সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে বর্জ্য বিপর্যয়ের শঙ্কা

অবৈধ পাইপলাইনে নদীতে ফেলা হচ্ছে বর্জ্য

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মিরাজ শামস

সাভারের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে বাঁ দিকের সড়কে এগোতেই বাঘমারা চৌরাস্তা। এই চৌরাস্তার কাছাকাছি গেলেই নাকে আসে চামড়ার পচা গন্ধ। এতেই জানা যায় চামড়া শিল্পনগরী কতদূর। ট্যানারির দূষণে বাতাসে বিকট গন্ধ। চামড়া শিল্পনগরীতে বর্তমানে চালু রয়েছে ১২৩টি ট্যানারি। এই অবস্থায় শিল্পনগরীতে ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর চামড়া আগামী সপ্তাহে আসতে শুরু করবে। এবার ঈদে সোয়া কোটির বেশি পশু কোরবানি হবে। এই পশুর চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা হবে শিল্পনগরীতে। সেখানে গত বারের চেয়ে এবার আরও ১০টি ট্যানারি নতুন করে উৎপাদনে এসেছে।

বর্তমানে ট্যানারির বর্জ্য নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে নগরীর দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প  করপোরেশন (বিসিক)। ঈদে যে পরিমাণ তরল বর্জ্য হবে তা পরিশোধনের সক্ষমতা নেই কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের (সিইটিপি)। এর ফলে একসঙ্গে এত ট্যানারি চালু হলে ঈদে ওই এলাকায় বর্জ্য বিপর্যয় দেখা দেবে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে বিসিক। ট্যানারি চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দু-চার দিন ছাড়া বেশিরভাগ সময় নির্ধারিত মানে পরিশোধন করতে পারেনি বলে জানায় তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান বুয়েট। এর পরে কোরবানির বাড়তি চামড়া নিয়ে আরও বেকায়দায় পড়তে হবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তা ও সিইটিপির কর্মকর্তারা।

বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, চামড়া শিল্পনগরীতে ১৫৪টি ট্যানারি পল্গট পেয়েছে। সর্বশেষ হিসাব মতে, এখন পর্যন্ত ১৫৪টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও এর মধ্যে ১২৩টি ট্যানারি রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে স্থানান্তর করে উৎপাদন শুরু করেছে। ঈদের পর সব ট্যানারি একসঙ্গে চালু হলে সিইটিপির পরিশোধন সক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বর্জ্য হবে। সিইটিপির ২৫ হাজার ঘনমিটার তরল বর্জ্য পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। এ বিষয়ে সিইটিপিতে কর্মরত শ্রমিক মো. জুয়েল জানান, এখনই মাঝে মধ্যে অনেক বেশি বর্জ্য সিইটিপিতে আসছে। ঈদের সময়ে অতিরিক্ত বেশি বর্জ্য পুরোপুরি পরিশোধন করা সম্ভব হবে না। তা ছেড়ে দিতে হবে। তা ছাড়া সিইটিপির অনেক যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে গেছে। নতুন করে যন্ত্রপাতি আমদানি হচ্ছে। তা ঈদের আগে স্থাপন করা না হলে আরও ভয়ানক সংকট দেখা দেবে।

গত সোমবার এক সভায় শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার জানিয়েছেন, কোরবানির পরে দুই থেকে তিন মাস চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপির ধারণ ক্ষমতার বেশি বর্জ্য পরিশোধন করা যাবে না। এ জন্য ট্যানারিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আগাম প্রস্তুতি নিতে পরামর্শ দেন তিনি। একই সঙ্গে শিল্পনগরীর আশপাশের শিল্পকারখানাগুলো যাতে নদীতে বর্জ্য ফেলতে না পারে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি।

চামড়া শিল্পনগরী সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের হরিণধরা এলাকায় শিল্পনগরীর সামনের একটি চায়ের দোকনে বসা স্থানীয়দের মধ্যে দূষণ সমস্যা নিয়ে চলছে তর্কবিতর্ক। এ সময় তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা অভিযোগ করেন, ট্যানারি আসার পর থেকেই সরকার আশ্বাস দিয়ে আসছে দূষণ বন্ধ করা হবে। কিন্তু গত তিন বছর ধরে দূষণের যন্ত্রণা থেকে পরিত্রাণ মিলছে না। শুধু বাতাসে দুর্গন্ধ নয়, এখন ধলেশ্বরী নদীর বুক চিরে বের হচ্ছে দূষিত বর্জ্য। যদিও আগে সরাসরি দেখা যেত নদীতে দূষিত বর্জ্যপানি ফেলা হচ্ছে। এখন তা পাইপের মাধ্যমে নদীর তলদেশ দিয়ে মাঝখানে ফেলা হচ্ছে। এখন বর্ষা মৌসুমে নদীতে স্বচ্ছ পানি থাকলেও নিচ থেকে চামড়ার বর্জ্যের দূষিত পানি ওপরে উঠে পুরো নদীর পানি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ প্রতিবেদককে তা ঘুরে দেখে যাওয়ার অনুরোধ করে তারা আরও বলেন, এবার ঈদের চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার আগে দূষণ সমাধান না হলে বায়ু ও পানিদূষণে এলাকায় থাকা দায় হয়ে পড়বে।

