পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরছিলেন হারুন সাহেব। এই একটা কাজে তার ভারি আনন্দ, কিন্তু থাকেন ঢাকার শ্যামলীতে, সেখানে পুকুর কোথায় যে মাছ মারবেন? হ্যাঁ, ছুটির দিন ধানমণ্ডি লেকে মাছ মারতে যেতে পারেন; কিন্তু মাছ মারার আনন্দ যখন বন্ধু জুয়েলকে হারানোর বিষাদে তলিয়ে যায়, তখন ভেতরের অসুখটাই তো বড় হয়ে ওঠে।
বন্ধু জুয়েল ছিল, যাকে বলে অন্ধ মাছ শিকারি। এই এক কাজে তার বুদ্ধি-বিবেচনা লোপ পেয়ে যেত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধানমণ্ডি লেকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির উল্টো দিকে, না হয় এখন যেখানে রবীন্দ্রসরোবর মঞ্চ তার পাশে ছিপ ফেলে বসে থাকত। ধানমণ্ডিতেই থাকত সে, চাকরি করত ফিলিপস কোম্পানিতে। যেদিন মাছ মারত না, সেদিনও লেকের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে ছিপ ফেলা মানুষজনের পাশে দাঁড়িয়ে মাছ মারা দেখত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
হারুন ভাবেন, ওই চুটকিটা কি জুয়েলকে নিয়েই তৈরি হয়েছে? এক লোক জুয়েলের মতো দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মাছ মারা দেখছে বলে মাছ শিকারি তাকে বললেন, ভাই আপনিও ছিপ ফেলে বসুন না। লোকটা বলল, না ভাই, আমার অত ধৈর্য নেই।
ধৈর্য অবশ্য জুয়েলের ছিল, অফুরানই ছিল। ছুটির দিন হলেই ছিপ, টোপ, চারা আর মাছ শিকারের যাবতীয় উপকরণ নিয়ে ধানমণ্ডি লেকে হাজির হতো জুয়েল। হারুন সাহেব তাকে প্রায়ই সঙ্গ দিতেন। কিন্তু হারুন সাহেব নির্মাণবিদ, তার ব্যবসা ঘরবাড়ি বানানো। তার ছুটির দিনগুলো নিরবচ্ছিন্ন অবসরের ছিল না। তারপরও তিনি জুয়েলকে সময় দিতেন।
জুয়েলই একদিন তাকে আইজ্যাক ওয়াল্টনের দি কমপ্লিট অ্যাংলার বইটি পড়তে দিল। বইটি প্রথম ছাপা হয় ১৬৫৩ সালে, যদিও ওয়াল্টন আরো পঁচিশ বছর অনেক কিছু যোগ করতে থাকেন বইটিতে। গদ্যে-পদ্যে মাছ ধরার শিল্পকে উদযাপন করেছেন ওয়াল্টন, এর আনন্দ আর অন্তঃসারকে অভিবাদন জানিয়েছেন। অফিসের কাজে লন্ডন গিয়ে বইটা এনেছিল জুয়েল। হারুনকে বলেছিল, বইটা পড়।
ইংল্যান্ডের রেনেসাঁসের অনেক আকর খুঁজে পাওয়া যাবে এ বইতে। কেন বইটির নামে 'কমপ্লিট' কথাটি আছে, তাও বুঝবি।
হারুন মাথা নেড়েছিল। আচ্ছা পড়ব, সে বলেছিল।
না, এভাবে বলিস না, বল, অবশ্যই পড়ব। রেনেসাঁস পরিপূর্ণতায় বিশ্বাস করত, জানিস তো। একজন মাছ শিকারি একজন পরিপূর্ণ মানুষের প্রতিচ্ছবি, প্রত্যয় নিয়ে বলেছিল জুয়েল।
কিন্তু পরিপূর্ণ অ্যাংলার হলেও পরিপূর্ণ মানুষ হতে পারেনি জুয়েল। মাছ মারার নেশায় সংসারকে ভুলেছে। ছুটির দিনগুলিতে তার স্ত্রী কেকা কত যে অনুরোধ করত, সারাটা দিন তার সঙ্গে কাটাতে; কিন্তু পরিপূর্ণ মাছ শিকারি কেন তা মানবে? কেকার শখ ছিল ঘুরে বেড়ানো, শপিং করা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া। সেসব সাধ তার অপূর্ণই থেকে যেত।
দুটি সন্তান হলো। কিন্তু পরিপূর্ণ মাছ শিকারিকে অন্তত অর্ধেক পূর্ণ বাবা হতে হয়, জুয়েলের তা খেয়ালে এলো না। কেকা অনেক দেখল। তারপর একদিন ঘরে তালা দিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেল।
জুয়েলের ধ্যান ভাঙল, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মাছ মারা বন্ধ করে জুয়েল কেকার মান ভাঙাতে বসল। কিন্তু মাঝখানে যদি আরেকজন এসে পড়ে, যে হাসিখুশি, দিলখোলা, যার শখও ঘুরে বেড়ানো, দামি জিনিস কেনা এবং সেসবের জোগান দেয়ার মতো চাকরি এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ যা, মার্কিন দেশের গ্রিনকার্ড, তাহলে কেকার মানটা ভাঙার কোনো কারণ কি আর থাকে?
