করোনাভাইরাসের পরের বিশ্ব

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২০     আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২০   

য়ুভাল নোয়া হারারি

মানবজাতি এখন এক বিশ্বব্যাপী সঙ্কটের মুখোমুখি। সম্ভবত আমাদের প্রজন্মের বৃহত্তম সংকট। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে কী কী সিদ্ধান্ত নেয়, সম্ভবত তার ওপর নির্ভর করবে আগামী বছরগুলোতে বিশ্ব কেমন রূপ নেবে। তারা যে কেবল আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কেমন হবে তা ঠিক করবে, তা নয়; আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতিকেও নতুন রূপ দেবে তারা। আমাদের অবশ্যই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে হবে। আর সেই সঙ্গে, আমাদের কার্যকলাপের দীর্ঘমেয়াদী পরিণতিগুলোও ভেবে দেখা উচিত। বিকল্পগুলোর মধ্যে বেছে নেবার সময়, শুধু যে নিজেদের জিজ্ঞাসা করা উচিত, কীভাবে তাৎক্ষণিক হুমকিকে কাটিয়ে উঠতে হবে, তা-ই নয়, ঝড় শেষ হয়ে গেলে আমরা কেমন বিশ্বে বাস করব, সে প্রশ্নটিও করতে হবে। হ্যাঁ, ঝড়টি কেটে যাবে, মানবজাতি বেঁচে থাকবে, আমাদের বেশিরভাগই বেঁচে থাকবে- তবে আমরা এক আলাদা পৃথিবীতে বাস করব।

অনেক স্বল্প-মেয়াদী জরুরি ব্যবস্থা জীবনে স্থায়ী হয়ে ওঠে। এটাই হল জরুরি অবস্থার চরিত্র। তারা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াগুলি দ্রুত এগিয়ে দেয়। সাধারণত যে সিদ্ধান্তগুলি বেশ কয়েক বছরের বিবেচনার পর নেওয়া হয়, এখন সেগুলো হয়ে ওঠে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। অপরিণত এবং এমনকি বিপজ্জনক প্রযুক্তিগুলোও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অনুমোদন পায়, কারণ কিছুই না করার ঝুঁকি আরও বড়। সমস্ত দেশগুলো বড় আকারের সামাজিক পরীক্ষায় গিনিপিগ হিসেবে কাজ করে। সবাই যখন বাড়ি থেকে কাজ করে, এবং কেবল দূর থেকে যোগাযোগ রাখে তখন কী ঘটে? স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে গেলে কী হয়? সাধারণ সময়ে, সরকার, ব্যবসা এবং শিক্ষাবোর্ডগুলো কখনও এ জাতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সম্মত হয় না। তবে, এ সাধারণ সময় নয়।

সঙ্কটের এই সময়ে, আমরা দুটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিকল্পের মুখোমুখি হই। প্রথমটি হ'ল সর্বগ্রাসী নজরদারি এবং নাগরিক ক্ষমতায়নের মধ্যে। দ্বিতীয়টি জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা এবং বিশ্বব্যাপী সংহতির মধ্যে।

ত্বকের নিচে নজরদারি

মহামারীটি বন্ধ করতে, সমগ্র জনসাধারণের নির্দিষ্ট নির্দেশিকা মেনে চলা প্রয়োজন। এটি অর্জনের দুটি প্রধান উপায় রয়েছে। একটি পদ্ধতি হল- জনগণের ওপর সরকারের নজরদারি, এবং যারা নিয়ম ভঙ্গ করে তাদের শাস্তি দেওয়া। আজ, মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তি সমস্ত সময় প্রত্যেকের ওপর নজরদারি করা সম্ভব করে তুলেছে। পঞ্চাশ বছর আগে, কেজিবি ২৪ কোটি সোভিয়েত নাগরিককে ২৪ ঘণ্টা অনুসরণ করতে পারতো  না, বা সংগ্রহ করা সমস্ত তথ্য কার্যকরভাবে প্রক্রিয়া করার আশা করতে পারতো না। কেজিবি মানব এজেন্ট এবং বিশ্লেষকদের ওপর নির্ভর করেছিল এবং প্রত্যেক নাগরিককে অনুসরণ করার জন্য এক একজন মানব এজেন্ট নিয়োগ করা সম্ভব ছিল না। তবে এখন সরকারগুলো রক্ত-মাংসের ভূতের পরিবর্তে সর্বব্যাপী সেন্সর এবং শক্তিশালী অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করতে পারে।

