জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোটাই আমদানি করে বাংলাদেশ। বিদেশ থেকে আনতে হয় প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন এসব জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে তেল-গ্যাসের দাম বেড়েছে দুই থেকে চার গুণ। এদিকে দেশে তেল-গ্যাস বিক্রি হয় আমদানি মূল্যের চেয়ে অনেক কমে।
এমন প্রেক্ষাপটে গত ছয় মাসে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে ১০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল বিক্রিতে দিনে ২১ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে- এ দাবি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। ফলে বছর শেষে এ ক্ষেত্রে লোকসান চার-পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। চলতি বছর জ্বালানি খাতে ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র এক হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতে বার্ষিক লোকসানের পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার ওপরে।
এদিকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পণ্য পর্যালোচনাকারী প্যারিসভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারিতেও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকবে।
লোকসান কমাতে গ্যাস-তেলের মূল্য বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার। এগুলোর মূল্য বাড়ালে বিদ্যুতের মূল্যও বাড়াতে হবে। আবার ডিজেলের মূল্য না বাড়লে তা পাশের দেশে পাচারের আশঙ্কা রয়েছে বিপিসির। যদিও জ্বালানি-বিদ্যুতের মূল্য বাড়লে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জনজীবনে। নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির চাপে উদ্বিগ্ন জনগণের জন্য এ মূল্য বৃদ্ধি অভিশাপ হয়ে দেখা দেবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন. প্রতি লিটার জ্বালানি তেলে ৩০ শতাংশ ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হয় সরকারকে। এটি কমিয়ে আনলে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। সে ক্ষেত্রে জনগণ একটু ছাড় পাবে।
বিদ্যুতের দাম সর্বশেষ প্রতি ইউনিটে ২৫ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল ২০২০ সালের মার্চ মাসে। গ্যাসের দাম বেড়েছিল ২০১৯ সালের প্রথমার্ধে। জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেলের দাম সর্বশেষ নির্ধারণ করা হয় ২০১৬ সালে; প্রতি লিটার ৬৫ টাকা। ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ানো হয় চলতি মাসের ৭ তারিখ; প্রতি লিটার ৫৯ টাকা। জ্বালানি তেলের মধ্যে এ দুটি পণ্যই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।
এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সমকালকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাস-কয়লা সবকিছুর দাম অনেক বেড়েছে। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করায় সরকারের লোকসান হচ্ছে। কী পরিমাণ লোকসান হচ্ছে, তা বিশ্নেষণ করছে সংস্থাগুলো। তিনি বলেন, দাম বাড়ানো প্রয়োজন, তবে জনগণের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ জন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোকে প্রস্তাব পাঠাতে হয়। জ্বালানি তেলের মধ্যে বর্তমানে পেট্রোল, অকটেন ফার্নেস অয়েলের দাম নিজেরাই বাড়াতে পারে বিপিসি। ডিজেলের দাম জ্বালানি বিভাগই বাড়াতে-কমাতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করতে এখন ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তও নিজেরা নিতে চায় বিপিসি। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন জানিয়েছেন, এখন তারা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৮০ পয়সা লোকসান দিচ্ছেন। গ্যাস-তেলের দাম বাড়লে এ লোকসান আরও বাড়বে। লোকসান কমাতে সরকারকে হয় ভর্তুকি দিতে হবে, অথবা দাম বাড়াতে হবে।
বিপিসি চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিজেল ও ফার্নেসে তারা প্রতিদিন ২১ কোটি টাকার বেশি লোকসান দিচ্ছেন। বিষয়টি সরকারকে জানানো হবে। দাম বাড়বে কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। তিনি জানান, অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন, জেড ফুয়েল বিক্রিতে লোকসান হচ্ছে না।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, এলএনজি আমদানির ভর্তুকি মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন তহবিলের অর্থ দিয়েও চাপ সামলানো যাচ্ছে না। তাই ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। তবে এটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়।