কেকা যদি বিয়েতে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ঢাকাতে থেকে যেত, একাই থাকত ছেলেমেয়ে নিয়ে, জুয়েল হয়তো মেনে নিত, কষ্ট নিদারুণ হলেও। কিন্তু কেকা আমেরিকা চলে গেল। ছেলেমেয়ে দুটির অবশ্য এ ব্যাপারে বলা অথবা না বলার কিছু ছিল না। বাবাকে তারা দেখেছে সন্ধ্যার পর, বাতির আলোতে। দিনের আলোয় কস্ফচিৎ।
আইজ্যাক ওয়াল্টন বলেন, মাছ মারার একটা আনন্দ হলো, প্রকৃতির মাঝখানে অনেকটা সময় কাটানো। তাতে দিনের আলোর অদল-বদল, কাঁপন, রোদ-বৃষ্টি-ছায়ার আনাগোনা মানুষের ভেতরটা সুন্দর করে দেয়। দিনের আলোয় মানুষকে ভালো চেনা যায় ইত্যাদি। জুয়েল তার দিনের আলো অফিস আর ধানমণ্ডি লেকের জন্য রেখে দিয়েছিল।
একদিন ধানমণ্ডি লেকে জুয়েলের লাশ ভেসে উঠল। হয়তো বড় মাছ ধরা পড়েছিল ছিপে, সেটি তুলতে নিচে নেমেছিল। ধানমণ্ডি লেক বলে কথা। এর পানির নিচে কেউ নামলে উঠে আসাটা কপালের ব্যাপার।
হারুন অবশ্য আসল ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারেন। জুয়েল কখনো আলো ফোটার আগে লেকে যেত না। সেদিন গিয়েছিল। তার ছিপটি ঠিকই পাতা ছিল; কিন্তু বড়শিতে কোনো টোপ ছিল না।

দুই
বিরলের শশীদল গ্রামে পৈতৃক বাড়িতে যখন যান হারুন সাহেব, পুকুরের ঘাটে বসেন। ছিপ ফেলেন, কিন্তু মাছ ধরার চাইতে একলা কিছু সময় কাটানোটাই উপলক্ষ। বছরে দু'একবারের মতোই আসা হয়, ব্যবসা থেকে অবসর নেয়ার পর একটু বেশি। কিন্তু মাছ মারতে বসেন প্রধানত জুয়েলকে মনে রেখে। তার কেন জানি এ রকম একটা ধারণা হয়, তিনি যখন ফাতনার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন কখন তাতে টান পড়বে তার অপেক্ষায়, তার পাশে বসে থাকে জুয়েল। সারাটা ক্ষণ। এতে অস্বস্তি হওয়ার কথা নিশ্চয়- কে চায় নিজের পাশে মৃত একজন মানুষের- সে মানুষ যতই বন্ধু হোক- কায়াহীন ছায়া নিয়ে বসে থাকতে, বিরতিহীন? কিন্তু হারুন সাহেবের অস্বস্তি হয় না, তার ভালোই লাগে। জুয়েলের সঙ্গে তিনি গল্প করেন, একজন পরিপূর্ণ মানুষের জীবনের গল্প। জুয়েলের মতো কমপ্লিট অ্যাংলার তিনি হতে পারেননি, কিন্তু কমপ্লিট ম্যান তো হয়েছেন। এটাও তো রেনেসাঁসের একটা আদর্শ ছিল, তাই না জুয়েল? পাশে বসা জুয়েলের ছায়াকে তিনি দু'বছর আগে একদিন প্রশ্ন করেছিলেন। জুয়েলের ছায়া বলেছিল, হ্যাঁ। তিনি জুয়েলের ছায়াকে বলেছিলেন, আমার ছেলেমেয়েদের বড় হওয়া তুই দেখে যেতে পারিসনি, জুয়েল; কিন্তু তোকে বলি, মাশাল্লা, সোনার টুকরা হয়েছে ছেলেমেয়েগুলি। বড়টার হাতে ব্যবসা ছেড়ে অবসর নিলাম, মেজ ছেলেটা আমেরিকা থেকে ফিরেছে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমএসসি করে। সেও ঢুকছে ব্যবসাতে। মেয়েটা বুয়েট থেকে আর্কিটেকচারে পাস করে বেরোলো। সেও দুই ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসায় নাম লিখিয়েছে। তারা ব্যবসাটার নামে এখন ডিজাইনস শব্দটি জুড়ে দিয়েছে। নতুন নাম হয়েছে 'ওয়ান্ডার কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডিজাইনস।' কেমন, ভালো নাম না?
খুব ভালো নাম, জুয়েলের ছায়া বলেছে।
ও, তোকে ছোট ছেলেটার কথা বলাই হয়নি। ঢাকার আইবিএ থেকে এবার যে বিবিএ করল। বড়গুলোর ইচ্ছা সে বিদেশ যাক, এমবিএটা সেখান থেকে করুক, তারপর ফিরে ওয়ান্ডারের ব্যবস্থাপনা, বিপণন এসবের দায়িত্ব নিক। প্ল্যানটা ঠিক আছে না, জুয়েল?