করোনাভাইরাস মহামারীর বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধে বেশ কয়েকটি সরকার ইতোমধ্যে নতুন নজরদারি সরঞ্জাম ব্যাবহার করেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নজির চীন। মানুষের স্মার্টফোনগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করে, লক্ষ লক্ষ ফেস রেকগনিশান ক্যামেরা ব্যবহার করে এবং মানুষের শরীরের তাপমাত্রা  ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা ও তা জানানো বাধ্যতামূলক করে চীন কর্তৃপক্ষ কেবল দ্রুত সন্দেহজনক করোনাভাইরাস বাহককে শনাক্ত করতে পেরেছে তা নয়, বরং তাদের গতিবিধির ওপর নজরদারি করে তারা যাদের সংস্পর্শে এসেছিল তাদেরও শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। একাধিক মোবাইল অ্যাপ নাগরিকদের সংক্রমিত রোগীদের সান্নিধ্য সম্পর্কে সতর্ক করে।


এই জাতীয় প্রযুক্তি কেবল পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি করোনভাইরাস রোগীদের সন্ধানে, সাধারণত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যবহৃত নজরদারি-প্রযুক্তি প্রয়োগের জন্য ইসরায়েল সিকিউরিটি এজেন্সিকে অনুমোদন দিয়েছেন। নির্দিষ্ট সংসদীয় উপ-কমিটি এই পদক্ষেপটি অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানালে নেতানিয়াহু একটি “এমারজেন্সি ডিক্রি” জারি করে তা প্রয়োগ করেন।

আপনি বলতে পারেন যে এসব নতুন কোন বিষয় নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সরকার এবং কর্পোরেশন উভয়ই মানুষকে অনুসরণ, পর্যবেক্ষণ এবং নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য আরও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে। তার পরেও যদি আমরা সতর্ক না হই, তবে এই মহামারীটি নজরদারির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ চিহ্নিত করতে পারে। যে দেশগুলি এ পর্যন্ত তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে, সেগুলোতেও গণ-নজরদারি সরঞ্জাম প্রয়োগের বিষয়টি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে, শুধু তাই নয়, বরং আরও বেশি, কারণ এটি "ত্বকের ওপর" থেকে "ত্বকের নীচ" পর্যন্ত নজরদারির নাটকীয় রূপান্তরকে নির্দেশ করে।

এখন পর্যন্ত, যখন আপনার আঙুলটি আপনার স্মার্টফোনের স্ক্রিনটি স্পর্শ করেছে এবং একটি লিঙ্কে ক্লিক করেছে, তখন সরকার আপনার আঙুলটি ঠিক কী ক্লিক করছে তা জানতে চেয়েছিল। এবার করোনাভাইরাস আগ্রহের ফোকাসটি দিল বদলে। এখন সরকার আপনার আঙুলের তাপমাত্রা এবং তার ত্বকের নীচে রক্তচাপ জানতে চায়।

জরুরি পুডিং

নজরদারি ব্যবস্থার মধ্যে আমরা ঠিক কোন অবস্থায় রয়েছি তা বোঝার একটি সমস্যা হল আমাদের মধ্যে কেউই সঠিকভাবে জানি না যে আমাদের কীভাবে জরিপ করা হচ্ছে এবং আগামী বছরগুলো কী নিয়ে আসতে পারে। নজরদারি প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে বিপজ্জনক গতিতে এবং ১০ বছর আগে যা কল্পবিজ্ঞান বলে মনে হয়েছিল তা আজ পুরানো খবর। একটি চিন্তার পরীক্ষা হিসেবে, একটি আনুমানিক সরকারের কথা ভাবুন, যা দাবি করে যে প্রতিটি নাগরিক বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরবেন যা শরীরের তাপমাত্রা এবং হার্ট-রেটকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করবে। সরকার ফলাফলের ডেটা মজুত করে এবং তাদের তৈরি অ্যালগরিদম দ্বারা বিশ্লেষণ করে। আপনি জানার আগেই অ্যালগরিদমগুলো জানবে যে আপনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং আপনি কোথায় ছিলেন এবং কাদের সাথে দেখা করেছেন তাও তারা জানতে পারবে। সংক্রমণের শেকলগুলি বহুলাংশে সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে এবং এমনকি পুরোপুরি ছিন্ন করে দেওয়া যেতে পারে। এই ধরনের পদ্ধতি তর্কসাপেক্ষে কয়েক দিনের মধ্যে মহামারীটি পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে। চমৎকার, তাই না?

