বঙ্গবন্ধুর ভাষণে অনুপ্রাণিত হন জহির উদ্দিন প্রধান

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা-৪

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবু সালেহ রনি

পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিবাদী ভাষণ রেডিওতে শুনে উদ্বেলিত হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের কিশোর জহির উদ্দিন প্রধান। আন্দোলন-সংগ্রামে তার অনমনীয় ভূমিকা সম্পর্কে তিনি জানতে পারেন চাচা আবুল কাশেমের কাছ থেকে। তখন থেকেই বঙ্গবন্ধুকে দেখার আগ্রহ হয় তার। সত্তরের নির্বাচনের আগে আদমজীতে আসেন বঙ্গবন্ধু; মুনলাইটের দক্ষিণ পাশের মাঠে তিনি ভাষণ দেন। খুব কাছ থেকে শোনা বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণ প্রবলভাবে আন্দোলিত করে জহিরকে।

সেই আগ্রহ থেকে একাত্তরের ৭ মার্চ চাচা আবুল কাশেমের সঙ্গে সাইকেলে চড়ে জহির হাজির হন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে। ২৭ মার্চ থেকে নারায়ণগঞ্জে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রতিরোধেও ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে তিনি তার বাঁ পা হারিয়েছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মাইন বিস্ম্ফোরণে। অসংখ্য স্পিল্গন্টারের আঘাত তার ডান পা এবং হাতকেও করেছে ক্ষতবিক্ষত।

মোহাম্মদ জহির উদ্দিন প্রধানের জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৭ জুলাই নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলের এনায়েত নগরে। বাবা ওসমান গণি প্রধান চাকরি করতেন পিডিবিতে। মা জরিনা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। তিন ভাই ও তিন বোনের সংসারে তিনি সবার বড়।

অর্থাভাবে ১৯৬৯ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার আগেই লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় তার।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জহির উদ্দিন প্রধান সমকালকে বলেন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পরই বুঝতে পেরেছিলাম বড় ধরনের কিছু একটা হবে। সেটি যে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ হবে, এমন মনে হয়নি। ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে দূর থেকে আকাশে গোলাগুলি আর বিস্ম্ফোরণের ঝলকানি দেখেই বুঝে যাই বিপদ আসছে। পরদিন শত শত লোক ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ওপর দিয়ে যখন যাচ্ছিল, তখন তাদের কাছ থেকে জানতে পারি, কী হয়েছে ওখানে। ২৭ মার্চ খবর আসে নারায়ণগঞ্জে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আসছে। ভয়ে অনেকেই শহর ছেড়ে যায়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ঐক্যবদ্ধ হন পাকিস্তানিদের প্রতিহত করতে।

জহির উদ্দিন জানান, তার বাবা-চাচা সবাই আগে থেকেই আওয়ামী লীগ করতেন। তিনিও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। পালিয়ে আসা বাঙালি সেনা, ইপিআর এবং পুলিশ সদস্যরাও একত্র হন। কিছু হাতিয়ার সংগ্রহ করা হয়। স্কুলে 'আনসার ট্রেনিং (বর্তমানে রোভার স্কাউট)' ছিল তার। তাই রাইফেল চালাতে পারতেন। সেই মনোবল দিয়েই স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পঞ্চবটি হয়ে নারায়ণগঞ্জ ঢোকার মুখে পাকিস্তানি সেনাদের ঠেকিয়ে দেন মাসদাইর কবরস্থানের কাছে। জায়গাটা ছিল উঁচুনিচু। ফলে আত্মরক্ষা সহজ হয়। প্রচ গোলাগুলি চলে। একটি সশস্ত্র সেনাবাহিনীর দলকে প্রতিরোধ করার মতো শক্তি তখনও ছিল না তাদের। মাত্র এক রাত তাদের ঠেকিয়ে রাখার পর সকাল হতেই পাকিস্তানি বাহিনীর মুহুর্মুহু আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান তারা। আত্মগোপন করেন গ্রামের দিকে।

একাত্তরের ১৭ মে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে নারায়ণগঞ্জ ছাড়েন জহির উদ্দিন প্রধান। তার বাবা ও মা উভয়েই তাকে সমর্থন দেন। কুমিল্লার দেবিদ্বার-রামকৃষ্ণপুর দিয়ে সিলেটের কোম্পানিগঞ্জ হয়ে প্রথমে ভারতের কোনাবন্ধ যান তিনি। সেখান থেকে পরে চলে আসেন ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা কংগ্রেস ভবনে। সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় আগরতলার নরসিংগড় ইয়ুথ ক্যাম্পে। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ থাকায় তিনি এক মাস ইয়ুথ ক্যাম্পের প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে চলে যান উচ্চতর প্রশিক্ষণে।

জহির জানান, তাদের ৭২ জনের স্পেশাল গ্রুপকে প্রথমে পাঠানো হয় নাইন-টি-টু বিএসএফ-এ। ১৫ দিন পর পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের তরঙ্গপুরে। ২১ দিনের প্রশিক্ষণে তাদের গ্রেনেড নিক্ষেপ, ৩৬ হ্যান্ডগ্রেনেড, এসএলআর, এলএমজি, রাশিয়ান এলএমজি চালানো শেখানো হয়। তখন একদিন তাদের ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন ইদ্রিস ও শিবগঞ্জ এলাকার এমপি মন্টু ডাক্তারও এসেছিলেন। তারা তাদের বাছাই করে নিয়ে যান সাত নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর হেড কোয়ার্টার মহাদেবপুরে। সেখানে তাদের অস্ত্র দেওয়া হয়। সাত নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান বীরউত্তম। আর সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বীরশ্রেষ্ঠ।