হ্যাঁ। একদম ঠিক।
তোর দুই ছেলেমেয়েও খুব ভালো করেছে। কেকার সঙ্গে নিউইয়র্কে দেখা হয়েছে। ছেলেটা ডাক্তারি করছে মাউন্ট সাইনাই-এ। ভাবা যায়? মেয়েটাও কম কিসে? গোল্ডম্যান স্যাকস-এ ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং অ্যানালিস্ট। বছরে এক লাখ ডলারের মতো বেতন। এসব কথা বলতে বলতে কেকার গলা বুজে আসছিল।
তাই? জুয়েলের ছায়া জিজ্ঞেস করল।
ওর গলা বুজেছিল অন্য আরেকটা কারণে। বছরখানেক আগে ইমতিয়াজ ওয়ালি মারা যান। তিনি যে ডজ ডেটোনা গাড়িটা চালাচ্ছিলেন তা বরফে পিছলে খাদে পড়ে। একটা কনভেনশনে যাচ্ছিলেন আপস্টেট নিউইয়র্কে। এক বরফঝড়ের দিনে। কেকা এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, ইমতিয়াজ ওয়ালি আর নেই। জুয়েল, আমার কথাগুলি শুনছিস? জুয়েল?
হারুন সাহেবের হঠাৎ খেয়াল হয়েছিল, জুয়েলের সাড়া মিলছে না, ফিরে দেখলেন ঠিক। জুয়েলের ছায়াটা নেই।
সেদিন নিজেকে খুব বকা দিয়েছিলেন তিনি কেন জুয়েলের হৃদয়জুড়ে বেদনা জাগিয়ে দিলেন? এসব জুয়েলকে কেন বলতে গেলেন তিনি? ইডিয়ট, নিজেকে একটা গালি দিয়ে ছিপের ফাতনার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, দুঃখিত জুয়েল, মাপ করে দিস।
ফাতনায় টান পড়েছিল।
তিন
আজ পুকুরের ঘাটে বসে তার খুব ভালো লাগছে। ভালো লাগার অনেক কারণ- এর একটি তার ব্যবসায়ে চার নম্বর সন্তানটির যোগ দেয়া। দ্বিতীয় কারণ, শ্যামলীর বাড়িটা বদলে গুলশানে ওয়ান্ডারের তৈরি করা 'স্বপ্নলোক'-এ উঠে যাওয়া। 'স্বপ্নলোক'-এর মালিকও ওয়ান্ডার। সেখানে পাঁচটা ফ্লোরে সবাই মিলে থাকছেন। চার ছেলেমেয়ে চারটা ফ্লোরে, পাঁচ নম্বরে হারুন সাহেব ও তার স্ত্রী। বাকি দুইটা ফ্লোর তারা ভাড়া দিয়েছেন, একটি বিদেশি কোম্পানির কাছে।
স্ত্রী আপত্তি করেছিলেন, শ্যামলীতে দীর্ঘদিন থেকেছেন, সেখানেই সংসার শুরু করেছিলেন, সুখ-দুঃখের অনেক দিন সেখানে কাটিয়েছেন। ছেলেমেয়ের জন্ম, তাদের মানুষ করা- সবই হয়েছে সেই বাড়িতে। বড় ছেলে আর মেয়ের বিয়েও সেই বাড়ি থেকে। বড় ছেলের ঘরে যে নাতিটা হলো, সেও হাসপাতাল থেকে সোজা এই বাড়িতে এসেছিল। তাও বছর দুই হলো। বাড়িটা প্রবলভাবে স্মৃতিময়। এই স্মৃতিময় বাড়ি ফেলে কোথাও যেতে তার ইচ্ছা ছিল না।
কিন্তু ছেলেমেয়ের কথায় যুক্তি ছিল। শ্যামলীর দোতলা বাসায় জায়গা কম। মেয়ে বলল, জামাই এই বাড়িতে থাকবে না। দেড়খানা রুমে তার হাঁসফাঁস হয়। সে অন্যখানে বাড়ি নেবে। তবে গুলশানে গেলে তার আপত্তি নেই।
তা ছাড়া বাড়িটার তিন দিকে আকাশছোঁয়া অ্যাপার্টমেন্ট দালান উঠেছে। বাড়িটাতে এখন আলো-হাওয়ার ঘাটতি। আশপাশটা স্যাঁতসেঁতে থাকে। মশার উপদ্রব। বড় বউ বলেছে, বাচ্চাটা ঘোরতর বিপদে আছে ডেঙ্গু আর ম্যালেরিয়ায়। ঘরের দেয়ালে নোনা ধরেছে। কেমন একটা ভাপসা, তামাটে গন্ধ সারা বাড়িতে।
হারুন সাহেবের স্ত্রী ক্ষীণ গলায় বলেছিলেন, একটু সারিয়ে নিলে, নতুন প্লাস্টার-রঙ ইত্যাদি দিলে হয় না? মেয়ে ফারহানার জন্য তিন তলাটা বানিয়ে নিলে হয় না?
এ কথা শুনে বড় বউ হেসে বলেছিল, তাহলে একটা চারতলা তুলতে হবে। আমার আর ফাহাদের আর সোহানের জন্য।
সোহান হচ্ছে ডেঙ্গুর সমূহ বিপদে থাকা সেই নাতি।
শেষ চেষ্টা চালালেন মিসেস হারুন। বললেন, গুলশানে তোমরা তো সব আলাদা থাকবে, আমরা দু'জনও থাকব একটা ফ্লোরে। এটা কেমন হবে? সারা ঘরে আমি ও তোমাদের বাবা?
