গোপালগঞ্জের সফল তরুণ উদ্যোক্তা মোহাম্মদ ছওবান (৩৪)। তিনি মৎস্য চাষ ও পোলট্রি ফার্ম করে ১০ বছরেই নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে এলাকায় সফল উদ্যোক্তা হিসেবে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাকে অনুকরণ করে আরও অন্তত ৪০ তরুণ উদ্যোক্তা মৎস্য চাষ ও পোলট্রি ফার্ম করে সাফল্য পাচ্ছেন।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার হাতিয়াড়া গ্রামের মাওলানা আব্দুল হামিদের ছেলে মো. ছওবান। ২০০২ সালে এসএসসি পাস করার পর পাড়ি জমান সৌদি আরবে। পাঁচ বছর প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশে ফেরেন ২০০৭ সালে। সে সময় গ্রামে তার পিতার বিলবেষ্টিত খাল পাড়ের জমিতে শুধু আগাছা-পরগাছা জন্মাত। ধান তেমন হতো না। তার বাবা তাকে এসব জমি কাজে লাগিয়ে কিছু করার পরামর্শ দেন। ২০০৯-১০ সালের দিকে ছওবান নিজের এক লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে বাবর এক একরের কিছু বেশি জমিতে পুকুর কেটে সেখানে মাছ চাষ শুরু করেন। প্রথম বছরেই আয় হয় ছয় লাখ টাকা। পরের বছর পারিবারিক পাঁচ একর জমিতে পুকুর কেটে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ করেন। সেখান থেকে মোটা অঙ্কের টাকা লাভ হতে থাকে। এরপর তিনি জমি কিনে লাভজনক মাছ চাষ আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনা করেন। ২০১৭ সালে হাতিয়াড়া বাজার সংলগ্ন এলাকায় জমি কিনে আরও একটি মৎস্য ও পোলট্রি ফার্ম গড়ে তোলেন। ফার্মের নাম দেন জোহানা এগ্রো অ্যান্ড ফিশারিজ। এ পর্যন্ত তিনি ৩৬ একর জমি কিনেছেন। এখন মোট ৪২ একর জমির পুকুরে মাছ চাষ করছেন। তার পুকুরে জাপানি পুঁটি, তেলাপিয়া, পাঙাশ, সিলভারকার্প, মিররকার্প, ব্ল্যাককার্প, রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন কার্প জাতীয় মাছের চাষ হচ্ছে। তিনি প্রতি বছর ১৬০ টন মাছ উৎপাদন করছেন। উৎপাদিত মাছ এক কোটি ৮০ লাখ টাকা থেকে দুই কোটি টাকায় বিক্রি করছেন। মাছ চাষ থেকে লাভ করছেন অন্তত ৫০ লাখ টাকা।
ছওবান ২০১৬ সালে মৎস্য খামারেই একটি শেড করে ৫০০ মুরগি দিয়ে পোলট্রি ফার্ম শুরু করেন। তিনি সেখানে ব্রয়লার, সোনালি ও কক মুরগি তোলেন। প্রথম বছরেই ভালো লাভ আসে। এরপর মৎস্য চাষের পাশাপাশি পোলট্রি ফার্মের দিকে ঝোঁকেন। বর্তমানে দুটি ফার্মে তার ২১টি শেড রয়েছে। এসব শেডে ৬০ হাজার মুরগি পালনে ক্যাপাসিটি রয়েছে। তার ফার্মে প্রায় ৪৫ হাজার ব্রয়লার, কক ও সোনালি মুরগি রয়েছে। ফার্ম থেকে প্রতি মাসে ৮০ হাজার কেজি মাংস উৎপাদিত হচ্ছে। এসব মাংস গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও ঢাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এ থেকে প্রতি মাসে ছওবানের আয় হচ্ছে সাত থেকে আট লাখ টাকা। তরুণ এ সফল উদ্যোক্তা মৎস্য ও পোলট্রি ফার্মে সবজি চাষ ও গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। এখানেও তিনি সফল হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। এ ছাড়া ভবিষ্যতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ছওবান কুঁচিয়া ও কুমিরের চাষ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তার মৎস্য চাষ ও পোলট্রি ফার্মে ৫২ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন ২৫ থেকে ৫০ জন শ্রমিক দিনমজুর হিসেবে