জহির উদ্দিন প্রধান ছিলেন ৩৩ জনের একটি প্লাটুনের টুআইসি। প্লাটুনটির নেতৃত্বে ছিলেন বাঞ্ছারামপুরের মমতাজ উদ্দিন। দলকে সরাসরি কমান্ড করতেন নজরুল ইসলাম ও মেজর রফিক। দলের সবাই ছিলেন সম্মুখযোদ্ধা। আগস্টের শুরুতেই তারা সোনামসজিদ দিয়ে ঢুকে সম্মুখযুদ্ধ করে চলে আসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের কানসাট পর্যন্ত। স্থানীয় এরফান ডাক্তার ছিলেন তাদের গাইড। তারা সোনামসজিদ এলাকা, ডোবরা, গলাবাড়ি, কানসাট রাজবাড়ি, গোমস্তাপুর, কাইশ্যাবাড়ি, দলদলি প্রভৃতি অঞ্চলে অপারেশন করেন। নভেম্বরের শেষ দিকে এসে এ দলের সঙ্গে যুক্ত হয় মিত্রবাহিনীভুক্ত ভারতীয় সেনারা। আর্টিলারি সাপোর্ট নিয়ে দলটির পেছনে থাকত তারা।

সম্মুখযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে জহির উদ্দিন প্রধান বলেন, তখন পাকিস্তানি সেনারা ছিল শিবগঞ্জে। রাজাকাররা তাদের খবর দিয়ে কানসাটে নিয়ে আসত। একবার কানসাটে আটজন রাজাকারকে ধরে ফেললাম। এর পরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কিছুটা থমকে যান জহির উদ্দিন প্রধান। জানান তার বাঁ পা হারানোর সেই হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। তিনি বলেন, দিনটি ছিল ১৪ ডিসেম্বর। আমরা ছিলাম গোমস্তাপুর থানার কাইশ্যা বাড়িতে। পাগলা নদী পার হয়ে রহনপুরে যাওয়ার কথা আমাদের। খুব ভোরে রওনা হলাম। সবার সামনে আমি। হাতে একটি ব্রিটিশ এলএমজি। রেকি করা থাকলেও পাকিস্তানি সেনারা যে চাঁদনি রাতে ওই পথে মাইন পুঁতে রেখেছে, তা জানা ছিল না। আলমপুর এসে একটি বাঁশঝাড়ের সামনে উঁচু জায়গা পড়ে। সেখানে একটি নালা বা ক্যানেলের মতো ছিল। সামনে শত্রুবাহিনীর কেউ আছে কি-না তা দেখার পর নালা পার হওয়ার জন্য বাঁ পা দিতেই বিস্ম্ফোরণ ঘটে। লাফ দিয়ে ক্যানেল পার হলেও বাঁ পা আর রক্ষা হয়নি। দেখলাম সেটি চামড়ার সঙ্গে ঝুলে আছে। মাংস থরথর করে কাঁপছে। গলগলিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। ডান পায়ে বিঁধেছে অসংখ্য স্পিল্গন্টার। আমি আহত হলেও ওই দিন গোটা দল রক্ষা পেয়েছিল। এটাই ছিল আমার বড় সান্ত্বনা। সহযোদ্ধারাই আমাকে তুলে নিয়ে যান দলদলি ক্যাম্পে। সেখান থেকে পাঠানো হয় মালদহ হাসপাতালে। তখনও জ্ঞান ছিল। প্রচ তৃষ্ণার্ত ছিলাম। পরে পানি মুখে দিতেই জ্ঞান হারাই। এরপর জ্ঞান ফিরলে দেখি, বাঁ পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। পঙ্গু হয়ে গেলাম। খুব কষ্ট লাগছিল। হাউমাউ করে কাঁদছিলাম। তবে কিছুক্ষণ পরই এক নার্স এসে বললেন, 'তোমহারা দেশ আজাদ হো গিয়া। তা শুনে সব কষ্ট ভুলে গিয়েছিলাম।'

জহির উদ্দিন প্রধান অবশ্য এখন দু'পায়েই চলাফেরা করতে পারেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাশিয়া পাঠানো হয়। সেখান থেকে দেশে ফেরার পর তার বাঁ হাঁটুতে কৃত্রিম পা প্রতিস্থাপন করা হয়। যদিও শরীরে স্পিল্গন্টারের ক্ষত থাকায় এখনও মাঝে মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। বঙ্গবন্ধু সরকার তাকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে চাকরি দেয়। ২০০৭ সালে অবসর নেন তিনি।

অবসর জীবন কেমন চলছে- জানতে চাইলে জহির উদ্দিন প্রধান বলেন, 'সরকারি খরচে ২০১২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি হার্টে দুটি রিং পরানো হয়েছে। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। কৃত্রিম পা নিয়ে চলাফেরা করতেও কষ্ট হয়। বার্ধক্যে এসে যেসব হয়, সেসব নিয়েই আছি।' এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক জহির উদ্দিন স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশা সম্পর্কে বলেন, 'বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন এ দেশ সোনার বাংলা হবে। আমরাও চাই তরুণ প্রজন্ম মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত একটি সোনার বাংলা গড়ে তুলবে।'