নারীদের জীবনমান উন্নয়নে গত দুই দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে যার মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস ও প্রজনন হার হ্রাস এবং স্কুল তালিকাভুক্তকরণে লিঙ্গ সমতায় আমাদের দেশ একটি অসাধারণ পরিবর্তনের সাক্ষ্য দিয়েছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার হারে এগিয়ে যাচ্ছে, এবং সেসাথে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের তালিকাভুক্তি ১৯৯৮ সালের ৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে ৬৭ শতাংশ হয়েছে (বিশ্বব্যাংক)। একই সাথে বাংলাদেশের শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ ১৯৯৫-৯৬ সালের ১৫.৮ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৬ সালে ৩৫.৬ শতাংশ হয়েছে (বিবিএস)। নারীর ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে গত বিশ বছরে সরকার বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছে, যা দেশের সার্বিক প্রগতি অর্জনের ধারাকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি দেশকে বিশ্বমণ্ডলে নারী-কেন্দ্রিক উন্নয়নের রোল-মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, এমপি বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যিনি নারীর ক্ষমতায়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে এ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন। 'প্রেরণার কথা'-র দ্বিতীয় সিজনের শেষ পর্বে অতিথি হয়ে এসেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, এমপি, যেখানে তিনি তুলে ধরেছেন আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি, জানিয়েছেন নিজের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সাফল্য এবং তার প্রেরণার নানা জানা-অজানা গল্প।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী একটি রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী। রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণের সুবাদে ছোটবেলা থেকেই রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ ছিল এবং তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে আইন পেশা তাকে একজন সফল রাজনীতিবিদ হতে সহায়তা করবে এবং একই সাথে তাকে তার ক্যারিয়ারের লক্ষ্যগুলো অর্জনে সাহায্য করবে। শিরীন শারমিন চৌধুরীর নিজের কথায়, 'আমি আমার পড়াশোনা (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি এবং এলএলএম) শেষ করে সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করি এবং সেই পর্যায় থেকেই পরবর্তী সময়ে আমার রাজনীতিতে আসার সুযোগ হয়।' পরবর্তী সময়ে তিনি যুক্তরাজ্য সরকারের কমনওয়েলথ স্কলারশিপের অধীনে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এসেক্সে যান তার পিএইচডি সম্পন্ন করতে। 

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কথা বলার সময় স্পিকার আরও যোগ করেন, 'আমি ২০০৯ সালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলাম এবং সেখানে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের মতো বিষয়ে সাড়ে তিন বছর কাজ করেছি। আমরা সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিধবা, মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকা মহিলা, এবং স্তন্যদাত্রী মায়েদের জন্য ভাতা চালু করার জন্য কাজ করেছি। এই পদক্ষেপগুলো নারীদের কল্যাণে নিবদ্ধ, যা সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষণ।'

সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা নারীদের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে কতটা সাহায্য করেছে তার ওপর জোর দিয়ে ড. চৌধুরী বলেন, 'আমরা যদি ফেমিনিজেশন অব পভার্টির কথা বলি, তাহলে দেখতে পারবো কিভাবে দারিদ্র্য নারীর ওপর ডিফারেন্টশিয়েটেড ইমপ্যাক্ট ফেলে। দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা নারীদের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির জন্য এই নারী-কেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা খুবই কার্যকর।'

তিনি তৃণমূল নারীদের উদ্যোক্তা হবার সক্ষমতা এবং কীভাবে তা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিতে সহায়তার পাশাপাশি তাদের পরিবারেরও উন্নতি করতে পারে তা তুলে ধরে বলেন, 'এই প্রান্তিক নারীরা যত বেশি আয়-বর্ধন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করবে, তত বেশি তারা দারিদ্রের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। আমি সবসময় দুটি বিষয়ে ফোকাস করি, প্রথমটি হল- নারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিকে আরও বেশি অগ্রাধিকার দেয়া, সেটা তথ্য প্রযুক্তি, শিক্ষা বা অন্য যেকোনো দক্ষতা বৃদ্ধি কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক না কেন। এই দক্ষতাগুলো মহিলাদের জীবিকা অর্জনের সুযোগ করে দিতে পারে যাতে তাদের বিকাশ টেকসই হয়। দ্বিতীয়ত, নারীদের দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি তাদেরকে সমান সুযোগের ব্যবস্থা করে দিতে হবে; নারীদের সফলতার জন্য তাদেরকে দক্ষ না করে আমরা তাদেরকে জীবিকার সুযোগ করে দিতে পারব না। অতএব, এই দুটিকে একইসাথে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।'

