বিশ্লেষণ

ধন্বন্তরি চিকিৎসা নির্বাচন

 প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৮      

 ইমতিয়ার শামীম

নির্বাচন- নির্বাচনকে ঘিরেই বোধ করি আবর্তিত হবে আমাদের এই পুরোটা বছর। এই নির্বাচনী আলোচনা, দ্বন্দ্ব-বিরোধ, উত্তেজনা ও আবেগ-উৎকণ্ঠার তোড়ে ঢেকে থাকবে সুশাসন, সুউন্নয়ন। সেসবের তোড়ে মিঠুন চাকমা খুন হয়ে যাওয়ার খবর কোনোখানে ঠাঁই পাবেন না, আলোচনায় আসবে না, মৃত্যু তাকে মহিমান্বিত করলেও সময় তাকে কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে সরিয়ে রাখবে দূরে। নিজেকে দিয়েই বুঝি, গেল বছরের মতো এ বছরও দেশের প্রায় সব মানুষকেই দগ্ধ হতে হবে দ্রব্যমূল্যের তাপে; কিন্তু তাদের শরৎচন্দ্রের সেই সাড়ে বত্রিশ ভাজা করা হবে নির্বাচন নামের নিরাপদ জাহাজের খোলে ঢুকিয়ে। 

এর মধ্যে অবশ্য নানা দাবি-দাওয়াও মানা হবে। নির্বাচনে নিজেদের জনপ্রিয়তা নিশ্চিত করতে সরকার যেমন জনগণকে আশ্বস্ত করে চলবেন, আরও এক পর্ব থাকতে পারলেই মানুষ পেয়ে যাবে অসমাপ্ত সব কিছু, তেমনি বিরোধী দলও বলে যাবে, তারা ক্ষমতায় গেলেই সব সমস্যার হয়ে যাবে। আমাদের সুশীল বিজ্ঞ প্রাজ্ঞ মানুষগণও আগের মতো এই কথা বলা অব্যাহত রাখবেন— অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই। তা হলেই গণতন্ত্রের পথে দেশ এগিয়ে যাবে।

তা দেশ এগুবে বটে; পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে নিশ্চয়ই দেশ এগুচ্ছে। আবার পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়েই বলা যায়, দেশ সর্বনাশের পথে এগুচ্ছে। আমাদের বাল্যকালে পাঠ্যপুস্তকে পড়েছি, তখন কন্যাশিশুদের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করে ফেলা হতো, তখন আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগ ছিল। যদি বলি, খুব বেশি কি এগিয়েছে পৃথিবী? এগিয়েছে দেশ? অগ্রগতি বলতে তো এইটুকু যে এখন আর কন্যাশিশুদের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করা হয় না, হত্যা করা হয় ধর্ষণোপযোগী হওয়ার পর ধর্ষণের আকাঙ্ক্ষায়; হত্যা করা হয় ধর্ষণের পর, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর। আনুষ্ঠানিকভাবে পত্রপত্রিকা থেকে জানা গেছে এমন নারী হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতনের ঘটনা গেল বছর এক হাজার ৭৩৭টি। অপ্রকাশিত ঘটনা যে আরও নেই, তা কি নিশ্চিত আমরা? সরকার জঙ্গি দমনে সফলতার কথা বলছেন, কিন্তু জঙ্গিবাদ লুকিয়ে আছে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরতে পরতে, তাকে কে দূর করবে? আর তা যতদিন দূর না হবে, ততদিন জঙ্গিবাদ বেঁচে থাকবে নানা পোশাকে, জঙ্গিবাদ বেঁচে থাকবে ঘরে ঘরে নারীকে ঘিরে ধারণার মধ্যে। ওই ধারণা পারিবারিক সম্মান রক্ষার নামে, ‘অশ্লীল পোশাক’ পরার নামে বার বার নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করবে এবং প্রতিনিয়ত ব্যক্তি পুরুষকে নিজের পাপবোধ দূর করার জন্যে উৎসাহিত করবে ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে। কিন্তু এই ধারণার ও উদ্দেশ্যের দুর্বলতার দিকটুকুও জানা হয়ে গেছে জঙ্গি পুরুষদের, তারা তাই নারীকেই পাল্টে দিতে শুরু করেছে মননের দিক থেকে, হৃদয়ের দিক থেকে। আর তার প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে বটে। নারীকে ঘিরে জঙ্গি পুরুষদের যে ধারণা, অনেক মেয়ের ধারণাও এখন সেদিকে এগুচ্ছে। যার প্রতিফলন ঘটছে তাদের সংস্কৃতিচর্চাতে, পোশাক-আচরণের ক্ষেত্রে।