তার ফার্মে কাজ করছেন। এ ফার্ম থেকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অন্তত ১৫০টি পরিবার উপকৃত হচ্ছে। সবজি চাষ ও গরু মোটাতাজাকরণ শুরু হলে আরও অন্তত ৫০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ছওবানের দেখাদেখি হাতিয়াড়া ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের আত্মপ্রত্যয়ী সরোয়ার হোসেন কালু, বাবুল মোল্লা, নাসির মোল্লা, জুয়েল মোল্লাসহ ৫০ উদ্যোক্ত মৎস্য চাষ ও পোলট্রি ফার্ম করেছেন। তারা এসব ফার্ম থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা আয় করে অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। ছওবানের মৎস্য চাষ ও পোলট্রি ফার্মে উৎপাদিত মাছ ও মাংস গোপালগঞ্জসহ আশপাশের জেলার মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ করছে। মেধাবী জাতি গঠনে এ ফার্ম ভূমিকা রাখছে। ছওবানের ফার্মের মতো আদর্শ ফার্ম করে অনেকেই বেকার সমস্যার সমাধান করতে পারেন। এ ছাড়া যে কোনো চাকরির তুলনায় এ জাতীয় ফার্ম করে অনেকগুণ বেশি টাকা আয় করা সম্ভব। হাতিয়াড়া গ্রামের সরোয়ার হোসেন কালু বলেন, আমি ঢাকায় একটি বায়িং হাউসে চাকরি করি। গ্রামে ছওবানের লাভজনক ফার্ম দেখে আমি উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি মৎস্য চাষ প্রকল্প ও পোলট্রি ফার্ম করেছি। এখান থেকে বছরে বাড়তি তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় হচ্ছে। আমি বিকল্প আয়ের পথ পেয়েছি। ছওবানের দেখাদেখি আমাদের এ অঞ্চলে আরও ৪০ উদ্যোক্তা ফার্মের ব্যবসা করছেন। তারাও এ ব্যবসায় সাফল্য পাচ্ছেন। তরুণ উদ্যোক্তা মো. ছওবান বলেন, গোপালগঞ্জে মৎস্য চাষ ও পোলট্রি ফার্ম করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এ ফার্মে সবজি চাষ ও গরু পালন করে আরও বেশি লাভবান হওয়া যায়। আমি এক লাখ টাকা নিয়ে বিলের মধ্যে বাবার ফসলহীন জমিতে মাছ চাষ শুরু করি। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একে একে মাছ চাষ ও মুরগি পালন সম্প্রসারণ করেছি। এখন ৪২ একর জমিতে দুটি ফার্ম করেছি। এখানে ৫২ জনের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিন এখানে আরও ৫০ জন শ্রমিক দিনমজুর হিসেবে কাজ করছে। এখানে উৎপাদিত মাছ ও মাংস গোপালগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী জেলার মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ করছে। আমি গড়ে প্রতি মাসে মাছ ও মুরগি থেকে ২০ লাখ টাকা আয় করছি। সফল উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি আরও বলেন, আমি সরকারি সহযোগিতা পেলে বিদেশে রপ্তানিযোগ্য কুঁচিয়া ও কুমিরের চাষ করতে চাই। এটি করতে পারলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা বৃদ্ধি পাবে। দেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সমন্বিত কৃষি ফার্ম আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি পথ দেখাচ্ছে। এটি বেকার সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। ফার্ম করে চাকরির থেকে চার-পাঁচগুণ বেশি টাকা আয় করা যায়। তাই আমার দেখাদেখি আমাদের অঞ্চলে ৪০ জন উদ্যোক্তা মৎস্য চাষ ও পোলট্রি ফার্ম করেছেন।
লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক, গোপালগঞ্জ

বিষয় : কৃষি উদ্যোক্তা ছওবান

মন্তব্য করুন