তা কেন হবে? মেজ ছেলে আহাদ বলেছিল। আমরা সবাই তো থাকবো একই ছাদের নিচে।
এরপর আর কথা চলে না।
গুলশান গিয়ে ভালোই লেগেছে হারুন সাহেবের। ঝকঝকে তকতকে বাড়ি। কী আলো-বাতাস! ছাদে একটা বিরাট বাগান বসানোর কাজ শুরু করেছে ছেলেমেয়েগুলো, তার স্ত্রী একদিকে মরিচ, টমেটো, বেগুন ফলাচ্ছেন। মাস ছয়েক হলো, বাড়িটাকে মনে হচ্ছে সত্যিকারই একটা স্বপ্নলোক।
নামটা মিসেস হারুন দিয়েছিলেন। তিনি যৌবনে কবিতা লিখতেন। বেগম পত্রিকায় তার কবিতা ছাপা হতো। ছবিও ছাপা হতো, ঈদ সংখ্যায়। ওই ছবি দেখেই হারুন সাহেবের মার আগ্রহ জেগেছিল ছেলের বউ হিসেবে তাকে পেতে।
মায়ের সাফল্যটাও আজকের এই পুকুরঘাটের আনন্দে একটা মাত্রা দিয়েছে। মাকে মনে পড়ছে তার দু'দিন থেকে। মা বলতেন, পরিবারের বড় আনন্দ হচ্ছে অটুট বন্ধন- সকলের সঙ্গে সকলের একটা সুতায় বাঁধা পড়া। সবাই থাকবে সবার জন্য। এমনি হবে সেই বন্ধন যে রাত-দুপুরে একজনের জ্বর হলে অনেক দূরে ঘুমিয়ে থাকা আরেকজন জেগে উঠবে। তার মনে তাইশ হবে। মা 'তাইশ' কথাটাই ব্যবহার করতেন। হয়তো ত্রাসের অপভ্রংশ। কে জানে!
আজ দু'দিন হলো শশীদল এসেছেন হারুন সাহেব। বাবার বংশ সচ্ছল ছিল। পূর্বপুরুষ জোতদার ছিলেন, জমিদার না হলেও। একটা একতলা বাড়ি আছে শশীদলে, পুরনো আমলের। একসময় চকমেলানো ছিল- বড় বড় থাম, দরজা, দশ ইঞ্চি ইটের দেয়াল। এখন অনেকটাই শ্রীহীন। বাড়ির একটা অংশ ধসে গেছে। কিন্তু যা আছে, তাতে সকলে মিলে থাকা যায়। বড় ছেলে গতবার এসে অনেক সংস্কার করে গেছে। লাইট ফ্যান ফ্রিজ টিভি আছে। বাথরুমে মডার্ন ফিটিং আছে।
মাকে মনে পড়ার প্রধান কারণ ছেলেমেয়ে সবাই এসেছে। ছোট ছেলে বলেছে, এটা একটা রি-ট্রিট। ব্যবসার পরিভাষায় রি-ট্রিটে আনন্দের সঙ্গে কাজও হয়। কিন্তু তার মনে হলো ছেলেমেয়েরা শুধুই আনন্দ করছে। তিনি তাদের হৈচৈ-চিৎকার শোনেন, আর পুলকিত হন। মা যাকে অটুট বন্ধন বলেছেন, তার ছেলেমেয়ের মধ্যে তাই দেখছেন হারুন সাহেব।
পুকুরের ঘাটে বসে হারুন সাহেব দেখলেন জুয়েলের ছায়া তার জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি খুব খুশি হলেন এবং প্রতিজ্ঞা করলেন, আজ তার সঙ্গে একদম ভিন্ন কথা বলবেন। আইজ্যাক ওয়াল্টনকে দিয়েই শুরু করবেন। কিন্তু পুকুরের পানিতে ছিপটা ফেলতেই তার ভেতর সুখের কথাগুলি উথাল-পাথাল শুরু করল। তিনি হঠাৎ জুয়েলকে বললেন, বুঝলে জুয়েল, দিনটা খুব আনন্দের। এই আনন্দটা বলে বোঝাতে পারব না।
তার প্রয়োজন নেই, জুয়েলের ছায়া বলল, এখন মাছ মারো। আজ মাছ উজিয়েছে। ভালো মাছ পাবে।
'ও' বলে মাছ মারায় মনোযোগ দিলেন হারুন সাহেব।
চার
হারুন সাহেব মাছ মারছিলেন, আর ঘরের ভেতর রি-ট্রিটে বসেছিল ছেলেমেয়েগুলো। মেয়ের জামাই ওসমানও আছে। সে চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট বা সিএ। সিএরা এমনিতেই এমবিএদের তেমন পাত্তা দেয় না। কিন্তু ওসমান রাহাতকে পাত্তা দেয় না অন্য একটি কারণেও। এই শ্যালকটিকে তার পছন্দ হয় না। ইঁচড়ে পাকা টাইপ। ওসমানকে যখন-তখন থামিয়ে কথা বলতে চায়।
রি-ট্রিটের মূল বিষয় শ্যামলীর বাসা। এই বাসা নিয়ে যে নানা মত দেখা দিচ্ছে সেগুলোর নিরসন করা। ফাহাদ চায় এটি সোনার বাংলা রিয়েল এস্টেটের কাছে বিক্রি করে দিতে। তাতে আশি কোটি টাকা পাওয়া যাবে। আহাদ চায় এখানে নিজেরাই অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং বানাতে। ওসমান বলছে, ফ্ল্যাট বানালে এখন আর লাভ হবে না। ফ্ল্যাটের একটা গ্লাট চলছে। তাকে থামিয়ে রাহাত বলছে, বাড়িটা একটু ঠিকঠাক করে ভাড়া দেয়া হোক। পাঁচ বছর পর এই বাড়ির দাম একশ' কুড়ি কোটিতে পৌঁছাবে। ফারহানাও, ফাহাদের মতো, বাড়িটা বিক্রি করে দিতে চায়, যদিও সে ফাহাদকে বলছে, ভাইয়া, রি-নেগোশিয়েট করো। একশ' পর্যন্ত পাবে। রাহাত বলছে সে চেষ্টা কি করিনি? আশির বেশি এক লাখও পাব না।
তাহলে ইউ আর নট নেগোশিয়েটিং হার্ড এনাফ।
ওসমান বলেছে, নানা, উনি ঠিকই বলেছেন। এই মুহূর্তে- এই মুহূর্তে কেন, আগামী পাঁচ বছরেও এ জমির দাম ...
