'লস্ট ইন্ডিজ'

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০১৯     আপডেট: ১৮ জুন ২০১৯      

সৈয়দ আনাস পাশা, লন্ডন

ওয়েস্ট ইন্ডিজ এখন 'লস্ট ইন্ডিজ'। কথাটি আমার নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সমর্থক এক ক্রিকেটপ্রেমীর। খেলা শেষে টনটন ক্রিকেট গ্রাউন্ড থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সত্যবাণীর উপদেষ্টা সম্পাদক আবু মুসা হাসান যখন ওই ওয়েস্ট ইন্ডিজ সমর্থকের সঙ্গে একটু সহানুভূতি মেশানো ভাষায় কথা বলছিলেন, তখন বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে 'লস্ট ইন্ডিজ' আখ্যা দেন ওই সমর্থক।

আন্তর্জাতিক ম্যাচে সাড়ে ১২ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন টনটন কাউন্টি গ্রাউন্ডের এ খেলায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ সমর্থকের সংখ্যাই ছিল বেশি। তবে টাইগার সমর্থকের সংখ্যা কম হলেও গ্যালারি ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে।

সংখ্যায় কম হলেও তারা যে একাই একশ, সোমবার টনটন কাউন্টি গ্রাউন্ড গ্যালারিতে এটিই দেখেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সমর্থকরা।

খেলার শেষ দিকে টাইগারদের হুঙ্কারে যেন পালানোর পথ খুঁজছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়রা। তাদের মুভমেন্ট দেখে মনে হয়েছে যেন 'ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি' অবস্থায় আছেন তারা। মাঠে টাইগারদের তাড়া, গ্যালারিতে সমর্থকদের লাল-সবুজের বাংলাদেশ বাংলাদেশ স্লোগান 'টর্চার'- এই দ্বিমুখী আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে অবশ্য পালানো ছাড়া তাদের বিকল্প ছিল না।

সংখ্যা যাই হোক, লাল-সবুজের শানিত চেতনা থাকলে যে কোনো ক্রিকেট গ্যালারি যে দখলে নিতে পারে টাইগার সমর্থকরা, সোমবার টনটনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-বাংলাদেশ খেলায় আবারও তার প্রমাণ মিলেছে।

মাঠের দাপট আর গ্যালারির উচ্ছ্বাসে মনে হয়েছে বাংলাদেশই যেন ক্রিকেট সাম্রাজ্যের অধিপতি। টস হেরে আগে ব্যাট করে বাংলাদেশের সামনে ক্যারিবীয়রা ৩২২ রানের লক্ষ্য দাঁড় করালে প্রথম দিকে একটি শঙ্কা টাইগার সমর্থক কারও কারও মনোজগতের দখল নিলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি। সাকিব-তামিম-লিটনদের দাপুটে অবস্থানের রুদ্র রোষে পালাতে হয় সেই শঙ্কাকে।

এর আগে সর্বোচ্চ ৩১৮ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড ছিল টাইগারদের। সেটি গত বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। এবার নিজেদের রেকর্ডটাই নতুন করে লিখল টাইগাররা।

যেন স্বপ্নকেও হার মানালেন সাকিব-লিটনরা। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ২৩তম খেলায় এসে শক্তিশালী উইন্ডিজকে ৭ উইকেটে হারিয়ে সেমির আশা বাঁচিয়ে রাখল টাইগাররা। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় যদিও ওয়েস্ট ইন্ডিজের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ, তবুও বিশ্বকাপে উইন্ডিজের বিপক্ষে এর আগে কখনও জয়ের দেখা পায়নি টাইগাররা। সোমবার সেই খরা রানের বৃষ্টিতে ধুয়েমুছে গেল।

লন্ডন থেকে প্রায় দেড়শ' মাইল দূরে টনটন মূলত শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত একটি ছোট্ট শহর। স্থানীয় এক ব্রিটিশ-বাংলাদেশির মতে, আশপাশ এলাকাসহ শহরটিতে বড়জোড় হাজার দু-এক বাঙালির বসবাস।

রোববার বিকেল থেকেই ব্রিটেনের বিভিন্ন শহর থেকে টাইগার সমর্থকবাহিনী যাত্রা শুরু করে টনটন অভিমুখে। শুধু ব্রিটেন নয়, ইউরোপ, এমন কি আমেরিকা থেকেও টনটনে এসে জড়ো হন লাল-সবুজে রঙিন সমর্থকরা।

সোমবার সকাল থেকেই রণ সাজে সজ্জিত হয়ে টনটন ক্রিকেট গ্যালারিতে অবস্থান নেন তারা। বাংলাদেশ টিমের জার্সি, জাতীয় পতাকা ও লাল সবুজ পোশাকে সজ্জিত এই সমর্থক বাহিনীর কারও কারও হাতে ছিল রয়েল বেঙ্গল টাইগার। ক্যারিবীয়দের চতুর্থ উইকেট পতনের পরেই টাইগার সমর্থকদের হুঙ্কার যেমন বাড়তে থাকে, ঠিক তেমনি ওয়েস্ট-ইন্ডিজ সমর্থকদের কপালে ফুটতে থাকতে চিন্তার রেখা। সময় যত যায় বাড়ে টাইগার হুঙ্কার, আর হতাশার জোয়ারে ভাসতে থাকে ক্যারিবীয়রা। এই হতাশা থেকেই শেষ পর্যন্ত টাইগারদের কাছে তাদের অসহায় আত্মসমর্পণ।

অভিনন্দন বিশ্ব ক্রিকেটাঙ্গনকে বাংলাময় করার কারিগর টাইগারদের, অভিনন্দন গ্যালারি কাঁপানো লাল-সবুজ বাহিনীকে, যাদের উচ্ছ্বাস, উৎসাহ খেলার মাঠে ফুয়েল জুগিয়েছে মাশরাফি-সাকিবদের।