বিশ্লেষণ

চকবাজারের স্লেটে লেখা পুরনো প্রতিশ্রুতি

 প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

 শেখ রোকন

সঙ্গত হবে কি-না, জানি না। কিন্তু বুধবার রাতে যখন আগুনের লেলিহান শিখা পুরনো ঢাকার চকবাজারের একটি অংশ গ্রাস করছিল; বৃহস্পতিবার ভোর থেকে যখন ধূমায়িত ভস্মস্তূপ থেকে একের পর এক দগ্ধ লাশ বের হচ্ছিল; তখনই তুলনাটা মনে এসেছিল। পোড়া মাংসের গন্ধ চকবাজারের জন্য নতুন নয়। কিন্তু আগামী দিনগুলোতে চকবাজারের বাতাস আর আগের মতো থাকবে?

মুঘল সেনাপতি মানসিংহ ঢাকায় যে দুর্গ স্থাপন করেছিলেন, তারই পাশে বারোয়ারি বিপণিকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল চকবাজার। পরবর্তী শতক ও দশকগুলোতে চকবাজার আরও সংহত, সম্প্রসারিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে। প্রবাদ রয়েছে- বাংলাদেশে এমন কোনো মনিহারি পণ্য নেই, যা এখানে পাওয়া যায় না। মফস্বলের কেউ ঢাকায় এসেছে, আর একবারের জন্য হলেও চকবাজারে ঢুঁ মারেনি- এক দশক আগেও তা অকল্পনীয় ছিল। এখনও মুঘল মেন্যুর নির্ভরযোগ্য উৎস সেখানকার সরু গলি ও ফুটপাতের দোকানগুলো। শুধু কাবাবই নাকি পাওয়া যায় কমবেশি ৪০ পদের। ওই এলাকা পোড়া কাবাবের গন্ধে ভুরভুর করে। তার সঙ্গে কি এবার নরমাংস পোড়ানোর গন্ধও যুক্ত হলো?

অথচ চকবাজার কেবল কাঙ্ক্ষিত গন্ধ ও সুগন্ধেই ভরপুর থাকার কথা ছিল। ২০১০ সালে অদূরবর্তী নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডে যখন অন্তত ১২০ জন নিহত হয়েছিল, তখনই আমরা বলেছিলাম- এই শেষ। শোকের এই কালো অধ্যায় আর আমাদের জীবনে ফিরে আসবে না। স্বজনহারা মানুষের আহাজারি ও আহতদের আর্তনাদে পুরনো ঢাকার বাতাস আর ভারি হবে না।

কারণ ও প্রতিকারগুলো সবারই জানা। পুরনো ঢাকার সরু গলি ও ঘিঞ্জি বসতি অগ্নিকাণ্ডের জন্য যেমন 'সুবিধাজনক' হতে পারে, তেমনই আগুন লাগলে নেভানোর জন্য অসুবিধাজনক। নিমতলী ও চকবাজার- দুই অগ্নিকাণ্ডেই আমরা দেখেছি, অকুস্থলে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর গাড়ি ঢুকতে পারে না। রয়েছে পানিরও সংকট। যে ধরনের দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ অগ্নিকাণ্ডের মাত্রা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়, তা নেভাতে পানি অবশ্য কাজে আসে সামান্যই। এসব মারাত্মক দাহ্য পদার্থেরই গুদাম রয়েছে পুরান ঢাকার প্রায় ঘরে ঘরে। নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পরই কথা ছিল, পুরান ঢাকায় দাহ্য পদার্থের সব গুদাম ও কারবার সরিয়ে ফেলা হবে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, প্রশাসনের অধিকর্তা- সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু গত এক দশকে তার সামান্যই প্রতিপালিত হয়েছে। দেশে যেভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে, তাতে এই আশঙ্কাও হয় যে, গুদাম ও কারবারের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

সরু গলি, ঘন বসতি- পুরান ঢাকার এক অনিবার্য বাস্তবতা, স্বীকার করতে হবে। শুধু ঢাকা নয়, গোটা বিশ্বেই নগরীর প্রাচীন অংশ বা 'ডাউন টাউন' মানেই সরু গলির ঐতিহ্য। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য ঐতিহ্যও ধরে রাখা হয়। বিশেষত প্রাকৃতিক পরিবেশ। এক সময় নদী, খাল, পুকুর শোভিত মনোরম পুরান ঢাকা এখন কেবলই ইট-কাঠের জঙ্গল। বিবিধ দাহ্য পদার্থের কারবার পুরান ঢাকাতেই কেন ভিড় জমিয়েছে। সেখানে বর্জ্যদূষণ 'সহজ' বলে?

অথচ প্রাকৃতিক পরিবেশ বহাল থাকলে বসতি ঘন হতে পারে, গলি সরু থাকতেই পারে; কিন্তু ঘিঞ্জি হয়ে ওঠার সুযোগ নেই। জল-পরিবেশ আবহাওয়া রাখে ফুরফুরে। পানি মানেই সবুজের সুযোগ। ঘিঞ্জি আবহ থেকে মুক্তি কেবল নয়, ভারসাম্যপূর্ণ আবহাওয়ায় বসবাস কেবল নয়; আশপাশে পানির উৎস থাকলে আর কিছু না হোক, আগুন নেভানো তো সুবিধা হয়!

নদী ও খালগুলো মেরে ফেলে সবুজ ঢাকাকে ধূসর করেছি আমরা। গতকাল নিমতলী, আজ চকবাজারের আগুন সেই ধূসরকেও কালো করে দিচ্ছে! প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়তো আর সম্ভব নয়। কিন্তু মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তো মানুষের হাতেই রয়েছে। শুধু রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের কারবার পুরনো ঢাকা থেকে সরিয়ে নিলেও অগ্নিকাণ্ড ভয়াবহ হয়ে ওঠার ঝুঁকি বহুলাংশে কমবে। আমরা হাত গুটিয়ে বসে রয়েছি।

চকবাজারে আরও নানা মনিহারি পণ্যের সঙ্গে চক ও স্লেটও নিশ্চয়ই পাওয়া যায়। নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর ঝুঁকি কমানোর প্রতিশ্রুতিগুলো যেন সেই স্লেটে লেখা হয়েছিল চক দিয়ে। আমরা সবাই সেসব মুছে ফেলে নতুন করে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

লেখক ও গবেষক

skrokon@gmail.com