করোনাবিরোধী লড়াইয়ে নেতার অভাবে মানবজাতি

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২০   

ইউভাল নোয়াহ হারারি

করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অনেক দেশের সীমান্ত

করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অনেক দেশের সীমান্ত

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বিশ্বায়নের কারণেই এ সংক্রমণ বাড়ছে। আর এ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা। এজন্য এরই মধ্যে অনেক দেশ ভ্রমণে এমনকি ব্যবসার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বল্প-মেয়াদি সঙ্গরোধ (কোয়ারেন্টাইন) মহামারী রোধ করতে পারে, কিন্তু এমন রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ না গড়ে দীর্ঘমেয়াদী আইসোলেশনে গেলে অর্থনৈতিক পতন ঘটবে। এ কারণে মহামারীর আসল প্রতিষেধক হলো সহযোগিতা, পৃথককরণ নয়।

বর্তমান বিশ্বায়নের আগেও মহামারীতে বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ মারা যাবার রেকর্ড আছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে কোনো বিমান কিংবা ক্রুজ জাহাজ ছিল না । তারপরও পূর্ব এশিয়া থেকে পশ্চিম ইউরোপে প্লেগের কারণে সাড়ে সাত থেকে ২০ কোটি মানুষ মারা যায়। ওই মহামারিতে ইংল্যান্ডে প্রতি দশজনের মধ্যে চারজন মারা গিয়েছিলেন। ফ্লোরেন্স শহরের ১ লাখ বাসিন্দার মধ্যে ৫০ হাজার জন ওইসময় প্লেগে মারা যায়

১৫২০ সালের মার্চ মাসে ফ্রান্সেস্কো দে ইগুয়া নামের একজন গুটিবসন্ত নিয়ে মেক্সিকোতে আসেন। ওই সময় মধ্য আমেরিকা থেকে চলাচলের জন্য কোনো ট্রেন, বাস এমনকি গাধাও ছিল না। কিন্তু ডিসেম্বরের মধ্যে গুটিবসন্ত মহামারী আকার ধারণ করে ওই এলাকায়। গুটিবসন্তে ওই সময় মধ্য আমেরিকার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। 

১৯১৮ সালে এক ধরনের ফ্লু আঘাত হানে পৃথিবীতে। কয়েক মাসের এটি বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে মারাত্মক আকার ধারন করে। ওই ফ্লুতে বিশ্বের প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়। ওই সময়ের হিসেবে পৃথিবীর প্রায় এক চতুর্থাংশেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয় ওই ফ্লুতে।। ধারনা করা হয়, ওই ফ্লুতে ভরতের প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ মারা যায়। এছাড়া তাহিতি দ্বীপের ১৪ শতাংশ, সামায়োতে ২০ শতাংশ মানুষ মারা যায়। এক বছরেরও কম সময়ে ওই মহামারীতে ১০০ মিলিয়নের মতো মানুষ মারা যায়, যা কিনা চার বছরের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যত মানুষ মারা গেছে তার চেয়েও বেশি। 

১৯১৮ সালের পর জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং উন্নত পরিবহনের ব্যবস্থার কারণে মানবজাতির মহামারীর আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। যেকোন ভাইরাসের জন্যই ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্যারিস থেকে টোকিও কিংবা মেক্সিকোতে যাওয়া সহজ হয়। 

তারপরও আগের তুলনায় মহামারীর ঘটনা এবং প্রভাব দুটিই নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। বিশ্ব এ সময় এইডস ও ইবোলার মতো ভয়াবহ রোগ দেখলেও পাথর যুগের চেয়ে অনেক কম মানুষই এসব রোগে মারা গেছে। কারণ এ ধরনের রোগের বিরুদ্ধে মানুষ একাত্ম হয়েছে, আইসোলেশনে যায়নি। মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানবজাতি জয়ী করেছে। 

চতুর্দশ শতাব্দীতে প্লেগ যখন মহামারি রূপ নেয় তখন মানুষের ধারণা ছিল না এটা কেন ও কী কারণে হচ্ছে। এ রোগ থেকে পরিত্রাণেরই বা উপায় কী? আধুনিক বিশ্বের আগে বেশিরভাগ মানুষের ধারণা ছিল দেব-দেবী রেগে গেলে, খারাপ বাতাসের কারণে ব্যকটেরিয়া, ভাইরাস ছড়ায়। মানুষজন রোগ থেকে মুক্তির জন্য দেবদূত ও পরীদের বিশ্বাস করতো। তাদের ধারনাতেও ছিল না একফোঁটা পানি থেকেও প্রাণঘাতি রোগ হতে পারে। এ কারণে যখন প্লেগ কিংবা গুটিবসন্তের মতো রোগ মহামারী আকার ধারণ করেছে তখন মানুষ বিভিন্ন দেবতা ও সন্ন্যাসীদের কাছে গণপ্রার্থনার আয়োজন করেছে। প্রকৃতপক্ষে, তারা যখন প্রার্থনার জন্য একত্রিত হয়েছে তখন সংক্রমণ আরও বেড়ে গেছে। 