তাকে থামিয়ে রাহাত জিজ্ঞেস করেছে, দুলাভাই, সিন্স হোয়েন ইউ আর এ ল্যান্ড স্পেকুলেটর?
ওসমানের ইচ্ছা হয়েছে এক থাপ্পড়ে ইঁচড়ে পাকা ছেলেটার দাঁত ভেঙে দেয়। কিন্তু সে জানে আশি কোটিতে বিক্রি হলে সকলের হাতে অর্থাৎ ফারহানারও অর্থাৎ তার হাতেও- নিদেনপক্ষে তিন-চার কোটি টাকা নগদ আসবে। বাকিটা কোম্পানির ফান্ডে জমা পড়বে। সে তার রাগ পুষে উঠে গেল। বারান্দায় বড় বউ মাইশা হুমায়ূন আহমেদ পড়ছিল। সে তার পাশে গিয়ে বলল, ভাবি, এক কাপ চা।
ও, মাইশা বলল, তোমার গিন্নি তো আবার রিট্রিট আছেন। বিজনেস। উনি কী করে চা দেন। ঠিক আছে দিচ্ছি।
কথাটা মিসেস হারুন শুনলেন। তিনি একটু দূরেই ছিলেন। মনোবিশেষজ্ঞরা বলবেন, কথাটা তাকে শোনাবার মতো জোরেই বলেছে মাইশা। তবে মিসেস হারুন যৌবনে কবি ছিলেন। কবিরা সমন্বয়ধর্মী হন, মানবতায় বিশ্বাস করেন। তিনি তাই পুত্রবধূকে বললেন, তুমি বস মা, আমি দেখছি।
পাঁচ
কিছুক্ষণ মাছ মারার চেষ্টা করলেন হারুন সাহেব। কিন্তু উজানো মাছগুলো একটা কামড়ও দিল না টোপে। বিরক্ত হয়ে ছিপ তুলে তিনি দেখলেন বড়শি ফাঁকা। টোপ নেই।
তার সন্দেহ হলো, আদৌ টোপ লাগিয়েছিলেন কি না। পাশ থেকে জুয়েলের ছায়া বলল, কেঁচো লাগাও। এই মাছ কেঁচো খাবে।
নিচু হয়ে তিনি কেঁচো লাগালেন। ছিপ ছাড়লেন।
জুয়েলের ছায়ার দিকে তাকিয়ে তাকে ধন্যবাদ দিলেন। বললেন, আনন্দের কারণটা তোমাকে বলি জুয়েল। আমার ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তাকাও। কী দেখতে পাবে? আদর্শ! মনুষ্যত্ব! তাদের ভেতর বন্ধনটা এমনই শক্ত যে পৃথিবীর কোনো কিছুই তা আলগা করতে পারবে না।
তোমার ফাতনায় টান পড়েছে, জুয়েল বলল।


তাই তো, হারুন সাহেব বললেন এবং ছিপে টান দিলেন।
একে একে তিনটা মাছ ধরলেন তিনি। শেষটা বেশ বড়। রুই। সেটি মাছ রাখার প্লাস্টিকের বালতিতে ফেলে জুয়েলের ছায়াকে অপেক্ষা করতে বলে ঘরের দিকে দৌড়ালেন। বারান্দায় স্ত্রীকে পেলেন, মাইশা ওসমানকে পেলেন। দেখ, কত বড় মাছ ধরেছি। তিনি বললেন এবং হৈচৈ শুরু করলেন। তার চিৎকারে ছেলেমেয়েগুলো ভেতরের ঘর থেকে বের হয়ে এলো। কী হয়েছে বাবা? ও, মাছ ধরেছ। ওয়াও। রিয়েলি বিগ। কুল, বাবা- এসব বলে তারা আবার ভেতরে চলেও গেল। মাইশা চায়ের কাপ হাতে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিল। মিসেস হারুন এসে মাছের বালতি নিয়ে রান্নাঘরে খালি করতে গেলেন। তাকে ক্লান্ত মনে হলো।
ওসমানকে জিজ্ঞেস করলেন হারুন সাহেব, ওরা কী করছে?
রি-ট্রিট, সে সংক্ষেপে বলল।
সেতো বুঝলাম; কিন্তু এটি এমনকি জরুরি?
