যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর গত ২০ মার্চ আরাকানের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর ২০১৭ সালে পরিচালিত সেনা অভিযানকে গণহত্যা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। সে বিষয়টি ২৪ মার্চের সমকালের সম্পাদকীয় পাতায় মিয়ানমারের মানবাধিকার কর্মী 'ওয়াই ওয়াই নু'র লেখা মাহফুজুর রহমান মানিকের অনুবাদে প্রকাশ হয়। ওয়াই ওয়াই নু 'রোহিঙ্গা গণহত্যার মার্কিন স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার' হিসেবে বিষয়টিকে যতটা ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন; আমার মতে এ বিষয়কে মোটেও অত সরলভাবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার সঙ্গে মানবাধিকার সংরক্ষণ ও রাজনৈতিক কৌশলের আন্তঃসম্পর্কের বিষয়টি ভেবে দেখার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। কারণ রোহিঙ্গা ইস্যুটি এমন একটা সময় সামনে এলো, যখন রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমি তৈরি এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের কার্যক্রম নিয়ে চলছে বহুমাত্রিক আলোচনা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিগত কয়েক দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় দমন-নিপীড়নের ঘটনায় পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকাও আলোচনায় আসতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় ন্যাটো জোটের সাম্প্রতিক ভূমিকাকে মানবাধিকার সংরক্ষণের মোড়কে বৈধতা সৃষ্টির উপলক্ষ হিসেবে আরাকানের গণহত্যার বিষয়টি হয়তো সামনে আনার প্রয়োজন ছিল।
কারণ মানব সভ্যতা ইতোমধ্যে একটি প্রযুক্তি বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। পৃথিবীর মানুষ এখন শত শত আলোকবর্ষ দূরের নক্ষত্রমণ্ডলের রিয়েল টাইম গতিবিধি নিজেদের তৈরি হাবল টেলিস্কোপের চোখে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। অথচ নিজ গ্রহে মিয়ানমারের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে সরকারি বাহিনী কর্তৃক ১২ লক্ষাধিক নিরস্ত্র নাগরিককে ভিটেমাটি থেকে পৈশাচিক কায়দায় উচ্ছেদ এবং তাদের সম্পদ, সল্ফ্ভ্রম ও জীবনের ওপর বীভৎস আক্রমণের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশটির পেরিয়ে গেছে পাঁচ বছরের অধিক সময়। যদিও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ২০১৭ সালেই পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণসহ আরাকানের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বারবার নিবেদন পেশ করেছিল। তথাপি বিশ্ব সম্প্রদায় ছিল কার্যত নিষ্ফ্ক্রিয়। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘ অবশ্য দায়সারা গোছের একটি কমিশন গঠন করেছিল। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন খানিকটা দেরিতে হলেও তাদের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত সেনা অভিযানে গণহত্যার উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছিল। কিন্তু বীভৎস এই গণহত্যার বিচার এবং রাখাইনে বসবাসরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান গণহত্যা কার্যক্রম বন্ধে নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদকে আমরা থাকতে দেখেছি দায়সারা ভূমিকাতেই।
আমাদের মনে রাখতে হবে, অসংখ্য ঘটনার ভিড়ে দুই-একটি বিশেষ ঘটনা কখনও কখনও একটি সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি পুরো বিশ্বব্যবস্থার মানবিক মূল্যবোধের স্বরূপ উন্মোচন করে দেয়। আমি বিশ্বাস করি, সভ্যতার শাশ্বত মানদণ্ডে সংশ্নিষ্ট ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিশ্নেষণের মাধ্যমে মানব সংস্কৃতির উত্থান-পতনের গতিধারা অনুধাবনে বিশেষায়িত জ্ঞানের চেয়ে অধিকতর প্রয়োজন ঘটনার নির্মোহ বিশ্নেষণের ইচ্ছা ও মানসিক সক্ষমতা। এ ক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ইত্যাদি বিভাজন রেখার ঊর্ধ্বে থেকে চলমান ঘটনাবলির আন্তঃসম্পর্ক এবং এসবের কার্যকারণ বিশ্নেষণ করতে পারাটাই সভ্যতার স্বরূপ উন্মোচনে যথেষ্ট।
সহকারী অধ্যাপক, ময়মনসিংহ সরকারি কলেজ
frkhan62@yahoo.com