মাত্র তিন দিন আগে রিকশায় সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার পথে বাসচাপায় নিহত হন সাবিনা ইয়াসমিন। সেই শোক না কাটতেই আজ (শুক্রবার) কাভার্ডভ্যানের ধাক্কায় মারা গেলেন স্কুটির যাত্রী নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাইশা মমতাজ মিম। এসব দুর্ঘটনার কারণ এবং কার কতটা দায় ছিল, তা তদন্তে জানা যাবে। রিকশায় বাসের ধাক্কায় সাবিনা ইয়াসমিনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু কথা হলো, একই সড়কে একই লেনে রিকশা ও বাস একসঙ্গে চলছে কী করে! একজন পরিবহন প্রকৌশলী হিসেবে বলতে পারি- এসব মৃত্যুর আসল কারণ পরিবহন খাতে উন্নয়নের ভুল দর্শন।

পরিবহনে শৃঙ্খলার জন্য ভূমি ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ঢাকায় এই তিন ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে কাজ করছে না। পরিবহন একটি ব্যবস্থা, শুধু অবকাঠামো নয়। আমরা শুধু অবকাঠামোতে মনোযোগী হয়েছি। ফ্লাইওভার করছি, বড় বড় দালান কোঠা করছি। কিন্তু ফ্লাইওভার যারা ব্যবহার করবে, যে ধরনের যানবাহন চলবে, সেই ব্যবস্থার প্রতি আমরা মনোযোগী হচ্ছি না।

পৃথিবীর সব দেশে গবেষণার ফলাফল হলো যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। সড়কের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে যানবাহন বেশি হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। সড়কে যারা চলাচল করে, সবাই কিন্তু দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর চাপে থাকে। ফলে আইনকানুন প্রাধান্য দেয় না। কীভাবে গন্তব্যে আগে পৌঁছাতে পারবে, সবাই সেই প্রচেষ্টায় থাকেন। বাসগুলো প্রতিযোগিতা করে, তা 'ক্যানিবালিজম'। মানে, একটি গাড়ি আরেকটি গাড়িকে খেয়ে ফেলতে চাইছে। খেয়ে ফেলার প্রতিযোগিতায় যাত্রী-পথচারীর প্রাণ যাচ্ছে। ভূমি ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের যে তিনটি ব্যবস্থা, তা কোমায় চলে গেছে। কোনো ব্যবস্থাপনাই কাজ করছে না।

ঢাকার যানজটের সমস্যা নিরসনে বহু টাকা খরচ করে সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) করা হয়েছে। সেখানে সবার আগে ফুটপাত ঠিক করে পথচারীবান্ধব করতে বলা হয়েছে। এরপর সড়কের সক্ষমতা বৃদ্ধি, লেন ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহনকে শৃঙ্খলা এনে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। তারপর মেট্রোরেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে করতে বলা হয়েছে। কিন্তু উল্টো কাজ করেছি। বৈরী আবহাওয়ায় মানুষ কিন্তু শান্তি খোঁজে। তার জন্য শক্তি অর্জন করতে হয়। ফুটপাত দখলমুক্ত করা চ্যালেঞ্জিং। গণপরিবহনকে শৃঙ্খলায় এনে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা করা চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু এই বৈরী আবহাওয়ায় মেট্রোরেল বা বিআরটি করে শান্তি খোঁজার উপায় নেই। ফুটপাত ও সড়কের কাজ আগে করতে হবে। কারণ, ২০ ভাগ মানুষ ফুটপাতে হাঁটেন। ৪০ ভাগ মানুষ বাসে চড়েন। এগুলোকে শৃঙ্খলায় আনতে পারলে মানুষ ছোট ছোট যানবাহন (প্রাইভেটকার, রিকশা) ছেড়ে বাসে উঠবে।

কেউ যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে না পড়ে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তাহলে কিন্তু কোনো ফল দিতে পারবে না। এ জন্য উন্নত দেশগুলো তাদের গণপরিবহন ধাপে ধাপে সাজিয়েছে। প্রথমে সিটি বাস সার্ভিস, তারপর বিআরটি সিস্টেম, তারপর মেট্রোরেল। সবশেষে পাতাল রেল। এটাই হচ্ছে পরিবহনের উন্নয়নের দর্শন। যদি সিটি বাস শৃঙ্খলায় আনা যায়, তাহলে রাস্তার ব্যাকরণ বদলে যাবে। মেট্রো, বিআরটি এগুলো আধুনিক ব্যবস্থা। ব্যাকরণ ঠিক থাকলে আধুনিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা যাবে। সড়কের ব্যাকরণ ঠিক না করে হাজার হাজার কোটি টাকার আধুনিক ব্যবস্থা চালু করতে গেলে খুব ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে না। আগে ব্যাকরণ ঠিক করতে হবে।

ঢাকায় লেন শৃঙ্খলা নেই। একটি সড়কের একই লেনে ১৮ ধরনের গাড়ি চলে! ছোট গাড়ি, রিকশা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। উন্নত বিশ্বে একই সড়কে এত ধরনের গাড়ি চলে না। একই লেনে সব ধরনের বাস চললে কখনও শৃঙ্খলা আসবে না।

মহাসড়কে ছোট গাড়ি, ধীরগতির গাড়ি, তিন চাকার চলাচল বন্ধে ২০১৫ সালে প্রজ্ঞাপন হয়েছে। তাতে লাভ কিছু কি হয়েছে? লেন বিভাজন না করে, ধীরগতির গাড়ির জন্য লেন তৈরি না করলে শুধু প্রজ্ঞাপন দিয়ে লাভ হবে না। সড়ক-মহাসড়ক তৈরি করার সময় আমরা সামাজিক বিভাজন তৈরি করছি। রাস্তার এক পাড়ের মানুষ অন্য পাড়ে তার প্রয়োজনে যাবেই। এটা বন্ধ করা যাবে না। এর সমাধান হলো, সামাজিক বিভাজন করা যাবে না। মহাসড়কের জনবহুল অংশ খুঁটির ওপর বা মাটির নিচে করতে হবে। একজন ৫০০ মিটারের বেশি হাঁটতে চায় না। এটা ব্যাকরণ। মহাসড়কে যত মানুষ মারা যায় তার ৫০-৬০ শতাংশ পথচারী।

মোটরসাইকেলে মহামারির মতো মানুষ মারা যাচ্ছে। বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছে। জাপানও বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু জাপানে চাইলেই বাংলাদেশের মতো মোটরসাইকেল কেনা যায় না। সেখানে এলাকাভিত্তিক যানবাহনের সংখ্যা সীমিত। ভারতে প্রতি ১০ হাজার নিবন্ধিত ভারী যানবাহনে মৃত্যুর সংখ্যা ১০ দশমিক ২ জন। বাংলাদেশে এই সংখ্যা ২৫ থেকে ২৬ জন। শ্রীলঙ্কা ঋণ নিয়ে মেগা প্রকল্প করে এখন দুর্দশায় আছে। আমরাও ঋণ করে ঘি খেয়ে বিপদে পড়তে চাই না।

লেখক: পরিচালক, দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : উন্নয়নের ভুল দর্শনে অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান মরণদশা

মন্তব্য করুন