প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে অসংখ্য দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি অনেকে আহত হয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন পঙ্গুত্বের নির্মম গ্লানি। ১৯ জুলাই সমকালে প্রকাশিত 'বিশৃঙ্খলা ও বেপরোয়া গতি, সড়কে বাড়ছে প্রাণহানি' শীর্ষক সংবাদটি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রতিবেদনটিতে গত ঈদুল আজহার আগে ও পরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত-আহতের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, ঈদুল আজহার আগে ও পরে ১৫ দিনে সড়ক-মহাসড়কে ৩১৯টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৯৮ জন এবং আহত ৭৭৪ জন। হতাহতের এ সংখ্যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক গবেষণা অনুযায়ী, ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনাই ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। আর ৩৭ শতাংশ চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। অসচেতনতা, মাদকাসক্ত হয়ে গাড়ি চালানো, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পণ্যসামগ্রী বা যাত্রী পরিবহন, অদক্ষতা কিংবা চালকের সহকারী দিয়ে গাড়ি চালানোর জন্যও প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। তা ছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় সড়ক কম হওয়া, অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য রাস্তা সংকুচিত হওয়াও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
গবেষকদের মতে, একটি শহরের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ রাস্তা থাকতে হয়। অথচ রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে এর পরিমাণ মাত্র ৬-৭ শতাংশের মতো। আমাদের দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অনেকাংশে দায়ী। দিন দিন সড়ক দুর্ঘটনার মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও সড়ক-মহাসড়ক ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে অনেক সময় নির্বিকার ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়, যা সড়ক দুর্ঘটনার প্রচ্ছন্ন কারণ হিসেবে মনে করা হয়। এ ছাড়া জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন ও সড়ক বাতি না থাকা, মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, উল্টো পথে যানবাহন চালানো, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, অটোরিকশার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়া ইত্যাদিও সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সংগঠন দুটির তথ্যে উঠে এসেছে। সড়ক-মহাসড়কে এমন অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে সড়কগুলো যে দিন দিন আরও মৃত্যুকূপে পরিণত হবে, তা বলাবাহুল্য। তাই দুর্ঘটনার ক্রমবর্ধমান গতি রোধ করে সড়ক নিরাপদ করার ব্যবস্থা করতে হবে এখনই। কোনোভাবেই যাতে কেউ ভুয়া লাইসেন্স নিতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করার ফলপ্রসূ উদ্যোগ নিতে হবে। লাইসেন্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শুধু স্বাক্ষরজ্ঞান নয়, বরং অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি সুপ্রশিক্ষিত হওয়ার শর্ত জুড়ে দিতে হবে। চালকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাসহ ট্রাফিক আইন অমান্যকারী ও বেপরোয়া গতিতে গাড়িচালকদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। টেকসই পরিবহন কৌশল প্রণয়ন, তার বাস্তবায়নসহ 'সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮'-এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে। তা ছাড়া পরিবহন খাতকে চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা গেলে এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। সর্বোপরি, জনবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপদ সড়কের প্রতি সরকারের গভীর মনোযোগ সড়ক দুর্ঘটনা যেমন বহুলাংশে কমিয়ে আনবে, তেমনি নিশ্চিত হবে আমাদের নিরাপদ সড়ক।

প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ, সাভার সরকারি কলেজ, ঢাকা
monirulhaque.du@gmail.com

বিষয় : মনিরুল হক রনি

মন্তব্য করুন