বিশ্লেষণ

কোথায় যাচ্ছে এত ঋণ?

 প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০১৮      

 জাকির হোসেন

বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতি ঘোষণা করবে কয়েক দিনের মধ্যে। মুদ্রানীতি ঘোষণার আগেই ঋণ-আমানত অনুপাত নিয়ে বিতর্ক চলছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে দেয়, ঋণ-আমানত অনুপাত বা এডিআর কমানো হবে। মুদ্রানীতিতে এ বিষয়ে ঘোষণা থাকবে বলে আভাস দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পরপরই শেয়ারবাজারে ধারাবাহিক পতন দেখা যায় এবং তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন অনেকেই।

বর্তমানে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলো আমানতের ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে। আর  ইসলামী শরিয়া ভিত্তিতে পরিচালিত ব্যাংকগুলো দিতে পারে ৯০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক এ অনুপাত যথাক্রমে ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ৮৮ শতাংশ করতে চায় বলে ব্যাংকগুলোকে জানিয়েছে। ব্যাংকগুলো অবশ্য  ঋণের লাগাম টেনে না ধরতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ইতিমধ্যে লিখিতভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়ে বলেছে, এডিআর  কমানো হলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা তহবিল সংকটে পড়বেন। ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার আমানতের প্রয়োজন হবে।

এক বছর আগেও আমরা জানতাম, ব্যাংক খাতে প্রচুর অতিরিক্ত তারল্য পড়ে আছে। এর মধ্যে ঋণযোগ্য তহবিলও ছিল বড় অংকের। কিন্তু গত কয়েক মাসে আমানতের তুলনায় ঋণের প্রবৃদ্ধি অনেক বেড়ে গেছে। আমানত প্রবৃদ্ধি কমার কারণ হলো, এর সুদহার অনেক কমে গেছে। মেয়াদি আমানতের সুদহার অনেক ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির নিচে চলে এসেছে। এখন বড়জোর ৫ থেকে ৭ শতাংশ সুদ পাওয়া যাচ্ছে আমানতে। ঋণের সুদহারও কমেছে। তবে ঋণের এত প্রবৃদ্ধিকে শুধু সুদহার কমে যাওয়া দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী,  গত নভেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। ডিসেম্বরের হিসাব এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে জানা গেছে, প্রবৃদ্ধি ১৮ শতাংশের বেশি রয়েছে। আগের মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর  নাগাদ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ২ শতাংশে রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বোঝাই যাচ্ছে, মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। এত ঋণ কোথায় যাচ্ছে সে প্রশ্ন উঠছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ চাঙ্গা হয়েছে মানে বিনিয়োগ চাঙ্গা হয়েছে-তা  নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা বিশেষত ব্যবসায়ী নেতাদের কাছে আমরা যখন রিপোর্টের জন্য মন্তব্য জানতে চাই তখন বেশিরভাগই কিন্তু এমনটাই বলেন যে, বিনিয়োগে গতি নেই । বিশেষত নির্বাচনী বছরে বিনিয়োগকারীরা একটু ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ পলিসি নিয়ে থাকেন। 

আমরা জানি, ২০১০ সালের শেষে শেয়ারবাজারে ধস নামার আগের দু-একটি বছরে প্রচুর ঋণের অপব্যবহার হয়েছে। শিল্প-কারখানার জন্য ঋণ নিয়ে অনেকে তখন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন। আবার জমি কেনায়ও শিল্পঋণ ব্যবহার করেছেন কেউ কেউ। কিন্তু এখন শেয়ারবাজারের যে অবস্থা তাতে আগের মতোই ঘটছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উপাত্তে দেখা যাচ্ছে, আমদানি অর্থায়ন বেড়েছে ব্যাপকভাবে এবং সেখানে ঋণের প্রবৃদ্ধিটা অনেক বেশি। এখানে আরেকটি প্রশ্ন এসে যায়, যা আমদানি হচ্ছে তা কতটুকু শিল্পের কাঁচামাল, মূলধন যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী পণ্য- তা যাচাই করা দরকার। ঋণের সুদহার কমেছে বলে বেশি বেশি বিলাসপণ্য আমদানি হচ্ছে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার। আরেকটি বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতির নামে অন্য কিছু এনে কেউ কর ফাঁকি দিচ্ছে কিনা কিংবা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে টাকা পাচার করছে কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। গবেষণা সংস্থা সিপিডি দেশের অর্থনীতির ওপর সর্বশেষ পর্যালোচনায় তুলা আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়াকে সন্দেহজনক বলেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে পোশাকের  কাঁচামাল তুলা আমদানিতে ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অথচ এ সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের কয়েকটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে উধাও চট্টগ্রামের এক শিপব্রেকার্স ব্যবসায়ীর স্ত্রী বিদেশ থেকে নতুন প্রজন্মের একটি ব্যাংকের শেয়ার কিনে উদ্যোক্তা হয়েছেন। ঋণের টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার এমন ঘটনা নতুন নয়। সুতরাং মূল্যস্ফীতি কমাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমানোর প্রয়োজন যেমন আছে তেমনি ঋণের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু লাগাম টেনে ধরার বার্তা দিলে মনস্তাত্ত্বিক কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে অধিকতর কড়াকড়ি আরোপ করতে পারে, যা বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক 



  • আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

    আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

  • এলডিসি, উন্নয়নশীল এবং মধ্যম আয়ের ধারণা: বিভ্রান্তি ও ব্যাখ্যা

    এলডিসি, উন্নয়নশীল এবং মধ্যম আয়ের ধারণা: বিভ্রান্তি ও ব্যাখ্যা


‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

 রাশেদ মেহেদী

বছর পনেরোর এক কিশোর, আমরা যাদের বাচ্চা বলি। দু’দিন আগে ...

০৭ আগস্ট ২০১৮

নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’

 ইমতিয়ার শামীম

'আমি তো দেহ ব্যবসা করার জন্যে যাই নাই। আমি গেছি ...

১০ জুলাই ২০১৮

আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

 জাকির হোসেন

কয়েকদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে টকশোর বিরতিতে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ...

২৮ জুন ২০১৮

একটি প্রজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

 রাশেদ মেহেদী

ব্যবধান এক বছরের। চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার ...

১১ জুন ২০১৮