যদিও, এর নেতিবাচক দিকটি হল এই, যে এটি একটি ভয়াবহ নতুন নজরদারি ব্যবস্থাকে বৈধতা দেবে। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি জানেন, যে আমি সিএনএন লিঙ্কের পরিবর্তে ফক্স নিউজ লিঙ্কটিতে ক্লিক করেছি, তবে তা আপনাকে আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং এমনকি আমার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু শেখাতে পারে। কিন্তু, আমি ভিডিও ক্লিপটি দেখার সময় যদি আমার শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দনের কেমন তা আপনি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, তবে আপনি জানতে পারবেন কী আমাকে হাসায়, কী আমাকে কাঁদায় এবং কী আমাকে সত্যই রাগিয়ে তোলে।

এটা মনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে রাগ, আনন্দ, একঘেয়েমি এবং ভালবাসা; জ্বর এবং কাশির মতই জৈবিক ঘটনা। কাশি শনাক্তকারী একই প্রযুক্তি হাসিও চিহ্নিত করতে পারে। কর্পোরেশন এবং সরকারগুলো যদি সম্মিলিতভাবে আমাদের বায়োমেট্রিক ডেটা সংগ্রহ শুরু করে তবে আমাদের নিজেদের চেয়ে তারা আমাদের আরও অনেক ভালো জানতে পারে এবং শুধু যে আমাদের অনুভূতির পূর্বাভাস দিতে পারে তাই না, আমাদের অনুভূতিগুলিকে চালিতও করতে পারে এবং আমাদের যেকোনও কিছু বিক্রি করতে পারে - সেটি পণ্য হোক অথবা একজন রাজনীতিবিদ। বায়োমেট্রিক নিরীক্ষণ-এর পাশে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা-র ডেটা হ্যাকিংয়ের কৌশলকে প্রস্তর যুগের মতো দেখায়। ২০৩০ সালের উত্তর কোরিয়া কল্পনা করুন, যখন প্রত্যেক নাগরিককে ২৪ ঘন্টা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরতে হবে। আপনি যদি মহান নেতার একটি বক্তৃতা শোনেন এবং ব্রেসলেটটি রাগের মূর্ত হওয়া লক্ষণগুলি তুলে ধরে তবে আপনার শেষ ঘণ্টা বেজেছে।


আপনি অবশ্যই বায়োমেট্রিক নজরদারিকে জরুরি অবস্থার সময় নেওয়া অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসাবে দেখতে পারেন। জরুরি অবস্থা শেষ হয়ে গেলে এটিও চলে যাবে। তবে জরুরি অবস্থাগুলির সময় নেওয়া অস্থায়ী বিধিগুলির একটি বাজে দিক হল যে এইগুলি থেকে যায়। বিশেষত, যেহেতু দিগন্তে সর্বদা আর একটি নতুন জরুরি অবস্থা অপেক্ষায় থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ইসরায়েল ১৯৪৮-এর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল, যেটি প্রেস সেন্সরশিপ এবং জমি বাজেয়াপ্তকরণ থেকে শুরু করে এমনকি পুডিং তৈরির জন্য বিশেষ বিধি (আমি আপনাকে বোকা বানাচ্ছি না) ইত্যাদি কয়েকটি অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধ দীর্ঘকাল হল জেতা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ইসরায়েল কখনও জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করেনি, এবং ১৯৪৮-এর অনেকগুলো "অস্থায়ী" ব্যবস্থা বাতিল করতে ব্যর্থ হয়েছে (জরুরি পুডিং ডিক্রিটি ২০১১ সালে করুণা করে বাতিল করা হয়েছিল)।

এমনকি যখন করোনাভাইরাস সংক্রমণটি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে, কিছু ডেটা-ক্ষুধার্ত সরকার বায়োমেট্রিক নজরদারি ব্যবস্থাগুলোকে রাখার জন্য যুক্তি দেখাতে পারে যে করোনাভাইরাসের একটি দ্বিতীয় ঢেউ আসার ভয় আছে, বা মধ্য আফ্রিকায় একটি নতুন ইবোলা স্ট্রেন বিকশিত হচ্ছে, অথবা ... আপনি বুঝে নিন। আমাদের গোপনীয়তা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একটি বড় লড়াই চলছে। করোনাভাইরাস সংকটটি সেই যুদ্ধের শীর্ষবিন্দু হয়ে উঠতে পারে, কেননা, মানুষকে যখন গোপনীয়তা এবং স্বাস্থ্যের মধ্যে একটিকে পছন্দ করে নিতে বলা হবে, তখন তারা সাধারণত স্বাস্থ্যকে বেছে নেবে। 