গত শতাব্দীতে গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, নার্সরা মহামারীর প্রক্রিয়া এবং তা মোকাবেলার প্রক্রিয়া বুঝেছিলেন। বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী, কীভাবে নতুন রোগগুলো ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরাতন রোগগুলো আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে সেটা জেনেছেন বিজ্ঞানীরা। যদিও মধ্যযুগীয় লোকেরা কখনই প্লেগে মৃত্যুর কারণ আবিষ্কার করতে পারেননি। অন্যদিকে নভেল করোনাভাইরাস সনাক্ত করতে বিজ্ঞানীরা মাত্র দুই সপ্তাহ সময় নিয়েছেন। 

যখন বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন ঠিক কী কারণে মহামারীটি ছড়িয়েছে তখন তার বিরুদ্ধে লড়াই করা তাদের জন্য সহজ হবে। প্রতিষেধক, অ্যান্টিবায়োটিক, উন্নত স্বাস্থ্যবিধি, চিকিৎসার অবকাঠামো মানবজাতিকে এর আগেও ভয়ানক রোগ-জীবাণু থেকে রক্ষা করেছে।  ১৯৬৭ সালে গুটিবসন্তে ২ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। কিন্তু পরের দশকে এর টিকা এতটাই সফল হয়েছিল যে, ১৯৭৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করেছিল মানবতা জিতেছে আর গুটিবসন্ত পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য মানবতার সীমান্ত রক্ষা করা দরকার, দেশগুলোর সীমানা নয়। এর চেয়ে মানববিশ্বের এবং ভাইরাসগোলকের মধ্যে সীমান্তরেখা তৈরি দরকার। পৃথিবী নামক এই গ্রহে অগণিত ভাইরাস ভাসছে, নতুন নতুন ভাইরাস বিকশিত হচ্ছে। যদি বিপজ্জনক কোনো ভাইরাস সীমানা ভেদ করে পৃথিবীর যে কোনো জায়গা দিয়ে প্রবেশ করে তাহলে তা গোটা মানবজাতিকে বিপদে ফেলতে পারে। 

বর্তমানে মানবজাতি কেবল করোনভাইরাসের কারণে নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের আস্থার অভাবের কারণেও তীব্র সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। মহামারীকে হারাতে মানবজাতিকে বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হবে। অন্যদিকে নাগরিকদের নিজ নিজ সরকারি কর্তৃপক্ষের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে । কিন্তু গত কয়েক বছরে রাজনীতিকরা যাচ্ছেতাইভাবে বিজ্ঞানের প্রতি বিশ্বাসের অবমাননা করেছে, জনকর্তৃত্ব ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর থেকে বিশ্বাস হারিয়েছে। এ কারণে এখন বিশ্বে সেই নেতার অভাব দেখা যাচ্ছে যিনি জনগণকে উৎসাহিত ও সংগঠিত করতে পারেন; বিশ্বের প্রয়োজনে অর্থের সংস্থান করতে পারেন।

সংকটময় এই মুহূর্তে দেশগুলোর একে অপরের ওপর বিশ্বাস রাখা দরকার। বিশ্ব নেতাদের অনেক দায়িত্বহীনতার কারণে গোটা পৃথিবী আজ সঙ্কটের মুখোমুখি পড়েছে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় তাই এখন প্রয়োজন বৈশ্বিক সমন্বয়। সবাইকে একসঙ্গে সংগঠিত হয়ে অর্থায়ন করে এ সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে।

বিশ্বনেতাদের সুযোগ এসেছে আবার মানুষের আস্থা অর্জন করার। মানবজাতি যদি এক হয়, তাহলে শুধু এই ভাইরাস নয়, ভবিষ্যতের যেকোন ভাইরাসের বিরুদ্ধে তারাই জয়ী হবে, ভাইরাস নয়।  

নোয়াহ হারারি, ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক। টাইম ডট কম থেকে লেখাটি ভাষান্তর করেছেন তাসলিমা তামান্না। ঈষৎ সংক্ষেপিত।