শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। শিশুর বয়স যখন ৫ বছর হয়, তখন তাকে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। ছোট্ট শিশুটি লিখতে-পড়তে পারে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হাতে-কলমে অ, আ, ক, খ, ১, ২ থেকে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এমন কচি বাচ্চাদের শিক্ষা দিতে যে কেমন কষ্ট হয়, তা একজন শিক্ষকই জানেন। অথচ এই প্রাথমিকের শিক্ষকরা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে একসঙ্গে শিক্ষক, অভিভাবক, পিয়ন ও অফিস সহকারীর কাজ করতে হয়। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, এত কাজ করার পরও তাঁরা মূল্যায়ন পান না। অন্য চাকরিজীবীদের চেয়ে কম বেতন দেওয়া হয়, যা দিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্নাতক পাসে ১০ম গ্রেড যুক্তিসংগত থাকার পরও তাঁদের দেওয়া হয়েছে ১৩তম গ্রেড, যেখানে মন্ত্রণালয়ের একজন ড্রাইভারকে দেওয়া হয় ১২তম গ্রেড। এমন নানা বৈষম্যের মধ্যেও প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হচ্ছেন আমাদের দেশের মেধাবীরা। ২৮ জুন সমকালে একটি সংবাদের শিরোনাম 'শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যা।' ছাত্রের হাতে শিক্ষকের এ মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা আমাদের মর্মাহত করে। সমাজের কতখানি অবক্ষয় হলে একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষাগুরুকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে- ভাবলে শরীর কেঁপে ওঠে। হত্যার শিকার শিক্ষকের গতকাল ছিল তৃতীয় বিয়েবার্ষিকী। এ উপলক্ষে সংবাদমাধ্যমে কথা বলেছেন তাঁর বিধবা স্ত্রী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করে অন্য চাকরিতে না গিয়ে ভালোবেসে শিক্ষক হয়েছিলেন উৎপল কুমার। কিন্তু এভাবে তাঁকে জীবন দিতে হলো? এর দায় কি শুধু খুনি জিতুর? কেন নড়াইলে শিক্ষককে অপমান করা হলো? নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার বিচার না হওয়ার কারণেই এসব বন্ধ হচ্ছে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে এসব অপরাধের লাগাম টেনে ধরা মুশকিল।
বর্তমানে শিক্ষার্থীদের বেত্রাঘাত বা মানসিকভাবে কোনো আঘাত শিক্ষকরা করতে পারবেন না। সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কিন্তু বেয়াদবি বা পড়া না শেখার কারণে শিক্ষার্থীদের সামান্য চাপ দিলেই অভিভাবকরা শিক্ষকের ওপর চড়াও হন; গলায় জুতার মালা পরানো হয় অথবা শিক্ষার্থীর অতর্কিত হামলায় শিক্ষককে মেরে ফেলা হয়। কিন্তু শিক্ষকদের ওপর এমন অত্যাচার বা নিপীড়নের কোনো আইন নেই, যা স্বাধীন দেশে বেমানান।
উচ্চ বিদ্যালয় বা দাখিল মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি বিভিন্নভাবে শিক্ষকদের হয়রানি করে থাকে। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ না করায় অল্প শিক্ষিতরাও ক্ষমতার জোরে সভাপতি হয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাৎ, বিদ্যালয়ের জমি দখল বা বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে থাকে। তাই শিক্ষকদের সুরক্ষা দেওয়া জাতির কর্তব্য।
সহকারী শিক্ষক, মমিনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টাঙ্গাইল