ওরা শ্যামলীর বাড়ি বিক্রি করা নিয়ে কথা বলছে, ওসমান বলল, 'ওরা' কথাটায় জোর দিয়ে।
আচ্ছা? হারুন সাহেব বললেন। শ্যামলীর বাড়ি তো আমি বিক্রি করব না।
ওসমান হাসল। মিসেস হারুন বালতি নিয়ে ফিরলেন। মাছ মারা শেষ করে এসো, কথা আছে, তিনি বললেন। হ্যাঁ, আর আধা ঘণ্টা, হারুন সাহেব বললেন এবং পুকুরের দিকে হাঁটা দিলেন।
ছয়
ঘরের ভেতরের রি-ট্রিটে তখন উত্তেজনা চলছে। ফাহাদ আর আহাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ফারহানা থামাতে গেছে। না পেরে ওসমানকে ডেকে এনেছে। ওসমান আহাদকে আলাদা করে অন্যদিকে নিয়ে গেলে আহাদ চটেছে তার ওপর। রাহাত এসে বলেছে ওসমানকে- দুলাভাই, স্টে আউট অব আওয়ার অ্যাফেয়ার্স। ওসমান বলেছে ফারহানাকে, এই অকালকুষ্ফ্মাণ্ডকে সামলাও। এতে ফারহানার মাথায় রাগ চড়েছে। সে বলেছে, কাকে বলছ অকালকুষ্ফ্মাণ্ড? রাহাত চিৎকার করে বলেছে, আপনাকে সরি বলতে হবে। ফাহাদ আর আহাদ এবার রাহাতকে থামাতে গেছে। এরপর দৃশ্যে ঢুকেছে মাইশা। খুব মজা করার মতো করে বলেছে, সবার জন্য ঠাণ্ডা লাচ্ছি বানিয়ে আনি? সবার মাথায় টেম্পারেচার দেখছি বেড়ে গেছে। ফারহানা বলেছে, ঠাট্টা করো না, ভাবি। ওসমান বলেছে, ভাবি, মান বাঁচাতে চাইলে বারান্দায় চলে যান। রাহাত বলেছে, হোয়াই ডোন্ট ইউ ফলো হার?
ইত্যাদি।
রান্নাঘরে মুখে শাড়ি চেপে কেঁদেছেন মিসেস হারুন। কবি মানুষ, মনটা নরম। বছর খানেক থেকে তিনি টের পাচ্ছেন, জমি, সম্পত্তি, টাকাপয়সা- এসব যেন আলগা করে দিচ্ছে ছেলেমেয়েদের ভেতরের সম্পর্কটা। তিনি অনেকবার হারুন সাহেবকে বলতে চেয়েছেন, কিন্তু মানুষটা কীরকম যে অন্ধ! কিছুতেই কোনো কথা শুনবেন না, বিশ্বাস করা তো দূরের কথা। ছেলেমেয়েরা অবশ্য বাবার সামনে সেই আগের ভাইবোন। কিন্তু মিসেস হারুন লক্ষ্য করেছেন, ওয়ান্ডার কনস্ট্রাকশনটা ওয়ান্ডার কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডিজাইনস হয়ে যাওয়ার পরই আসলে ভাইবোনের ভেতর একটা ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। কোম্পানির নাম বদলানোর সময় নতুন দলিল-টলিল হয়েছে। মিসেস হারুনের ধারণা, বিপত্তিটা হয়তো ওইখানেই শুরু।
আজ দুদিন থেকে ঝগড়াঝাঁটি হচ্ছে। কালও হয়েছে। কালও চেষ্টা করেছেন হারুন সাহেবকে বলতে। কিন্তু তিনি কয়েক সেকেন্ড শুনে বলেছেন, হৈচৈ তো হবেই। কপট ঝগড়াঝাঁটি না হলে ভালোবাসাটা শক্ত হয় না। এ রকম তো সারাজীবনই তারা করেছে।
কথাটা সত্য। কপট ঝগড়া করা ভাইবোনদের একটা খেলা ছিল। সেই খেলা শেষে সবাই হাসত, মজা করত। গত রাতেও হাসি-ঠাট্টা হয়েছে। হারুন সাহেব তাতে আনন্দ পেয়েছেন। অটুট বন্ধন, তিনি মনে মনে বলেছেন এবং মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করেছেন।
সাত
জুয়েলকে বললেন হারুন সাহেব, দেখলাম ছেলেমেয়েগুলো খুব হাইপার হয়ে গেছে। অতি আনন্দে মানুষ হাইপার হয়, বুঝলে?
হাইপারের নানা কারণ থাকে, অতি আনন্দ এর একটি মাত্র, জুয়েলের ছায়া বলল।
হা হা, হারুন সাহেব হাসলেন। যাই হোক, তিনি বললেন, তারা শ্যামলীর বাসা বিক্রি করতে চায়। আমি তাদের বুঝিয়ে বলব, না। এই বাসায় তুইও তো অনেকবার গিয়েছিস, জুয়েল।
হ্যাঁ, জুয়েলের ছায়া বলল। ভাবির হাতে ডালপুরি খেতে যেতাম। কেকার খুব পছন্দ ছিল সেই ডালপুরি।
দেখি, আজ বিকেলে ডালপুরি বানাতে বলব মামুনাকে, হারুন সাহেব কোমল গলায় বললেন।

আট
ফাহাদ একটা থ্রেট দিয়েছে আহাদকে। সে তাকে বের করে দেবে। রাহাত আর ফারহানা তার পক্ষে। তারা মেজরিটি। আহাদ মাইনরিটি। আহাদ বলেছে, দেখা যাক, কে কাকে বের করে দেয়। ওসমান বলেছে, একটা সল্যুশনে আসতে হবে, এভাবে ঘরের মানুষ একজন আরেকজনের শত্রু হতে ... রাহাত তাকে থামিয়ে বলেছে, ইউ আর অ্যান আউটসাইডার। স্টে আউট। ওসমান বলেছে ফারহানাকে, সে বিকেলের বাসে ঢাকা ফিরবে। ওসমান এরপর রাগ করে বারান্দায় যেতে যেতে বলেছে ভাইবোনদের, এখন হাত চালাও। মুখে মুখে ঝগড়া আর কত? ওসমানের বিদ্রূপ মন্তব্য শুনে রাহাত চায়ের কাপ ছুড়ে মেরেছে। সেটা লেগেছে মাইশার হাতে। মাইশা লাচ্ছি হাতে ঘরে ঢুকছিল। আঘাত সামান্যই, কিন্তু মাইশা 'উফ' বলে এক হাতে আঘাত পাওয়া অন্য হাতটা ধরেছে। লাচ্ছির জগ পড়ে ভেঙে খানখান। সারা ঘরে লাচ্ছির ঢেউ ছড়িয়েছে।
নয়
ফাতনায় জোর কাঁপন দেখে হারুন সাহেব উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। জুয়েলের ছায়া তাকে বলল, চতুর মাছ। এটি সহজে ধরা পড়বে না। বড়শিটা খেলিয়ে ধরতে হবে। মনে আছে টেকনিকটা?
