করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে রাজধানী ছিল লকডাউন। একই সময় থেকে বন্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে কিছুটা কমেছে যান চলাচল। তবে এ সময়েও ঢাকায় শব্দদূষণের মাত্রা ছিল তীব্র। সরকার সচিবালয়ের চারপাশের এলাকাকে নীরব এলাকা ঘোষণা করার পরও সেখানে শব্দদূষণ বন্ধ হয়নি। সচিবালয়ের চারপাশ ছাড়াও ঢাকার অন্য এলাকাগুলোতেও নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দ হচ্ছে। তবে সময়ের ব্যাপ্তিতে শব্দদূষণ কিছুটা কমেছে।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) ২০২০ সালের সমীক্ষায় এই চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও ক্যাপস-এর যৌথ উদ্যোগে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ওই সমীক্ষার ফল তুলে ধরা হয়। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) 'নীরব এলাকা ঘোষিত সচিবালয়ের চারপাশে তীব্র শব্দদূষণ' শীর্ষক সমীক্ষার ফল তুলে ধরেন গবেষণা দলের প্রধান ও ক্যাপস-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার।

২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সচিবালয় এলাকার জিরো পয়েন্ট, পল্টন মোড়, সচিবালয় লিংক রোড হয়ে জিরো পয়েন্ট এলাকাকে নীরব এলাকা (নো হর্ন জোন) ঘোষণা করে। উচ্চ শব্দ ঠেকাতে ওই বছর দু-এক দিন অভিযান ও সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হয়। তবে এক বছরেও এ এলাকায় উচ্চ শব্দ কমানো যায়নি।

সমীক্ষার ফল তুলে ধরতে গিয়ে অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ২০১৯ সালে ক্যাপস-এর ১০ সদস্যের একটি গবেষণা দল সচিবালয়ের আশেপাশের ১২টি স্থানে নীরব এলাকা ঘোষণার আগে ও পরের বিভিন্ন সময়ে শব্দের তীব্রতা নির্ণয় করে। ওই বছর দেখা গেছে, নীরব এলাকা ঘোষণার পর সচিবালয় এলাকায় শব্দ প্রায় ৮.৪৬ ভাগ বেড়েছে। ২০২০ সালেও সচিবালয়ের আশপাশের ১২টি স্থানে দিনের বিভিন্ন সময়ের শব্দের তীব্রতা নির্ণয় করা হয়। স্বয়ংক্রিয় সাউন্ড লেভেল মিটারের সাহায্যে ১২টি স্থানে এক লাখ ৯৮ হাজার ৪০০টি উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও ক্যাপস-এর যৌথ উদ্যোগে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ওই সমীক্ষার ফল তুলে ধরা হয় - সমকাল

সমীক্ষায় উঠে এসেছে, শব্দদূষণ বিধি অনুযায়ী নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত সচিবালয়ের ওই স্থানের শব্দের মাত্রা থাকার কথা ৫০ ডেসিবেল। অথচ গত বছরের ১৪-২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯ দিনে ১২টি স্থানের মধ্যে পল্টন বাসস্ট্যান্ডে ১২৯.২, সচিবালয় মধ্য-পূর্বে ১২৮.২, কদম ফোয়ারায় ১২৭.৬, জিরো পয়েন্টে ১২৭.৪, সচিবালয় উত্তরে ১২৭.২, শিক্ষা ভবনে ১২৭.১, সচিবালয় ১নং গেটে ১২৬.৮, সচিবালয় ৩নং গেটে ১২৬.৭, সচিবালয় দক্ষিণ-পূর্বে ১২৬, প্রেস ক্লাবে ১২৪.২ ও সচিবালয় পশ্চিমে শব্দ দূষণরে মাত্রা ১২০.৬ ডেসিবেল পাওয়া গেছে। জিরো পয়েন্ট এলাকা হর্ন ব্যবহারের দিক থেকে শীর্ষে। এখানে ১০ মিনিটে ৩৩২টি হর্ন বাজাতে দেখা যায়, যার মধ্যে ৭০টি হাইড্রোলিক হর্ন এবং ২৬২টি সাধারণ হর্ন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সচিবালয় দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় ১০ মিনিটে ২৯২টি হর্ন বাজানো হয়, যার মধ্যে ৫৪টি হাইড্রোলিক। ২০২০ সালে সামগ্রিকভাবে ১২টি স্থানে ৮৮.৪ শতাংশ সময় শব্দের মাত্রা ৭০ ডেসিবেলের (তীব্রতর) বেশি ছিল, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৩.৫ শতাংশ কম। তবে যেহেতু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ১০ শতাংশ যানবাহন কম, সেহেতু শব্দদূষণ বাড়ার প্রকৃত হিসাব বেশি।

২শ' ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণ স্বাস্থ্যের ওপর প্রশ্নপত্র জরিপের ফলে দেখা যায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে দায়িত্ব পালনরত ৯.৫ ভাগ ট্রাফিক পুলিশের শ্রবণশক্তি হ্রাস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


সংবাদ সম্মেলনে শব্দদূষণ থেকে রক্ষা পেতে সচিবালয়ের চারপাশে গাছ লাগানো, সচিবালয়ের দেয়ালে সাউন্ড প্রুফ প্লাস্টার বোর্ড বসানো, হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি বন্ধ ও শাস্তি বাড়ানোসহ ১৯টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মাদ আলী নকীর সভাপতিত্বে ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিলের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমীর কবির।

অধ্যাপক মুহাম্মাদ আলী নকী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এ ধরনের জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। আগামী বছরও আমরা একই রকম গবেষণা করবো।

মন্তব্য করুন