জ্বালানি পণ্যের মূল্য বাড়লে তা জনগণের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দেবে বলে মন্তব্য করেছেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, খাদ্যসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। করোনার কারণে আয় গেছে কমে। এর মধ্যে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়লে তা হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। তিনি বলেন, তেল-গ্যাসের মূল্যের বড় অংশ যায় ট্যাক্স-ভ্যাটে। সরকার এতে ছাড় দিলেই সংস্থাগুলোর লোকসান কমবে। দামও সহনীয় হবে। ফলে মূল্য বাড়াতে হবে না। গত কয়েক বছরে বিপিসি যে ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে, তার প্রায় পুরোটাই সরকারের পকেটে গেছে। তাই আমদানি ব্যয়ের চাপ সরকারকেই সামলানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকায় ২০১৪ সাল থেকে তেল বেচে লাভ করছে বিপিসি। ট্যাক্স-ভ্যাট বাদেই গত দুই বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া প্রতি বছর তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা ট্যাক্স-ভ্যাট দেয় বিপিসি।
বিপিসির দিনে লোকসান ২১ কোটি টাকা :গত ২০ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৯৮ দশমিক ৫৯ মার্কিন ডলার। ডিজেলের দাম বাংলাদেশে বর্তমানে ৬৫ টাকা। ফলে প্রতি লিটারে বিপিসির ক্ষতি হচ্ছে ১৪ টাকা ৭৭ পয়সা। ফার্নেস অয়েলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ৪৮৭ দশমিক ২১ মার্কিন ডলার। দেশের বাজারে দাম প্রতি লিটার ৫৯ টাকা। লিটারে বিপিসির লোকসান সাত টাকা ৬৬ পয়সা। দিনে ডিজেল বিক্রি হয় ১২ হাজার টন; ফার্নেস অয়েল এক হাজার ৩৪৬ টন। এ হিসাবে বিপিসির দৈনিক ক্ষতি ২১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম না কমলে অর্থবছর শেষে ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি সংস্থাটির।
বর্তমানে প্রতি লিটার অকটেন ৮৯ টাকা, পেট্রোল ৮৯ টাকা এবং কেরোসিন ৬৫ টাকায় বিক্রি করে বিপিসি। এসব পণ্য বিক্রিতে লাভ হলেও পরিমাণ কম হওয়ায় মোট লাভের পরিমাণ খুব বেশি নয়।
দেশে বছরে প্রায় ৬০ হাজার টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ডিজেল।
পাচারের শঙ্কা :ভারতের কলকাতায় গত সপ্তাহে ডিজেল বিক্রি হয় প্রতি লিটার বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২১ টাকা ১২ পয়সায়। বাংলাদেশে ডিজেলের দাম ৬৫ টাকা। অর্থাৎ লিটারেই দামের পার্থক্য ৫৬ টাকার ওপরে। ফলে ডিজেল পাচারের শঙ্কায় রয়েছে বিপিসি। এ জন্য সম্প্রতি বিজিবির সঙ্গে বৈঠক করেছে সংস্থাটি। সীমান্তবর্তী জেলা প্রশাসকদেরও চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিপিসি চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ।
এলএনজিতে ভর্তুকি বাড়ছেই :এলএনজি আমদানিতে গত অর্থবছরে ২৮১২ কোটি টাকা ভর্তুকি লেগেছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে সরাসরি এলএনজি গ্যাস কেনা কয়েক মাস বন্ধ ছিল। এতে দেশে গ্যাসের সংকট বেড়ে যায় এবং সরকার গ্যাস রেশনিং করতে বাধ্য হয়। সংকট সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে তিন কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এর মধ্যে স্পট মার্কেটে দাম আরও বেড়ে যায়। এতে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিয়ে এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে।
বর্তমানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমবিটিইউ) এলএনজির দাম ৪০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত জানুয়ারিতেও এ দাম ছিল ১০ ডলার। এলএনজির আমদানি ব্যয় মেটাতে পেট্রোবাংলার তহবিল খালি হয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটির জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিলে সঞ্চিত ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এলএনজি কেনার টাকা জোগাতে এই ফান্ড প্রায় খালি হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়ছে :বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার ৯৩৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৫৩ শতাংশ, ফার্নেস তেলভিত্তিক ২৬ শতাংশ, ডিজেলভিত্তিক ৬ শতাংশ, কয়লাভিত্তিক ৮ শতাংশ, হাইড্রো ১ শতাংশ, অন-গ্রিড সৌর ১ শতাংশ এবং আমদানিকৃত বিদ্যুৎ ৫ শতাংশ।
পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ প্রায় ছয় টাকা। গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ে দুই টাকা। ফার্নেস তেলে পড়ে ১০ থেকে ১২ টাকা, ডিজেলে ১৮ থেকে ২০ টাকা, কয়লা দিয়ে ৫ থেকে ৬ টাকা, সৌরশক্তি থেকে ৮ থেকে ৯ টাকা এবং আমদানিতে খরচ গড়ে প্রতি ইউনিটে ৫ থেকে ৬ টাকা।
পিডিবির তথ্য বলছে, গ্যাস সংকটের কারণে গত কয়েক দিন ধরে পিক আওয়ারে (বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টা) ৫ হাজার ৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসেছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। তেলে উৎপাদন বাড়ায় পিডিবির খরচ বেড়ে গেছে।
উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ বেচে পিডিবি। গত অর্থবছর সংস্থাটির লোকসান ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। গ্যাস-তেলের মূল্য বাড়লে এ লোকসান আরও বাড়বে। ফলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়াতেই হবে বলে জানিয়েছে পিডিবি। তবে সরকার ভর্তুকি দিলে দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না।

বিষয় : জ্বালানিমূল্যের ঊর্ধ্বগতি

মন্তব্য করুন