গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন কখন

 প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০১৯ | আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৯      

 শেখ রোকন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ স্লোগান লেখা টি-শার্ট। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি

টি-শার্টে স্লোগান লিখে সমাজকে বার্তা দেওয়ার চল নতুন নয়; কিন্তু দেশীয় পণ্য বিক্রির অনলাইন একটি উদ্যোগের ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ স্লোগান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে তরঙ্গ তুলেছে, তার নজির নিকট অতীতে সম্ভবত নেই। আমার শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন এ পরিস্থিতিকে ফেসবুকে তুলে ধরেছেন একবাক্যে : ‘এক টি-শার্ট-এত আর্তনাদ!’

টি-শার্টের বার্তাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিপুল অধিকাংশ এই স্লোগানের পক্ষে, সন্দেহ নেই। আমাদের দেশের জনপরিবহন নানা দিক থেকেই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অস্বস্তিকর। যাত্রীর তুলনায় জনপরিহনের সংখ্যার কথা বলছি না, কাঠামোগত দিক থেকেই এগুলো বসা বা দাঁড়িয়ে থাকার জন্য অসুবিধাজনক। পুরুষ যাত্রী যেভাবে চাপাচাপি করে গন্তব্যে যেতে পারে, একজন নারী যাত্রীর পক্ষে তা কঠিন। নারীর জন্য বাড়তি অস্বস্তি হচ্ছে সহযাত্রীদের আচরণ। জনপরিবহনে পুরুষ যাত্রী এমনকি বাসের হেলপার-কন্ডাক্টরের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের শিকার হয়েছেন, এমন অনেকেই নিজের অভিজ্ঞতা ফেসবুকে তুলে ধরেছেন।

টি-শার্ট বিতর্কে দ্বিতীয় পক্ষ বলছেন, এই স্লোগান নারী-পুরুষ সমতাবিরোধী। এর মধ্য দিয়ে নারীর যে বিশেষ ‘নিরাপত্তা’ ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে, সেটাই সেই কাঙ্ক্ষিত সমতার অন্তরায়। তারা বলছেন, আমাদের সামাজিক বাস্তবতার নিরিখেই সামগ্রিক সমাধান খুঁজতে হবে। বিশেষ ব্যবস্থা নারীকে মূলধারা থেকেই দূরে সরিয়ে রাখবে।

তৃতীয় পক্ষ সরাসরি স্লোগানটির বিপক্ষে। তাদের অনেকে বলছেন, এর মধ্য দিয়ে সব পুরুষ যাত্রীকে ‘জেনারালাইজ’ করা হয়ছে। এটা পুরুষদের জন্য ‘অপমান’। তাদের কয়েকজনকে পাল্টা অভিযোগ করতে দেখছি যে, টি-শার্টের স্লোগান ‘উস্কানিমূলক’। কেউ কেউ স্লোগানটি রীতিমতো বিকৃত করে ফটোশপ করে ফেসবুকে ছেড়েছেন। আমার বন্ধু ও সহযোদ্ধা আইরিন সুলতানা এটাকে আখ্যা দিয়েছেন ‘ইতরামি’ হিসেবে।

আমার মনে হয়, নারী নিগ্রহের পরিপ্রেক্ষিত ছাড়াও এ ধরনের স্লোগান সামাজিক পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি ছিল। নারী যাত্রীর পক্ষে পুরুষ যাত্রীর গা ঘেঁষা তো বটেই, জনপরিবহনে এক পুরুষ আরেক পুরুষের গা ঘেঁষে কিংবা এক নারী আরেক নারীর গা ঘেঁষে দাঁড়ানোও কি চরম বিরক্তিকর নয়? অথচ জনপরিবহনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যাত্রী ব্যক্তি যদি সচেতন থাকেন, তাহলে অন্যের গা ঘেঁষে না দাঁড়িয়েও গন্তব্যে পৌঁছা যায়। তার পরও সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক তার সহযাত্রীর স্বস্তি-অস্বস্তি সম্পর্কে উদাসীন থাকেন। অভাব যতখানি না জায়গার, তার চেয়ে অনেক বেশি আসলে বিবেচনার।

বিবেচনার অভাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও স্পষ্ট। টি-শার্টের স্লোগানের মাধ্যমে কেউ যদি গা ঘেঁষে দাঁড়াতে বারণ করে, তাতে অসুবিধা কী? না দাঁড়ালেই হয়! এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই যে, স্লোগানটির অন্তর্নিহিত নিশানা বিকৃত মানসিকতার পুরুষ যাত্রীরা, যারা ইচ্ছাকৃত গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। টি-শার্টের স্লোগানে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠা ‘আমি কলা খাই না’ প্রতিক্রিয়া ছাড়া কী?

হ্যাঁ, বন্ধু-স্বজন-পরিবারের সঙ্গে গা ঘেঁষে দাঁড়ানোই যেতে পারে। এ ক্ষেত্রেও অপরপক্ষের পছন্দ-অপছন্দ বিবেচনায় রাখতে হবে। মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধনেও আমরা গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়াই। জনপরিবহনে নারী নিগ্রহের প্রতিবাদেও দাঁড়িয়ে যেতে পারি। জনপরিবহনে নারী নিগ্রহের ঘটনায় অধিকাংশ মানুষই নিশ্চুপ থাকেন এবং একটি অংশ বরং নারীকেই দোষী সাব্যস্ত করেন। আর প্রতিবাদীর সংখ্যা অতি সামান্য। রুখে দাঁড়াতে গিয়ে তারা যদি গায়ে গা লাগিয়েও দেয়; টি-শার্টের স্লোগান মাইন্ড করবে না। আমি নিশ্চিত।

শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক

[email protected]