সাবান পুলিশ

মানুষকে গোপনীয়তা এবং স্বাস্থ্যের মধ্যে চয়ন করতে বলা আসলে, সমস্যার মূল কারণ। কারণ এটি মিথ্যা বিকল্পের খেলা। গোপনীয়তা এবং স্বাস্থ্য দুটোই আমাদের উপভোগ করার বিষয় এবং করা উচিত। আমরা আমাদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা এবং করোনভাইরাস মহামারী বন্ধ করা বেছে নিতে পারি নিরঙ্কুশ নজরদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নয়, বরং নাগরিকদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে, করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে সফল কয়েকটি প্রচেষ্টা দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এবং সিঙ্গাপুর দ্বারা সম্ভব হয়েছিল। যদিও এই দেশগুলি ট্র্যাকিং অ্যাপ্লিকেশনগুলির কিছুটা ব্যবহার করেছিল, তবে তারা অনেক বেশি করে নির্ভর করেছে পরীক্ষার উপর, সৎ প্রতিবেদনের ওপর এবং শিক্ষিত জনগণের স্বেচ্ছা-সহযোগিতার ওপর। 

কেন্দ্রীয় নজরদারি এবং কঠোর শাস্তি মানুষকে উপকারী নির্দেশিকা মেনে চলতে বাধ্য করার একমাত্র উপায় নয়। যখন মানুষকে বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্পর্কে অবহিত করা হয় এবং যখন মানুষ কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনের উপর আস্থা রাখতে পারেন, তখন তারা তাদের কাজ, এমনকি কোন “বড় ভাই” নজর না রাখলেও, সঠিকভাবে করেন। একটি স্ব-অনুপ্রাণিত এবং সু-সচেতন জনগণ, একটি পুলিশ-তাড়িত, অজ্ঞ জনগণের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং কার্যকর।


উদাহরণস্বরূপ, সাবান দিয়ে আপনার হাত ধোয়া বিবেচনা করুন। এটি মানব স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অগ্রগতির নিদর্শন। এই সাধারণ ক্রিয়াটি প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ জীবন বাঁচায়। আমরা এখন এটিকে অতি স্বাভাবিক বলে মনে করলেও, বিজ্ঞানীরা সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব আবিষ্কার করেছিলেন মাত্র কিছুদিন আগে, এই ১৯ শতকে। এর আগে, এমনকি চিকিৎসকরা এবং নার্সরাও হাত না ধুয়ে একটি সার্জিকাল অপারেশন থেকে আরেকটির দিকে এগিয়ে যেতেন। আজকে লক্ষ-কোটি মানুষ প্রতিদিন সাবান দিয়ে হাত ধোন, সেটা তারা করেন সাবান পুলিশকে ভয় করার কারণে নয়, বরং সত্যগুলি বোঝার কারণে। আমি সাবান দিয়ে আমার হাত ধুয়েছি কারণ আমি ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে শুনেছি, আমি বুঝতে পেরেছি যে এই ক্ষুদ্র জীবগুলি রোগের কারণ হয় এবং আমি জানি যে সাবান সেগুলিকে নির্মূল করতে পারে।

তবে এরকম সম্মতি এবং সহযোগিতার একটি স্তরে উন্নিত হতে দরকার আস্থা অর্জনের। মানুষকে বিজ্ঞানের ওপর ভরসা রাখতে হবে, সরকারী কর্তৃপক্ষের ওপর আস্থা রাখতে হবে, এবং মিডিয়াকে বিশ্বাস করতে হবে। বিগত কয়েক বছর ধরে দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিজ্ঞানের ওপর, সরকারী কর্তৃপক্ষের ওপর এবং মিডিয়ার ওপর মানুষের বিশ্বাস ধ্বংস করে চলেছেন। এখন এই একই দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা কর্তৃত্ববাদের মহাসড়কে চলার প্রলোভনে পা রাখছেন। তাদের যুক্তি, জনসাধারণের ওপর বিশ্বাস রাখা যাবে না, যে তারা সঠিক আচরণ করবেন।

