বিশ্লেষণ

আগুনের পরশমণি

 প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৯ | আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৯      

 শেখ রোকন

আগুনে ৮০ শতাংশের বেশি দগ্ধ হওয়া বলতে কী বোঝায়, ব্যান্ডেজে মোড়া নুসরাত জাহান রাফিকে দেখে আমরা খানিকটা বুঝেছি। চিকিৎসকরা বুঝেছেন ফুসফুসসহ তার ভেতরের পোড়া ক্ষত। কিন্তু আমরা তার ভেতরের অদৃশ্যমান আগুনও দেখেছি। বন্ধুদের লেখা চিঠি, শ্লীলতাহানির পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্য এবং ঢাকার বার্ন ইনস্টিটিউটে শুয়ে দেওয়া 'ডেথ ডিক্লারেশন' থেকে বিচ্ছুরিত হতে দেখেছি তার ভেতরের অগ্নি স্ফুলিঙ্গ।

শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান 'সেকেন্ড হোম' বা দ্বিতীয় বাড়ি। শিক্ষক-শিক্ষিকারা যে গৃহের অভিভাবক, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধে মাতা-পিতার মতো। সেই দ্বিতীয় বাড়িতেই অভিভাবকতুল্য শিক্ষকদের হাতে কত নারী এমনকি পুরুষ শিক্ষার্থী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়! কিন্তু কয়টা অঘটন প্রকৃত অভিভাবকরা জানতে পারেন? জানতে পারলেও অভিযোগ করেন কতজন? তথাকথিত সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে চেপে গিয়ে নিজের সন্তানকেই সতর্কতা অবলম্বনের উপদেশ দেন বা বড়জোর বিদ্যালয় পরিবর্তন করেন বেশিরভাগ অভিভাবক। আইনগত পথে আরও কম হাঁটেন আক্রান্ত নারী বা তার অভিভাবকরা।

সেখানে ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত নিজে প্রতিবাদ করেছেন এবং অভিভাবক ও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন। সেখানেই শেষ নয়; যৌন নিগ্রহের শিকার অধিকাংশ নারীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্র আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কতজন আক্রান্ত নারী বা কন্যাসন্তান বলতে পারেন– 'আমি লড়ব শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত?'

নুসরাত জাহান রাফি শুধু নিজের জন্য যে লড়াকু ছিলেন না- এর প্রমাণ আমরা পাই তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার দিনটিতে। পাশের ভবনে তার এক বান্ধবীকে মারধর করা হচ্ছে– এই ভুয়া খবর পেয়েই তিনি পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন অকুস্থলে। মাত্র কয়েক দিন আগে নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছেন; অভিযুক্ত অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন তাকে ও পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ ও হুমকি দিচ্ছে; নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় ভাই তাকে মাদ্রাসার ফটক পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেছেন। বড় কথা; আর কয়েক মিনিট পর পরীক্ষা শুরু হবে; এমন পরিস্থিতিতেও ক'জন পারবে বান্ধবীকে মারধরের খবর শুনে একা এগিয়ে যাওয়ার? নুসরাতের আগে কেউ কখনও এমন দুঃসাহস ও লড়াকু মনোভাব দেখিয়েছেন কি-না আমাদের জানা নেই।

দৃশ্যত আটক অধ্যক্ষের অপরাধী চক্রের সদস্যদের আগুনে দগ্ধ হওয়ার পরও নুসরাত জাহান রাফি স্পষ্টত ভেঙে পড়েননি। যৌন নিপীড়ক ও হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে নিজে লড়াইয়ের প্রত্যয় তো ব্যক্ত করেছেনই; লড়াইটা ফেনীর বাইরেও দেশের অন্যদের মধ্যেও সাফল্যের সঙ্গে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। তার ব্যক্তিগত যুদ্ধ ও যন্ত্রণা চিকিৎসক থেকে প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত স্পর্শ করেছে। তার লহু ও লড়াই কীভাবে জনসাধারণকে বিক্ষুব্ধ ও বেদনাহত করেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা তার প্রকাশ দেখেছি। তিনি হয়ে উঠেছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিগ্রহের শিকার নারীদের প্রতিনিধি। তিনি হয়ে উঠেছেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার মতো আরও শত যৌন নিপীড়নকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। তিনি যেন বাংলার জোয়ান অব আর্ক।

দুর্ভাগ্য আমাদেরই, নুসরাত জাহান রাফি শেষ পর্যন্ত নশ্বর পৃথিবীতে বাঁচতে পারেননি। কিন্তু তিনি হেরে যাননি। তাকে নিপীড়ন ও হত্যাকারীরা আর দশটা অঘটনের মতো যে পার পেয়ে যাবে না- সে ব্যাপারে আমরা বহুলাংশে নিশ্চিত। বড় কথা, তিনি যে লড়াই সূচিত করে গেছেন, তা অবিনশ্বর। আমরা যারা বেদনাহত হয়েছি, বিক্ষুব্ধ হয়েছি; নুসরাতের লড়াই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের। আমাদেরই স্বার্থে। জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন– 'যে মরে গেলো, সে বেঁচে গেলো আজকের দুনিয়ায়'। এক সিরাজ-উদ-দৌলা কারাগারে; শত সিরাজ ওঁৎ পেতে আছে সব জায়গায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রে সব ধরনের সব যৌন নিপীড়কের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে আমাদেরই।

নুসরাত জাহান রাফি নিজের শরীর ও জীবন দিয়ে যে আগুন জালিয়ে দিয়ে গেলেন, তা যেন আমাদের ভেতরের আগুন জ্বালানোর পরশমণি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা যে প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি, তার এক ভাগও যদি সামাজিক জীবনে দেখাই, আর কোনো সিরাজের হাতে আর কোনো নুসরাতকে প্রাণ দিতে হবে না।


লেখক ও সাংবাদিক
skrokon@gmail.com