হ্যাঁ, হারুন সাহেব বললেন, গভীরে যেতে হবে। বিঁধতে হবে। তিনি ছিপটা তুলে টোপ পরখ করলেন, ছিপটা আবার দূরে মারলেন। রিলটা ছাড়লেন। এবার বড়শি গেল পানির গভীরে। মাছটা এবার রাগবে। টোপের দিকে ছুটে যাবে। আবার ছিপ তুলতে হবে, মাছটাকে আবার খেলিয়ে ছিপটা তুলতে হবে। মাছটা ডেসপারেট হবে। ডেসপারেট হলে মাছই হোক, মানুষই হোক, বুদ্ধি লোপ যায়, জেদটা বাড়ে। আইজ্যাক ওয়াল্টন বলেছেন, রেইজ ইজ দ্য আনডুইং অব এ ফিশ। অর্থাৎ মাছের জেদ তার ধ্বংস ডেকে আনে। এভাবে দূরে গভীরে কোনো একবার মারার পর ছিপটা কিসের সঙ্গে জানি আটকে গেল। কিছুক্ষণ টানলেন হারুন সাহেব। নাহ্‌। জিনিসটা টলছে না। মাছ যে না, তিনি বুঝেছেন। তাহলে?
নিশ্চয় কোনো হাঁড়িটাড়ি হবে, ঘটি বা এ রকম কিছু। তাই না জুয়েল?
না। আরো মূল্যবান কিছু, জুয়েলের ছায়া বলল।
তাহলে লতিফকে ডাকি? লতিফ অর্থাৎ বাড়ির দু'জন কেয়ারটেকারের মধ্যে জোয়ানটি।
ডাক, বলল জুয়েলের ছায়া এবং হঠাৎ করে বলল, গুডবাই হারুন। আর দেখা হবে কিনা জানি না। বাট টেক কেয়ার। ভালো থাকিস।
কী আশ্চর্য, জুয়েল কোথায় যাস? কেন যাস? আমার আনন্দের গল্পটা তো তোকে পুরোটা বলা হলো না?
কোনো উত্তর নেই। জুয়েলের ছায়াটা হারিয়ে গেছে।
দশ
লতিফ পুকুরে নামল। কিছুক্ষণ লাগল তার গভীরে পৌঁছাতে। তাকে পথ দেখাতে বড়শির সুতা আছে। হারুন সাহেবের হঠাৎ ভয় হলো। লোকটা পুকুরের গভীরে নেমেছে, কিন্তু সাড়া-শব্দ নেই। কেন?
কিন্তু না, লতিফ উঠে এলো। একটা আরামের নিঃশ্বাস ফেললেন হারুন সাহেব। লতিফ সাঁতরে পাড়ে আসছে। হাতে একটা বাক্স। কাঠের? লোহার? ছোটখাটো ক্যাশ বাক্সের মতো!
লতিফ পাড়ে উঠে বাক্সটা দিল হারুন সাহেবের হাতে। হারুন সাহেব বুঝলেন, এটি পূর্বপুরুষদের আমলের। সম্ভবত পিতলের। পুকুরের পানিতে এর শেষ দশা প্রাপ্তি। তার ব্যবসায়ী মন বলল, সাবধান। লতিফের সামনে খোলা নয়। এটি খুলতে হবে সঙ্গোপনে। তিনি তাকে বাহবা দিয়ে ছিপটিপ জায়গামতো রেখে আসার নির্দেশ দিয়ে বাক্স নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।

এগারো
ঘরে ঢুকে তার মনে হলো, একটা ঠাণ্ডা বাতাস যেন গায়ে লাগল। তিনি দেখলেন সবাই দাঁড়িয়ে-বসে আছে জমাট বেঁধে থাকার মতো। একটা গুরুতর কিছু যেন হচ্ছিল, তিনি আসায় হঠাৎ তাতে ছেদ পড়েছে। কারো মুখে হাসি নেই। তাদের মুখে নানান অভিব্যক্তি, কিন্তু একটাও আনন্দের নয়।
বরাবরের মতো তিনি চলে গেলেন অস্বীকারের রাস্তায়। কী হলো তোমাদের? সব চুপচাপ কেন?
