'চই ঝাল' চাষ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

এম এ এরশাদ, ডুমুরিয়া (খুলনা)

ডুমুরিয়ায় চই ঝাল কলমের পরিচর্যা করছেন কৃষক নবদ্বীপ মল্লিক— সমকাল

ডুমুরিয়ায় 'চই ঝাল' (লতা জাতীয় সবজি গাছ) চাষ করে সফল হয়েছেন কৃষক নবদ্বীপ মল্লিক। এ অঞ্চলে চই ঝালের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও চই ঝালের কাটিং (কলম) রফতানি করা হচ্ছে। এই সবজি বিক্রির জন্য কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না। স্বল্প খরচ আর বেশি লাভ বলে স্থানীয় কৃষকরা চই চাষে দিন দিন আগ্রহী হচ্ছেন।

ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের বরাতিয়া গ্রামের সুভাষ মল্লিকের ছেলে নবদ্বীপ মল্লিক প্রায় ১৮ বছর ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। ২০১৫ সালে তিনি ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রথম চই ঝাল চাষের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট কৃষি অফিস থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ২০০ চই ঝালের কাটিং (কলম) সংগ্রহ করেন। পরবর্তী বছর কৃষক নবদ্বীপ নিজেদের ২০ শতাংশ জমিতে শুধু ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) 'নিজের তৈরি' এবং পিপি ছোট পলিথিনের প্যাকেটে ৭ হাজার কাটিং (কলম) তৈরি করতে সক্ষম হন। চই ঝাল চাষের জন্য কিছু সার, মাটি, শ্রমিকসহ এক একটি কাটিং (কলম) তৈরিতে তার খরচ হয় ৫ টাকা। মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে প্রতিটি কাটিং বিক্রি করা হয় ৩০ টাকা। মাত্র আড়াই মাসের ব্যবধানে প্রতিটি কাটিং বিক্রি করে লাভ হয় ২৫ টাকা।

চই ঝাল লতাজাতীয় গাছ, চইয়ের কাটিং যে কোনো হালকা উঁচু জায়গায় গাছের গোড়ায় রোপণ করা যায়। খুব কম সময়ের মধ্যে চই গাছ অন্য গাছের সঙ্গে সহজে জড়িয়ে পুরো গাছ জুড়ে লতিয়ে যায়। বর্তমান নবদ্বীপের বাড়িতে শতাধিক গাছসহ বিভিন্ন টবে চই গাছ লতিয়ে আছে। চই গাছ রোপণে ২-৪ বছরের মধ্যে এর আকৃতি বিশাল হয়। একটি চই গাছের পুরো অংশ জুড়ে স্বাভাবিকভাবে এক থেকে দেড় মণ পর্যন্ত এর বিস্তার ঘটে, যা কয়েক লাখ টাকা বিক্রি সম্ভব। চই শিকড় থেকে কাণ্ড পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি করা যায়। বাজারে প্রতি কেজি চই বর্তমানে ৩০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। বাড়ি থেকে ফড়িয়ারা নগদ টাকায় কিনে নিয়ে যায়। কোনো পরিবহন খরচ লাগে না।

চই চাষে নবদ্বীপের এখন বছরে খরচ হচ্ছে ৫০ হাজার টাকা। আর লাভ করেন ৩ লাখ টাকা। তবে চই ঝালের ওপর নবদ্বীপ মল্লিক এখন কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম। নবদ্বীপ জানান, খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, কালীগঞ্জ, মেহেরপুর, মনিরামপুর, যশোর, কয়রা, ফকিরহাট, মোল্লারহাট, রূপসাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে কৃষকরা তার বাড়ি থেকে চই ঝালের কাটিং (কলম) নগদ টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তাছাড়া সম্প্রতি ভারতের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে শতাধিক চই ঝালের কলম তার বাড়ি থেকে কিনে নিয়ে গেছে। এরই মধ্যে ৫০০ চই ঝালের কাটিং (কলম) ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে উপহারস্বরূপ বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। এলাকায় চই চাষে অন্যান্য কৃষকও আগ্রহী হচ্ছেন।

কৃষিবিদদের মতে, চই ঝালের চাষ ও চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। চই মাংস, ডালসহ যে কোনো সবজির সঙ্গে ও 'চই ঝালের' ভর্তাও খাওয়া যায়। ৬-৭ বছর ধরে বিশেষ করে ডুমুরিয়া অঞ্চলে চই চাষ বেশ বেড়েছে। চই চাষের জন্য খুব বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। এর রোগবালাই নেই বললেই চলে। দিন দিন এর চাহিদাও বাড়ছে। চই লতাজাতীয় গাছ। এর কাণ্ড ধূসর এবং পাতা পান পাতার মতো সবুজ রঙের। এর কাণ্ড মসলা হিসেবে ব্যবহার হয়। চই সাধারণত দুই প্রকার, গেছো ও ঝাড় চই। চই ঝালে দশমিক ৭ শতাংশ সুগন্ধি তেল রয়েছে। অ্যালকালয়েভ ও পিপালারটিন আছে ৫ শতাংশ। পরিমাণমতো গ্লুকোজ, ফ্রুস্টোজ, গ্লাইকোসাইডস, মিউসিলেজ, সিজামিন, পিপলাসটেরল ইত্যাদি রয়েছে চই ঝালে। এর কাণ্ড, শিকড়, পাতা, ফুল, ফল সব ভেষজ গুণসম্পন্ন। এর সব উপাদান মানব দেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী। শুধু তাই নয়, চই ঝালে গ্যাস্ট্রিক সমস্য, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। খাবারে রুচি, ক্ষুধামান্দ্যে কার্যকর ভূমিকাসহ চই ঝালে রয়েছে অসংখ্য গুণ। তবে মাটির গুণাগুণের কারণেও ডুমুরিয়া অঞ্চলে চই চাষ ভালো হচ্ছে। কৃষি ক্ষেত্রে চই চাষ লাভজনক।

সংশ্লিষ্ট এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা  ইক্তিয়ার হোসেন জানান, নবদ্বীপ একজন সফল চই ঝাল চাষি। চই চাষে সব ধরনের সহযোগিতায় কৃষি বিভাগ তার পাশে আছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মোদাদ্দেক হোসেন জানান, নবদ্বীপের সাফল্য দেখে ডুমুরিয়া উপজেলায় এখন তিন শতাধিক কৃষক চই চাষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অনেকেই চিংড়ি ঘেরের বেড়িবাঁধে (আইলে) অবশিষ্ট জায়গায় 'ঝাড় চই' চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।