সাধারণত, বছরের পর বছর ধরে হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস রাতারাতি পুনর্নির্মাণ করা যায় না। তবে এটা স্বাভাবিক সময় নয়। সংকটের মুহূর্তে মনও দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। আপনি বছরের পর বছর ধরে আপনার ভাইবোনদের সাথে তিক্ত বিতর্ক করতে পারেন, তবে যখন জরুরি কিছু ঘটে তখন আপনি হঠাৎ বিশ্বাস এবং স্নেহের একটি লুকানো আধার আবিষ্কার করেন এবং একে অপরকে সাহায্য করার জন্য ছুটে যান। নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিবর্তে বিজ্ঞান, সরকারী কর্তৃপক্ষ এবং মিডিয়াতে মানুষের বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ এখনও করা যায়, খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি। আমাদের অবশ্যই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত, তবে এই প্রযুক্তিগুলির সাহায্যে নাগরিকদের ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করা উচিত। আমি আমার শরীরের তাপমাত্রা এবং রক্তচাপ পর্যবেক্ষণের পক্ষে, তবে সেই ডেটা কোনভাবেই একটি সর্বশক্তিমান সরকার গঠনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে না। বরং, সেই ডেটাটি আমাকে আরও তথ্য-সচেতন করে আমার ব্যক্তিগত পছন্দ বেছে নিতে এবং সরকারের সিদ্ধান্তের জন্য তার জবাবদিহি করতে সক্ষম করবে।

যদি আমি নিজের স্বাস্থ্য-পরিস্থিতি ২৪ ঘণ্টা ট্র্যাক করতে পারি, তবে আমি যে কেবল অন্যের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছি কিনা তা জানতে পারি তাই নয়, বরং কোন অভ্যাসগুলি আমার স্বাস্থ্যের জন্য ভাল, তাও জানতে পারি। এবং যদি আমি করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান জানতে পারি এবং তা বিশ্লেষণ করতে পারি, তবে আমি বিচার করতে সক্ষম হব যে সরকার আমাকে সত্য বলছে কিনা এবং মহামারী মোকাবেলায় সঠিক নীতি গ্রহণ করছে কিনা। মানুষ যখনই নজরদারি নিয়ে কথা বলেন, মনে রাখবেন যে একই নজরদারি প্রযুক্তি সাধারণত শুধু সরকার দ্বারা নাগরিকদের ওপর নজরদারিরর জন্যই নয়, বরং নাগরিকদের দ্বারা সরকারের ওপর নজরদারির জন্যেও বটে।

করোনভাইরাস মহামারী তাই নাগরিকত্বের একটি বড় পরীক্ষা। সামনের দিনগুলোতে, আমাদের প্রত্যেকের উচিত ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং আত্মসেবায় মগ্ন রাজনীতিবিদদের চেয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করা। আমরা যদি সঠিকটি বেছে নিতে ব্যর্থ হই এই ভেবে, যে আমাদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষার একমাত্র উপায় এটিই, তবে আমরা আমাদের সর্বাধিক মূল্যবান স্বাধীনতাকে হারাবো।

প্রয়োজন একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা 

আমাদের দ্বিতীয় বিকল্পটি জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতা এবং বিশ্বব্যাপী সংহতির মধ্যে। মহামারী এবং এর ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক সংকট উভয়ই বিশ্বব্যাপী সমস্যা। কেবলমাত্র বিশ্বব্যাপী সহযোগিতায় এগুলো কার্যকরভাবে সমাধান করা যেতে পারে।

প্রথম এবং প্রধানতম হল, ভাইরাসকে পরাস্ত করার জন্য বিশ্বব্যাপী তথ্য ভাগ করে নেওয়া দরকার। ভাইরাসের থেকে মানুষ এই ক্ষেত্রে অনেক সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। চীনে একটি করোনাভাইরাস এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি করোনভাইরাস কীভাবে মানুষকে সংক্রামিত করতে হবে সে সম্পর্কিত টিপস-এর আদানপ্রদান করতে পারে না। তবে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে করোনাভাইরাস এবং কীভাবে তার মোকাবেলা করতে হবে সে সম্পর্কে অনেক মূল্যবান শিক্ষা দিতে পারে। একজন ইতালীয় চিকিৎসক খুব ভোরে মিলানে যা আবিস্কার করেছেন, তা হয়ত সন্ধ্যায় তেহরানে অনেক জীবন বাঁচাতে পারে। যখন যুক্তরাজ্য সরকার অনেক নীতিমালার মধ্যে থেকে সঠিকটি বেছে নিতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে, তখন তারা কোরিয়ানদের পরামর্শ নিতে পারে যারা ইতিমধ্যে এক মাস আগে একই ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। তবে এটি হওয়ার জন্য আমাদের বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা এবং বিশ্বাসের মনোভাব দরকার। 