এরকমভাবে প্রতিটি ক্ষেত্র ধরেই বলা যায়, অনায়াসে বলা যায়। কিন্তু ‘অফুরন্ত সফলতা’র ঢেউ চারপাশে বয়ে বেড়াচ্ছে; শামসুর রাহমান যে লিখেছিলেন, ‘চাল পাচ্ছি, ডাল পাচ্ছি, তেল নুন লাকড়ি পাচ্ছি,/ ভাগ-করা পিঠে পাচ্ছি, মদির রাত্তিরে কাউকে নিয়ে/শোবার ঘর পাচ্ছি, মুখ দেখবার/ ঝকঝকে আয়না পাচ্ছি, হেঁটে বেড়ানোর/ তকতকে হাসপাতালি করিডর পাচ্ছি।/ কিউতে দাঁড়িয়ে খাদ্য কিনছি,/ বাদ্য শুনছি।/... ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি’- আমরাও তেমনি তাই মিশে যাচ্ছি কেবল নির্বাচনী স্রোতে। আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা শীতের মধ্যে রাজপথে পড়ে থাকছেন, আমাদের গণমাধ্যমগুলোর শিরোনামে থাকতে পারছেন না; দফায় দফায় শুধুমাত্র বিত্তবান-ব্যবসায়ীদের স্বার্থে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, আমাদের শিরোনামে উঠে আসছে এই সুখবর যে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে; আমাদের ব্যাংকিং খাতে লুটপাট চলছে,মাদকের ভেতর তরুণরা ডুবে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের তদন্ত শেষই হচ্ছে না, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা শেষই হচ্ছে না। চলমান তদন্ত ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার জেল্লায় বার বার দুষ্ট ক্ষতই ফিরে আসছে। যেমন নির্বাচনও ফিরে আসছে; যদিও, কে না জানে, নির্বাচন কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না। এমনকি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলেও লুটপাট আর ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন ও অধঃপতিত করার এই ধারাবাহিকতা শেষ হবে না। 

তা না হোক, লুটপাটের নতুন বৈধতা সৃষ্টি হবে তো!

লেখক: সাংবাদিক


  • রাজনীতি কাদের হাতে

    রাজনীতি কাদের হাতে

  • নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’

    নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’


‘বাচ্চারা ভাল, বড়রা খারাপ’

 রাশেদ মেহেদী

বছর পনেরোর এক কিশোর, আমরা যাদের বাচ্চা বলি। দু’দিন আগে ...

০৭ আগস্ট ২০১৮

নারীকর্মী না ‘রেমিটেন্স মেশিন’

 ইমতিয়ার শামীম

'আমি তো দেহ ব্যবসা করার জন্যে যাই নাই। আমি গেছি ...

১০ জুলাই ২০১৮

আমানতকারীরা কার কাছে যাবেন?

 জাকির হোসেন

কয়েকদিন আগে একটি টিভি চ্যানেলে টকশোর বিরতিতে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ...

২৮ জুন ২০১৮

একটি প্রজ্ঞাপন ও ডিজিটাল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

 রাশেদ মেহেদী

ব্যবধান এক বছরের। চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার ...

১১ জুন ২০১৮