল্যস্বরূপ তিনি শেখ হাসিনা যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে 'যুব বিনিময় প্রশিক্ষণ'-এ সারাদেশের মধ্যে প্রথম স্থান এবং ঢাকায় জাতীয় যুব মেলায় সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। যুব উন্নয়নের খুলনা বিভাগীয় রান্না প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম হন। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে সব আয়োজনেই প্রথম অথবা দ্বিতীয় হয়ে আসছেন তিনি।
নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ করে কাজী নাসরিন আকতার বলেন, ভালো কাজ করতে গেলে বাধা আসবেই। এই বাধা ডিঙিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। সবার আগে নিজের ভেতর আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে 'আমি পারব'। নিজের এই আত্মবিশ্বাসই নারীদের আসল মূলধন। কারণ, বর্তমানে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মহিলা অধিদপ্তরসহ সরকারি নানা রকম সামাজিক কর্মসূচি রয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি অসংখ্য উন্নয়ন সংস্থা রয়েছে, যারা নারীদের স্বাবলম্বী করতে কাজ করছে। নিজের প্রচেষ্টা থাকলে এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করা খুব সহজ। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সহজেই যে কোনো ছোটখাটো কাজ শুরু করা যায়।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে অনেকেই আসে, যারা সেলাই বা দর্জিবিজ্ঞানকে ছোট কাজ মনে করেন। তারা শেষ পর্যন্ত বড় কিছু করতে পারেন না। কিছুদূর গিয়ে হতাশ হয়ে সব ছেড়ে দেন। এ জন্য কোনো কাজকেই ছোট মনে করা যাবে না। ছোট থেকেই বড় কিছু শুরু হয়। এ জন্য আপনি যেই কাজটি ভালো পারেন, তা দিয়েই শুরু করেন। প্রথম ছোট ছোট কাজ করেন। ভালো কাজ করলে এমনিতেই আপনার সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। আপনার নিজের মার্কেটিং নিজের করা লাগবে না। আপনার কাজই আপনার প্রচার এনে দেবে। কাজের প্রতি আপনার আগ্রহ-নিষ্ঠা আপনাকে বড় কিছুর দিকে নিয়ে যাবে। আবারও বলছি, নারীরা বড় কিছু করতে গেলে বাধা আসবে। পরিবার থেকে আসবে সবচেয়ে বেশি বাধা। এই বাধা অতিক্রম করলে আসবে সমাজের বাধা। কে, কী বলল বা ভাবল- তাতে কান দেওয়া যাবে না। নিজের কাজের প্রতি সৎ থাকতে হবে, কমিটেড থাকতে হবে- ইনশাআল্লাহ একদিন সাফল্য আসবেই।
উইমেন হ্যাভেন দর্জিবিজ্ঞান প্রশিক্ষণ নিতে আসা নগরীর বাইতিপাড়া এলাকার রেহেনা আকতার বলেন, রিকশাচালক স্বামীর একার আয় দিয়ে সংসার চলে না। এ ছাড়া প্রায় রোগে-শোকে ভুগে রিকশা চালাতে পারেন না। এ জন্য সংসারে অভাব-অশান্তি লেগেই থাকে। এলাকার একজনের কাছে শুনে শান্তা আপনার এখানে আসি। সব খুলে বললে তিনি বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দেন। তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এনজিওর ঋণে সেলাই মেশিন কিনে বাড়িতে কাজ শুরু করি। প্রথমে বাড়ির আশপাশের লোকদের কাজ করতাম। এখন কাজের সুনাম শুনে এলাকার অন্য পরিবারের লোকজনও কাজ নিয়ে আসে। এখন স্বামী ও আমার আয়ে সংসার চলে যাচ্ছে। সমিতির ঋণও প্রায় শোধ হওয়ার পথে।
তিনি বলেন, আমার মতো অনেক গরিব মানুষ সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সেলাই প্রশিক্ষণ নেয় বেশি। এখন নতুন ডিজাইনে কামিজসহ পোশাকের চল বেশি। এ জন্য সময় পেলেই প্রশিক্ষণ নিতে ছুটে আসি। সব সময়ই নতুন কিছু না কিছু শিখছি।

লেখক: খুলনা প্রতিনিধি

মন্তব্য করুন