দেশগুলোকে স্বেচ্ছায়, প্রকাশ্যে তথ্য ভাগ করে নিতে হবে এবং নম্রভাবে অন্য দেশের পরামর্শ চাইতে হবে, এবং প্রাপ্ত ডেটা ও সূক্ষ্মদর্শিতায় আস্থা রাখতে পারতে হবে। চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে এবং বিতরণেও বিশ্বব্যাপী যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন, বিশেষত টেস্টিং কিটস এবং শ্বাসযন্ত্রের মেশিনগুলি। প্রতিটি দেশের স্থানীয়ভাবে এটি উৎপাদন করার চেষ্টা এবং যেখানে যা পাওয়া যায় মজুত করার পরিবর্তে, একটি সমন্বিত বৈশ্বিক প্রচেষ্টা উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করতে পারে এবং জীবনরক্ষার সরঞ্জামগুলোর আরও সুষ্ঠু বিতরণ নিশ্চিত করতে পারে। একটি যুদ্ধের সময় দেশগুলি যেমন মূল শিল্পগুলির জাতীয়করণ করে, ঠিক তেমনি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনের ক্ষেত্রগুলিকে "মানবিক" করার প্রয়োজন হতে পারে। সামান্য কয়েকটি করোনভাইরাসের ঘটনা পাওয়া গেছে এমন একটি ধনী দেশের উচিত একটি দরিদ্র দেশে, যেখানে অনেক সংক্রমণ ছড়িয়েছে, মূল্যবান সরঞ্জাম প্রেরণে ইচ্ছুক হওয়া। বিশ্বাস রাখা উচিত, যে পরবর্তী সময়ে যদি সাহায্যের প্রয়োজন হয় তবে অন্যান্য দেশগুলিও তার পাশে দাঁড়াবে।

চিকিৎসা-কর্মীদের একত্র করার জন্য একই জাতীয় বিশ্বপ্রচেষ্টা বিবেচনা করা যেতে পারে। বর্তমানে কম আক্রান্ত দেশগুলো তাদের চিকিৎসাকর্মী পাঠাতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চলে - প্রয়োজনের সময় তাদের পাশে দাঁড়াবার জন্যে এবং মূল্যবান অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যেও। পরে যদি মহামারীর ক্রিয়া-কেন্দ্র স্থানপরিবর্তন করে তবে সাহায্য বিপরীত দিক থেকেও আসতে পারে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা অত্যাবশ্যকরূপে প্রয়োজন। অর্থনীতি ও সরবরাহ-শৃঙ্খলের বৈশ্বিক প্রকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে, যদি প্রতিটি সরকার অন্যের প্রয়োজন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নিজের কাজটুকু নিয়েই থাকে তবে ফলাফল হবে বিশৃঙ্খলা এবং একটি গভীরতর সঙ্কট। আমাদের একটি বিশ্বব্যাপী পরিকল্পনা প্রয়োজন এবং এটি প্রয়োজন দ্রুত।

আর একটি প্রয়োজনীয়তা ভ্রমণের বিষয়ে একটি বিশ্বব্যাপী চুক্তিতে আসা। কয়েক মাস ধরে সমস্ত আন্তর্জাতিক ভ্রমণ স্থগিত করা ভয়ঙ্কর সমস্যার সৃষ্টি করবে এবং করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে বাধাগ্রস্ত করবে। অন্তত, অত্যাবশ্যক প্রয়োজনীয় ভ্রমণকারীদের সীমানা অতিক্রম করা অব্যাহত রাখার জন্য দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা দরকার: বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ব্যক্তি ইত্যাদি। এটি নিজের নিজের দেশের ভ্রমণকারীদের আগে থেকে পরীক্ষা করার বিষয়ে একটি বিশ্বব্যাপী চুক্তিতে পৌঁছানোর মাধ্যমে করা যেতে পারে। আপনি যদি জানেন যে কেবল সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করা ভ্রমণকারীদেরই বিমানে উঠতে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তবে আপনি তাদের আপনার দেশে গ্রহণ করতে আরও আগ্রহী হবেন। 