না, তেমন কিছু না, ফারহানা বলল।
গুড, হারুন সাহেব বললেন এবং পরিস্থিতি হালকা করতে বললেন, দ্যাখো, কী মাছ ধরেছি। এই বলে পূর্বপুরুষের ক্যাশ বাক্সটা মাথার ওপর তুলে ধরলেন। নিশ্চয় ভেতরে সোনার মোহর আছে, ঠাট্টা করে তিনি বললেন।
এবার ঘরের জমাট বাঁধা বাতাসে একটা আলোড়ন হলো। হৈচৈ করে উঠল সবাই। খুলে দেখি বাবা? ফাহাদ দাবি জানাল।
সোনার মোহরই বটে। বিকেলে যখন সব মোহর সাফসুতরো করে সেগুলো নিয়ে হারুন সাহেব বসলেন, দেখলেন, সবই সেই সুলতানি না হয় মোগল আমলের। চুয়াত্তরটি মোহর। কত দাম হবে?
ওসমান বলল, প্রাইসলেস।
হারুন সাহেবের মনে পড়ল, একাত্তরে এই বড় চাচাকে যখন খুন করে পাকিস্তানি বর্বরগুলো, তাদের কাছে খবর ছিল এখানে গুপ্তধন আছে। চাচাকে মেরে অনেক খোঁজাখুঁজি তারা করল; কিন্তু কিছুই পেল না। পুরনো কিছু গয়না ছিল পরিবারটির। সেগুলো নিয়েই পাকিস্তানিরা ক্ষান্ত হলো। স্বাধীনতার পর হারুন সাহেবও অনেকবার এসে খুঁজেছেন। ব্যবসায়ে নেমে তার মনে হয়েছিল গুপ্তধন পেলে বিরাট কাজ হয়। চাচার ছেলেমেয়ে ছিল না। বাড়িটা তাই বাবার অধিকারে ছিল। তিনি মারা গেলে হারুন সাহেব এর মালিকানা পেয়েছিলেন। আজ বুঝলেন, চাচাই পুকুরে ফেলে দিয়েছিলেন গুপ্তধনের ওই বাক্সটি।
ওসমানের 'প্রাইসলেস' শুনে হারুন সাহেবের মনে হলো, সত্যিই এগুলো প্রাইসলেস। চাচা মারা গিয়েছিলেন এগুলোর কারণে। একটা মানুষের প্রাণের মূল্যে পাওয়া ধনের তো কোনো মূল্য হয় না, তা অমূল্যই থাকে।
ফাহাদ বলল, চল বাবা, মোহরগুলো নিলামে তুলি?
ফারহানা বলল, না, সবাই ভাগ করে নিই। তারপর যোগ করল, না জানি কত টাকা দাম!
আহাদ বলল, মোহরগুলো নিলামে তোলার প্রয়োজন নেই। তাহলে পুলিশ পেছনে লাগবে। বরং পুরান ঢাকার সোনার দোকানে বিক্রি করে দেই।
হারুন সাহেব গলায় অবিশ্বাস নিয়ে বললেন, বললাম না, এগুলোর জন্য আমার চাচা, একজন আগাগোড়া ভালো মানুষ, প্রাণ দিলেন? এগুলো কি বিক্রি করা যায়? ওসমান ঠিকই বলেছে, এগুলো প্রাইসলেস।
রাহাত বলল, দুলাভাইয়ের কথাই সই? আমাদের কথার কোনো দাম নেই?
হারুন সাহেব নিজের কানেও বিশ্বাস করলেন না। এই কথা তুই বলতি পারলি? তিনি বললেন, আমি আমার চাচার কথাগুলো বলার পরও?
বারো
রাতের খাওয়ার পর বিছানায় গিয়ে সব কথা হারুন সাহেবকে খুলে বললেন মামুনা। অর্ধেক পর্যন্ত শুনে হারুন সাহেব কান চেপে ধরলেন। তিনি বললেন, একটু ঘুমাতে দাও মামুনা।
তোমার পায়ে একটু মালিশ করে দেব? মামুনা বললেন।
দাও, নিরাসক্তভাবে বললেন হারুন সাহেব এবং বুঝলেন, সারারাত তার ঘুম হবে না।
তেরো.
সকাল ৯টায় সবাই নাস্তার টেবিলে বসে দেখল, হারুন সাহেব নেই। বাবা কোথায়? ফারহানা জিজ্ঞেস করল।
ঢাকা গেছেন, একদম ভোরে, গলার স্বর নিচুতে রেখে উত্তর দিলেন মিসেস হারুন।
ঢাকা গেছেন? কেন? ফাহাদ জানতে চাইল।
ছেলের চোখের দিকে স্পষ্ট তাকালেন মিসেস হারুন। তোমার বাবা মোহরগুলো জাদুঘরে দেবেন। আর শ্যামলীর বাসাটা মেরামত করাবেন। আমরা ঠিক করেছি, শ্যামলীর বাসাতেই চলে যাব।
ওসমান চুপচাপ সবাইকে দেখছিল এবং বলা কথাগুলো শুনছিল। একসময় তার মনে হলো, তার হাতে তিন কোটি টাকা যে এলো না, সে দুঃখ ছাপিয়ে এই অপগণ্ড শালা-সম্বন্ধীগুলোর চোখে জমা অবিশ্বাস্য-হতাশাটা যেন অনেক বেশি আনন্দময় হয়ে উঠল। সে বলল, ডালপুরিটা দারুণ আম্মা। আগে তো কখনো খাইনি?

লেখক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য করুন