স্বপ্ন বাস্তবায়নে অদম্য ইচ্ছাশক্তির বিকল্প নেই। স্বপ্ন যদি হয় জীবনকে জয় করা, তবে ইচ্ছাশক্তির প্রাবল্যে সেটাও হবে সহজতর। সেই দৃষ্টান্তই স্থাপন করেছেন কিশোরগঞ্জের নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের এক অজেয় তরুণী। নাম রিমা আক্তার। কটিয়াদী উপজেলার জামসাইট গ্রামের মো. আবুল হাসেম ও আনোয়ারা বেগম দম্পতির কনিষ্ঠ কন্যা। স্নাতক ডিগ্রিধারী রিমা আক্তার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই স্ব-কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তার এই স্বপ্নের প্রদীপে আলোর সঞ্চার ঘটায় জাতীয় পর্যায়ের জয়িতা নির্বাচন কার্যক্রম।
সেই স্বপ্নের ডানায় ভর করে এক সময় তিনি নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করার চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন। এরই মাঝে তিনি জানতে পারেন, উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী বেকার তরুণ-তরুণীদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ। তিনি তখনই জেলা পরিষদে গিয়ে কম্পিউটার ট্রেডে প্রশিক্ষণের জন্য ভর্তি হয়ে যান। সেখানে তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে চূড়ান্ত পরীক্ষায় রিমা প্রথম স্থান অধিকার করেন। ছোটবেলায় মা এবং খালার কাছ থেকে সেলাই, ব্লক, বাটিক, অ্যাপ্লিক ইত্যাদি বিষয়ে তিনি প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। এরপর ২০১৫ সালে জেলা পরিষদ থেকে ওইসব বিষয়ে দুই মাসের কোর্স সম্পন্ন করেন। এই প্রশিক্ষণের চূড়ান্ত পরীক্ষাতেও রিমা প্রথম হয়ে যান। জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ তার এই কৃতিত্বে তাকে একটি সেলাইমেশিন উপহার দেয়। এ ছাড়া প্রশিক্ষণ ভাতা হিসেবে তিনি পেতেন দৈনিক ৭০০ টাকা। সেই টাকা থেকে সামান্য সঞ্চয় করে রিমা আক্তার তার স্বপ্নযাত্রার শুভ সূচনা করেন। মাত্র ৭০০ টাকা পুঁজি খাটিয়ে কুশিকাটা ও কাপড়ের সমন্বয়ে বেবি ফ্রক, ব্লাউজের হাতা, ইয়োক ও শাড়ির পাড় তৈরি করে রিমা উদ্যোক্তা হওয়ার সিঁড়িতে পা রাখেন। দুর্দম ইচ্ছা ও একাগ্রতার কারণে সেই সিঁড়ি সহজেই তিনি অতিক্রম করতে পেরেছেন। ২৮ বছরের রিমা আক্তার এখন এই জেলার স্বপ্নবাজ তরুণীদের কাছে আইডলে পরিণত হয়েছেন। শহরের বত্রিশ মহল্লার ভূঁইয়া মসজিদ বাইলেনের একটি বহুতল ভবনের দ্বিতীয় তলায় ও ছয় তলার ছাদে এবং বিভিন্ন উপজেলার কয়েকটি গ্রামে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন তিনি। তার এসব কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে দেড়শ' থেকে দুইশ' বেকার তরুণী ও যুবতী বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ইতোমধ্যে তিন হাজারের অধিক নারীকে তিনি প্রশিক্ষিত করে উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছেন। বিশেষ করে বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীরা তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন। প্রশিক্ষিত নারীরা কুশিকাঁটার কাজ, ব্লাউজের হাতা, ইয়োক, বেবি ফ্রক ও আকর্ষণীয় শাড়ির পাড় তৈরির মাধ্যমে বাজারজাত করে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ফিরে পেয়েছেন। নারীদের এই আত্মকর্মসংস্থান শুধু তাদেরই স্বাবলম্বী করেনি; একই সঙ্গে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সরেজমিন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও কারখানা পরিদর্শনকালে রিমা জানান, সামান্য পুঁজি নিয়ে শুধু মনোবলকে সম্বল করে কঠিন যাত্রা শুরু করেছিলাম। ধৈর্য ও একাগ্রতার কারণেই আজ আমি সফলতার মুখ দেখতে পেরেছি। তিনি নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, রাতরাতি সফল হওয়ার চিন্তায় যেন কেউ অস্থির না হয়। এ ধরনের কাজে ধৈর্য, সততা ও নিষ্ঠার বিকল্প নেই।
রিমা জানান, ইতোমধ্যে তিনি জেলার ১৩ উপজেলাতেই শতাধিক নারী উদ্যোক্তা তৈরি করেছেন। ওইসব নারী প্রত্যেকেই নিজের বাড়িতে খুদে কারখানা তৈরি করে বিভিন্ন পণ্য বাজারজাত করা ছাড়াও অনলাইনে পণ্যসামগ্রী বিক্রি করছেন। এতে প্রত্যেক নারী প্রতি মাসে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা রোজগার করছেন। রিমা আক্তার তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ইতোমধ্যে একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। ২০১৮ সালে জেলার এসএমই পণ্য মেলায় তৃতীয় ও ২০১৯ সালে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এ ছাড়া ২০১৯ সালের নারী উন্নয়ন মেলায়ও তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। একই সালে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী সফল নারী হিসেবে তিনি কটিয়াদী উপজেলার শ্রেষ্ঠ জয়িতা এবং একই বছরে সবাইকে তাক লাগিয়ে জেলা পর্যায়েও শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে রিমা পরপর দু'বার নেপাল সফরের সুযোগ লাভ করেন। নেপালের প্রত্যন্ত পার্বত জেলার চৌনাট গ্রামে সেখানকার গুরুং ও থাপা উপজাতির বেকার নারীদের বিভিন্ন ট্রেডে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদেরও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ বাতলে দেন। নেপালের প্রশিক্ষিত উপজাতি নারীরা তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রত্যেকেই পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে এনেছেন। রিমা আরও জানান, যাবতীয় খরচ বাদ দিয়েও এখন তার মাসিক আয় গড়ে ৮০ হাজার টাকা। পরিবারের ভরণপোষণ, বাসা ভাড়া, কারখানা ভাড়া ইত্যাদির ব্যয় মেটাতে এখন আর তাকে হিমশিম খেতে হয় না।
করোনার দুর্যোগকালে সারাদেশে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও অনলাইনে রিমাদের ব্যবসা মোটামুটি ভালোই চলেছে। তার ফেসবুক পেজ 'রিমি ফ্যাশন' আগ্রহী ক্রেতাদের কাছে একটি বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তার বাজারজাত প্রক্রিয়া বেশিরভাগই চলে অনলাইন পদ্ধতিতে। শুধু চাকরির আশা না করে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিয়ে সামান্য পুঁজিতেও যে সফল হওয়া যায় এবং চাকরির বেতনের চেয়েও বেশি টাকা আয় করা যায় সেই উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা রিমা আক্তার ও তার কাছে প্রশিক্ষিত শতাধিক বেকার নারী। এই জনমুখী উদ্যোগে কমে আসছে বেকার নারীর সংখ্যা। পাশাপাশি অসহায় নারীদের জীবন ও পরিজন নিয়ে সমাজে টিকে থাকার অনিশ্চয়তাও কেটে যাচ্ছে।
রিমা আক্তারের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে সংসারে বাড়তি আয়ের পথ উন্মুক্ত করেছেন বাজিতপুর উপজেলা সদরের দড়িঘাগটিয়া মহল্লার শওকত আলীর উচ্চশিক্ষিত মেয়ে ফারজানা সুইটি। তিনি পেশাগতভাবে স্থানীয় সরারচর এলাকার হাজী ওসমান গণি মডেল কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক। দুই সন্তানের জননী এই গৃহবধূ জানান, চাকরির নির্ধারিত আয়ের বাইরে আরও কিছু অর্থ উপার্জনের ইচ্ছায় আমি রিমা আপুর কাজ থেকে সেলাই ও বুটিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন বাজিতপুর থেকে কিশোরগঞ্জে এসে প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছি। আমার এই প্রশিক্ষণ বিফলে যায়নি। এখন আমি নিজের বাড়িতেই বিভিন্ন পণ্য তৈরি ও অনলাইনে বিক্রি করে প্রতি মাসে নির্ধারিত আয়ের অতিরিক্ত ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা রোজগার করতে পারছি। আমার এই অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে রিমা আপুর ঋণ অপরিশোধ্য। ফারজানা সুইটি শিক্ষকতার পাশাপাশি তার অনলাইন পেজ 'সহজ বুটিকস'-এর মাধ্যমে নিয়মিত বিভিন্ন পণ্যের অর্ডার পেয়ে থাকেন।
কিশোরগঞ্জ শহরের বত্রিশ নরসুন্দা রোডের কানু দেবনাথের মেয়ে মুন দেবনাথ বর্তমানে স্থানীয় একটি সরকারি কলেজে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে সম্মান শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি রিমার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনিও একজন সফল উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন। 'হলি ফ্যাশন' নামে অনলাইনের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে তিনিও প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করছেন বলে জানান।
বত্রিশ পৌর মহিলা কলেজ রোডের এমদাদুর রহমান মীরের কন্যা ও স্থানীয় কলেজের স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মরিয়ম আক্তারও রিমার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিটি মেয়েরই কিছু হাতের কাজ জানা থাকা প্রয়োজন। বিপদে এই কাজ অনেক সহায়ক হতে পারে। তিনি বিয়েশাদিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুলের গহনা তৈরি করেন। 'হলুদ সাজ' অনলাইনের মাধ্যমে নিয়মিত অর্ডার পেয়ে কনে সাজানোর কাজ করে তিনি মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আয় করছেন বলে জানান। সদর উপজেলার লতিবাবাদ এলাকার স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এক সন্তানের জননী ও স্বামী পরিত্যক্ত আফরিন রহমান তুলি জানান, রিমা আপুর কাছে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম বলেই জীবনের কঠিন সময়ে কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে কাজের বিনিময়ে নিজেই নিজের সংসার নির্বাহ করতে পারছি। তিনি বলেন, আমার 'তুলতুলি' নামক পেজে নিয়মিত অনলাইনে বিভিন্ন পণ্যের অর্ডার পাই। নিজের হাতে তৈরি করা পণ্য সরবরাহ করে প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করছি।
লেখক: নিজস্ব প্রতিবেদক, কিশোরগঞ্জ

মন্তব্য করুন