দুর্ভাগ্যক্রমে, বর্তমানে খুব কম দেশ-ই এগুলো করে। একটি যৌথ পক্ষাঘাত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গ্রাস করেছে। ঘরে কোনও পরিণতবয়স্ক নেই বলে মনে হচ্ছে। বেশ কয়েক সপ্তাহ আগেই একটি সাধারণ পরিকল্পনা গ্রহণ করার জন্য বৈশ্বিক নেতাদের একটি জরুরি বৈঠক প্রত্যাশিত ছিল। জি-৭ নেতারা কেবল এই সপ্তাহে একটি ভিডিও কনফারেন্সের ব্যবস্থা করেছিলেন, এবং এর ফলে কোনও পরিকল্পনা গৃহীত হয়নি।

পূর্ববর্তী বিশ্ব সংকটসমূহে - যেমন ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট এবং ২০১৪ সালের ইবোলা মহামারী- আমেরিকা বিশ্ব-নেতার ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তবে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন তার নেতার চাকরি পরিত্যাগ করেছে। তারা এটি খুব স্পষ্ট করে দিয়েছে যে মানবতার ভবিষ্যতের চেয়ে আমেরিকার মহানতার বিষয়ে তারা চিন্তা করে অনেক বেশি।


এই প্রশাসন এমনকি তার নিকটতম মিত্রদেরও ত্যাগ করেছে। এটি যখন ইইউ থেকে সমস্ত ভ্রমণ নিষিদ্ধ করেছিল, তখন এই কঠোর সিদ্ধান্তের সম্পর্কে ইইউর সাথে পরামর্শ করা দূরে থাক, ইইউ-কে অগ্রিম নোটিশ দেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেনি। নতুন কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের একচেটিয়া অধিকার কিনতে একটি জার্মান ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থাকে ১ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার মাধ্যমে এটি জার্মানিকে কলঙ্কিত করেছে। এমনকি যদি বর্তমান প্রশাসন অবশেষে অবস্থান পরিবর্তন করে এবং বিশ্বব্যাপী কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে আসে, তখনও কয়েকজন এমন এক নেতাকে অনুসরণ করবে যিনি কখনও দায়িত্ব নেন না, যিনি কখনও ভুলকে স্বীকার করেন না এবং যিনি সমস্ত দায় অন্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিয়মিত নিজের জন্য সমস্ত কৃতিত্ব দাবি করেন।

যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টি করা শূন্যতা অন্য দেশগুলো পূরণ না করে তবে যে কেবল বর্তমান মহামারীটি থামানোই অনেক বেশি কঠিন হবে তাই না,  এর উত্তরাধিকার আগামী অনেক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে বিষাক্ত করে দেবে। তবুও, প্রতিটি সঙ্কট একই সঙ্গে একটি সুযোগও। আমাদের অবশ্যই আশা করা উচিত যে বর্তমান মহামারী মানবজাতিকে বিশ্বব্যাপী বিভেদ দ্বারা সৃষ্ট তীব্র বিপদ উপলব্ধি করতে সহায়তা করবে।

মানবজাতির আজ একটি বিকল্প বেছে নেওয়া আশু প্রয়োজন। আমরা কি বৈষম্যের পথে যাত্রা করব, না আমরা বিশ্ব সংহতির পথ অবলম্বন করব? যদি আমরা বিভেদ বেছে নিই, তবে এটি কেবল সংকটকে দীর্ঘায়িত করবে না, ভবিষ্যতে সম্ভবত আরও খারাপ বিপর্যয়ের কারণ হবে। আমরা যদি বিশ্বব্যাপী সংহতির পক্ষে থাকি, তবে এটি কেবল করোনভাইরাসদের বিরুদ্ধে নয়, ভবিষ্যতের সমস্ত মহামারী এবং সংকটের বিরুদ্ধেও বিজয়ী হবে যা একবিংশ শতাব্দীতে মানবসমাজকে জর্জরিত করতে পারে। 

মূল লেখক:  অধ্যাপক য়ুভাল নোয়া হারারি একজন ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক। তিনি “Sapiens”, Homo Deus” এবং “21 Lessons for the 21st Century”-এর লেখক।

ইংরেজি থেকে অনুবাদঃ পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গ্রন্থাগারিক, গ্যোটে ইনস্টিটিউট, কলকাতা।