শিল্পনগরীর ভেতর দিয়ে শেষ মাথায় পৌঁছে সিইটিপির মধ্যে ঢুকতেই দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এর পরও ভেতরে ঢুকে শেষ দিকে এগোতেই দেখা যায় তরল বর্জ্য পরিশোধন করা পানি নদীতে ফেলার আগে একটি চেম্বারে জমা হয়। সেখানে পানির পাশে নাক চেপেও দাঁড়িয়ে থাকা দায়। এর আশপাশে শ্রমিকদের থাকার জন্য নির্মাণ করা শেডগুলোর চালা দূষণের কারণে খুলে পড়েছে। এই পানি এ পর্যন্ত যতবার পরীক্ষা করেছে ততবারই পরিবেশ অধিদপ্তর নির্ধারিত মানের চেয়ে খারাপ অবস্থার কথা জানিয়ে আসছে। এর পরও তেমন পরিবর্তন হয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

সিইটিপির ভেতর থেকে বের হয়ে নদীর পাড়ে গেলেও নদীতে ফেলার দৃশ্য চোখে পড়ে না। পরে স্থানীয়দের সহায়তা নৌকায় নদীর মধ্যে গিয়ে দেখা যায় চামড়া বর্জ্যের স্রোত নদীর তলদেশ থেকে আসছে। সত্যিই নদীর বুক চিরে বেরিয়ে আসছে ট্যানারির তরল বর্জ্য। এখন অল্প চামড়ার প্রক্রিয়াজাতকরণের দূষণে এই অবস্থা। ঈদে সারা বছরের অর্ধেকের বেশি চামড়া প্রক্রিয়াজাত শুরু হলে দূষণ দ্বিগুণ হবে। শুধু তরল বর্জ্যদূষণ নয়। কঠিন বর্জ্য স্তূপ হচ্ছে সিইটিপির পাশে নদীর পাড়ে ডাম্পিং ইয়ার্ডে। ঈদের সময়ে বাড়তি স্তূপ করা বর্জ্য অন্যত্র স্থানান্তর না করা হলে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে তা সরাসরি নদীতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ইতিমধ্যে কয়েক বার বাঁধ ভেঙে নদীতে পড়েছে। এবার একই পরিণতি হলে দূষণের ভয়াবহ সংকট তৈরি হবে।

ধলেশ্বরী নদীর এক পাড়ে চামড়া শিল্পনগরী। অন্য পাড়ে রয়েছে শাহ মেরিন রিসোর্ট। ওই রিসোর্টের কর্মচারী মো. জহির উদ্দিন জানান, আগে এই রিসোর্টে নিয়মিত পর্যটক আসতেন। দূষণ ও বাতাসে দুর্গন্ধের কারণে পর্যটক আসা প্রায় বন্ধের পথে।

বর্জ্য পরিশোধনের বিষয়ে শিল্প সচিব মো. আব্দুল হালিম বলেন, তরল বর্জ্য পরিশোধনের মান উন্নয়নের জন্য লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) পরামর্শ অনুযায়ী চেষ্টা চলছে। এলডব্লিউজির সিইটিপির তরল বর্জ্যের ১০০টি মানদণ্ড রয়েছে। মাঝে মধ্যে নির্ধারিত মানে পরিশোধন হচ্ছে। অনেক সময় মান অনুযায়ী হচ্ছে না। এ জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সিইটিপির ক্রোম সেপারেশন ও সেডিমেন্টেশনের মান উন্নত হচ্ছে। তবে এখনও পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। মান অনুযায়ী বর্জ্য পরিশোধন ও চামড়া শিল্পনগরী কমপ্লায়েন্স করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পের পরামর্শক বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, সিইটিপির বর্জ্য পরিশোধন এখনও এলডব্লিউজি মান অনুযায়ী হয়নি। তবে ওই মানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। এ জন্য যন্ত্রপাতি ও কেমিক্যাল আমদানি করা হয়েছে। এসব মালপত্র চট্টগ্রাম বন্দরে রয়েছে। এগুলো সংযোজন হলে সিইটিপির বর্জ্য পরিশোধনের মান আরও উন্নত হবে।

বাংলাদেশ ফিনিশ্‌?ড লেদার, লেদার গুডস, ফুটওয়্যার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন মাহিন বলেন, চামড়ার দূষণ বন্ধ না হওয়ায় রফতানির বাজার হারাতে হচ্ছে। এ কারণে এখন ৬০ শতাংশ চামড়া মজুদ রয়েছে। এবারও একই পরিস্থিতি হলে শুধু বর্জ্য দুরবস্থা নয়, পুরো চামড়া খাতে বিপর্যয় আসবে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাহিন আহমেদ জানান, বর্জ্যদূষণের কারণে চামড়া খাত শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিসিক এই দূষণ রোধ করতে না পারায় এ খাতে দুর্দিন চলছে। মানসম্মত সিইটিপি স্থাপন করার আগেই অপরিকল্পিতভাবে ট্যানারি স্থানান্তর করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।