বড় ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রংপুর নগরীর প্রেস ক্লাব এলাকার বাসিন্দা তানবীর হোসেন আশরাফী। বাবা মো. সাফায়েত হোসেন, মা ইশরাত বেগমসহ পাঁচ ভাইবোনের সুখের সংসার ছিল তাদের। অর্থবিত্ত ও আভিজাত্যের কমতি ছিল না তার জীবনে। ১৯৯৮ সালে নবম শ্রেণিতে পড়াকালে ব্যবসায় ৫০ লাখ টাকা লোকসান করেন তানবীরের বাবা। হঠাৎ বড় অঙ্কের টাকার লোকসানে তানবীরদের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে যায়। ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে না পারায় নিলামে ওঠে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় ভিটেবাড়ি। এর পরও বাবার সঙ্গে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তানবীর। কালো মেঘ সরিয়ে উজ্জ্বল আলো নিয়ে সূর্যটা উঠবে বিশ্বাসে ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে স্কুলে যাওয়া সেই ছেলেটি ফুটপাতে জুতা-স্যান্ডেল, ভিউকার্ড বিক্রি শুরু করেন। নতুন ভোরের প্রত্যাশা নিয়ে পড়াশোনাও চালিয়ে যান। ফুটপাতের ব্যবসার পাশাপাশি তিনটি টিউশনি শুরু করেন তানবীর। তার ও বাবার উপার্জিত আয় দিয়ে চলে সংসার। টানাপোড়েনের সংসারে অভাব ঘোচাতে তানবীর তার ফুফা নাইয়ার আজমের সহযোগিতায় মোটরসাইকেলের পার্টস ব্যবসা শুরু করেন। শুরুর দিকে দোকানে দোকানে ফেরি করে পার্টস বিক্রি করতেন। এভাবে চলতে থাকে জীবনসংগ্রাম। মায়ের দীর্ঘদিন ধরে জমানো ৬০ হাজার টাকা নিয়ে ২০০৫ সালে ছোট ভাই তৌহিদ হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে জিএল রায় রোডে ছোট বোন সুমির নামে একটি মোটরসাইকেল পার্টসের দোকান চালু করেন। ধীরে ধীরে তানবীরের ব্যবসা বাড়তে থাকে। একসময় মোটরসাইকেল পার্টস ব্যবসায়ী হিসেবে উত্তরবঙ্গের সুপরিচিত ও সুখ্যাতি অর্জন করেন তানবীর। এরপর আর ঘুরে তাকাতে হয়নি তানবীরের পরিবারকে। ২০০৮ সালে পার্টস ব্যবসার পাশাপাশি নিউক্রস রোডে নিজস্ব জায়গায় আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। প্রায় ৪০ জন তরুণ-তরুণী আত্মনির্ভরশীল হতে এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। এরই মধ্যে হাতে জমে যায় কিছু টাকা। সেটি দিয়ে রেন্ট-এ-কার মাইক্রো ও পিকআপের ব্যবসায় নামেন তানবীর। সেখানেও সফলতা আসে। শুরু করেই ভালো লাভ করতে থাকেন ইজিবাইক ও ব্যাটারি বিক্রির ব্যবসায়। রংপুর, কুড়িগ্রাম, রাজারহাট, লালমনিরহাট, তুষভাণ্ডার, সৈয়দপুর, গাইবান্ধা, ঢাকার ডেমরাসহ রংপুর বিভাগে ১৬টি ইজিবাইক ও ব্যাটারি বিক্রির প্রতিষ্ঠান চালু করেন তানবীর। সেই থেকে সমাজে তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেন তানবীর। ২০১৮ সালে জাহাজ কোম্পানি মোড়ে রয়্যালটি মেগামল নামে একটি প্রতিষ্ঠান শুরু করেন তিনি। এরপর সেনাবাহিনী পরিচালিত আরএমসি মার্কেটে রয়্যালটি মেগামলের পাঁচটি আউটলেট ও রয়্যালটি ফুড আড্ডা নামে চাইনিজ রেস্টুরেন্টের ব্যবসা শুরু করেন তানবীর। এসব প্রতিষ্ঠানে রংপুরের সহস্র্রাধিক বেকারের কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন এ তরুণ উদ্যোক্তা।
দেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে প্রতিবছর সরকারকে আয়কর দিয়ে আসছেন তানবীর হোসেন আশরাফী। এরই ফলে পরপর দু'বার জেলার শ্রেষ্ঠ করদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। ঢাকা ব্যবসায়ী সমিতি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, সমতা অটো মোবাইল সংবর্ধনাসহ অসংখ্য ব্যবসায়ী সংগঠন তরুণ এ উদ্যোক্তাকে সংবর্ধিত করে ব্যবসায় আরও উৎসাহিত করেছে। এখানেই থেমে যাননি তানবীর। উপলব্ধি করেছেন শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আর্তমানবতার সেবায় অবদান রাখতে হবে। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ব্যবসা থেকে কষ্টার্জিত মুনাফার অর্থ দিয়ে পরিচালনা করে আসছেন বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম। তানবীরের সমাজসেবামূলক উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমগুলোর মধ্যে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণ, অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় কবরস্থান, শ্মশান, পাঠাগার নির্মাণ প্রশংসিত হয়েছে। মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, ধর্ষণমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে তিনি ২০০৭ সালের ১০ অক্টোবর 'বাংলার চোখ সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠন' নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সংগঠনের মাধ্যমে যুবকদের বিভিন্ন অপরাধ থেকে বিরত রাখতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তরুণদের আগ্রহ সৃষ্টিসহ খেলাধুলায় তাদের মনোনিবেশ করাতে স্বর্ণপদক প্রদানসহ নানা ধরনের প্রতিযোগিতারও আয়োজন করেছেন তিনি। এ ছাড়া বাংলার চোখ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের উদ্যোগে প্রতি বছর তিনি শীতবস্ত্র বিতরণ, বন্যাকবলিতদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, বৃক্ষরোপণ, স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করছেন। করোনাকালে বিনামূল্যে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, কর্মহীনদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী ও লিফলেট বিতরণ করেছেন বাংলার চোখ সংগঠনের মাধ্যমে। করোনায় বাড়ি বাড়ি খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে গিয়ে তিনি স্ত্রীসহ নিজে করোনায় আক্রান্তও হয়েছিলেন।
স্কুলজীবন থেকে সংগ্রামী ছিলেন তানবীর হোসেন আশরাফী। সমাজে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রথম কাতারে অবস্থান ছিল তার। নির্যাতিত, শোষিত মানুষের পাশে বন্ধুর মতো থেকেছেন তিনি। সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে ২৩ দিন জেলও খেটেছেন। রংপুর সিটি করপোরেশন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর শিক্ষা বোর্ড গঠনে আন্দোলন করেছিলেন তিনি। আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা তানবীর পুলিশের নির্যাতনের শিকারও হয়েছিলেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার জন্য বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে তিনি আন্তর্জাতিক যুব সম্মেলনগুলোতে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি ভারত, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, রাশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ভ্রমণ করেছেন।
সফল তরুণ উদ্যোক্তা তানবীর হোসেন আশরাফী বলেন, রংপুরের প্রেক্ষাপটে আমরা ট্রেড ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাসহ গ্যাসের অভাবে এখানে কলকারখানা গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রতিবছর শিক্ষিত বেকাররা কাজের আশায় ঢাকায় ছুটছেন। কেউ কাজ পাচ্ছেন, কেউবা হতাশ হয়ে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিচ্ছেন। আমি বিশ্বাস করি ব্যর্থতা মানেই পরাজয় নয়। দৃঢ় মনোবল নিয়ে দুঃসময়ের মোকাবিলা করতে পারলেই সাফল্যের দুয়ার খোলে।
তিনি বলেন, রংপুর বিভাগে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যবসায়িক পরিবেশ অনুকূলে থাকার পাশাপাশি কাঁচামালের সহজলভ্যতাও রয়েছে। তাই এ বিভাগের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে গ্যাস সরবরাহসহ শিল্প, কলকারখানা গড়ে তুলতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকার সহযোগিতা করলে আমরা উৎপাদনশীল ব্যবসায় যেতে পারব। তাহলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক চাকা শক্তিশালী হবে। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলে উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারকে বিশেষ সুবিধা প্রদান করতে হবে। সবার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বিশেষ করে রংপুর বিভাগের মানুষের উন্নয়নের জন্য আমৃত্যু কাজ করে যেতে চাই।
লেখক: রংপুর প্রতিনিধি

মন্তব্য করুন