আফ্রিকার শিংখ্যাত ইথিওপিয়ার রাজনৈতিক সংকট ক্রমেই রক্তক্ষয়ী আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে। ইথিওপিয়ার ১০টি আধা-স্বায়ত্তশাসিত ফেডারেল রাজ্যের একটি টাইগ্রে। উত্তরাঞ্চলীয় এ অঞ্চলটির বিরুদ্ধে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তবে এ সংঘাত ইথিওপিয়ায় থেমে নেই, বরং তার প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী ইরিত্রিয়া ও সুদানেও।

টাইগ্রে অঞ্চলের বিদ্রোহী প্রেসিডেন্ট ও টিপিএলএফ নেতা ডেব্রেটসিয়ন গেব্রেমাইকেল গতকাল রোববার বলেছেন, তার সেনাবাহিনী ইরিত্রিয়ার রাজধানী আসমারায় রকেট হামলা চালিয়েছে। আসমারায় নিযুক্ত পাঁচ আফ্রিকান কূটনীতিক বলেছেন, শনিবার রাতে ইথিওপিয়া থেকে অন্তত তিনটি রকেট ছোড়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি আসমারা বিমানবন্দরে আঘাত হেনেছে। ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারকে সমর্থন করে টাইগ্রে অঞ্চলের সীমান্তজুড়ে ইরিত্রিয়া সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছে বলে অভিযোগ গেব্রেমাইকেলের। আসমারায় হামলার কারণ এটিই।

টিপিএলএফের উত্থান: ১৯৭৪ সালে ইথিওপিয়ার রাজাকে উৎখাত করে সমাজতান্ত্রিক সরকার গঠন করে দ্য ডের্গ। পরের বছর থেকেই সে সরকারের বিরুদ্ধে টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ) যুদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৯১ সালে দ্য ডের্গ সরকারের পতন হলে ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় রাজনীতির প্রভাবশালী পক্ষ হয়ে ওঠে আঞ্চলিক দল টিপিএলএফ।

অন্যদিকে, কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৯৩ সালে এক গণভোটের মাধ্যমে ইথিওপিয়া থেকে স্বাধীন হয় ইরিত্রিয়া। ১৯৯৮ সাল থেকে ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ইথিওপিয়ার ফের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়। দুই বছর ধরে চলা সে যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ নিহত হন। ২০০০ সালে যুদ্ধ থেমে গেলেও সীমান্ত উত্তেজনা জিইয়ে ছিল প্রায় দুই দশক। অবশেষে ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এসে ইরিত্রিয়ার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন ইথিওপিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবি। এ কারণে তিনি ২০১৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান।

টাইগ্রে উত্তপ্ত হলো যেভাবে: জনবিক্ষোভের জেরে হাইলিমারিয়াম দেশালেগন সরকারের পতন হলে ক্ষমতায় বসেন আবি। এরপর থেকেই টাইগ্রের নেতারা অভিযোগ করতে থাকেন, তাদের দুর্নীতির মামলায় ফাঁসিয়ে, সরকারের বিভিন্ন পদ থেকে সরিয়ে ক্রমাগত কোণঠাসা করে ফেলছেন আবি। রাজ্যগুলোর ক্ষমতা সীমিত করে কেন্দ্রীয় সরকারকে শক্তিশালী করার অভিযোগে গত বছর আবি সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় টিপিএলএফ। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় চলতি বছর সেপ্টেম্বরে টাইগ্রেতে আঞ্চলিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সে নির্বাচনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল আবি সরকার। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় টাইগ্রের নির্বাচনকে বেআইনি ঘোষণা দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। এর পরই আবির সরকার টাইগ্রেতে বিমান হামলা চালানোর কথা জানায়।

ব্যাপক রক্তপাতের আশঙ্কা: সংঘাত শুরুর পরই টাইগ্রেতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, গত সোমবার মে কাদেরা শহরে শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। টাইগ্রে নেতাদের সমর্থক বাহিনীর বিরুদ্ধে এ গণহত্যার অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী আবি, যা অস্বীকার করেছে টিপিএলএফ। ইতোমধ্যে হাজারো মানুষ টাইগ্রে থেকে পালিয়ে সুদানে আশ্রয় নিয়েছে। রাজ্যটিতে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট। টাইগ্রেতে সংঘাতের মধ্যেই শনিবার রাতে ইথিওপিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় বেনিশানজুল-গুমুজ অঞ্চলে যাত্রীবাহী বাসে বন্দুকধারীদের হামলায় ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। সূত্র: আলজাজিরা ও বিবিসি।