'আমাদের দেশের নারী উদ্যোক্তারা সব বাধা ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে তাদের নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করছে। কিন্তু যেকোনো মহামারী বা যেকোনো ধরনের প্রাকৃতিক সংকট নারীদের উপর আলাদা প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, কোভিড-১৯ মহামারীটির কথাই ধরুন। এসব প্রতিকূলতার পরে নারীদের প্রায়ই অধিকতর বাধার সম্মুখীন হতে হয় এবং এসব সময়ে তাদেরকে আরও বেশি পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। কোভিড-১৯ এর সময়, নারী উদ্যোক্তারাও একই রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন,' স্পিকার যোগ করেন।

সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ সম্পর্কে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, 'আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত বেশ কয়েকটি প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যে এসএমই-গুলোকে সহায়তা করার প্যাকেজগুলো থেকে নারী উদ্যোক্তারাও উপকৃত হবেন। ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন নিশ্চিত করতে হবে যে এই প্রণোদনা প্যাকেজগুলো কার্যকরভাবে বিতরণ করা হচ্ছে, যাতে এই সহায়তাগুলো যেসব নারীদের প্রয়োজন তাদের কাজে পৌঁছায় এবং তাদের এই প্রণোদনা গ্রহণ করা সহজগম্য হয়। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রণোদনার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে যথাযথ উদ্যোগ নিয়েছেন, কিন্তু সেই সুবিধা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব আমাদের। আমি বিশ্বাস করি, এগুলো আমাদের অর্থনৈতিক পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।'

তিনি বিশ্বাস করেন আমাদের সামাজিক অবকাঠামোর মাধ্যমেই আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে মেয়েরা তাদের শৈশব থেকেই যেন শিক্ষার প্রতি মনোযোগী হয়, 'আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে ছেলেদের সাথে আমাদের মেয়েরাও যেন তাদের শৈশব থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যোগদান করে এবং পরিবার উভয়কেই শিক্ষা প্রদান করার ক্ষেত্রে সমান অগ্রাধিকার দেয়। পরিবার থেকেই যদি নারীদের উচ্চশিক্ষার মূল্য বুঝতে ব্যর্থ হয় এবং তারা মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে তা নারীর ক্ষমতায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ... নারীদের শিক্ষায় আমরা এখন পর্যন্ত যা অগ্রগতি অর্জন করেছি তার অনেকখানি কৃতিত্ব পাবে নারী উপবৃত্তি। উপবৃত্তিগুলি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিতরণ করা হয় এবং এই পরিবারগুলিতে সে ফোনটি সাধারণত মায়ের হাতেই থাকে। এটি পরিবারগুলোকে তাদের মেয়েদেরকে স্কুলে পাঠানোর ক্ষেত্রে এক ধরনের উৎসাহ প্রদান করে। উপরন্তু, এই উপবৃত্তি বাল্যবিবাহের সংখ্যা কমিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।'

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নারী স্পিকার হওয়ার ব্যাপারে তার অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'একজন স্পিকার হওয়া অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং, বিশেষ করে দেশের প্রথম নারী স্পিকার। আমি সবসময় অনুভব করেছি যে আমার ভূমিকা বাংলাদেশের প্রতিটি নারীর ভবিষ্যতের সাথে জড়িত। কারণ, আমি যদি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে ব্যর্থ হতাম তাহলে মানুষ আমাকে একজন স্পিকার হিসেবে সমালোচন না করে, বরং একজন নারী হিসেবে বেশি সমালোচনা করতো। এ বিষয়টি প্রতিটি কাজে আমাকে সচেতনভাবে মনে রাখতে হয়েছিল এবং আমি এখনও এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি।' তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদান রেখেছে; এই উপস্থিতি নারীদেরকে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি বার্তা দেয়। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তার আজীবন কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ, উইমেন ইকোনমিক ফোরাম তাকে 'উইমেন অব দ্য ডিকেড ইন পাবলিক লাইফ অ্যান্ড লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড' প্রদান করে।

বড় কিছু অর্জনের স্বপ্ন দেখে এমন প্রতিটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও ক্যারিয়ার-ফোকাসড তরুণ এবং নারীদের জন্য ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী একজন রোল মডেল। তরুণ প্রজন্মের প্রতিই অগাধ বিশ্বাস আর স্বপ্ন নিয়ে তিনি বলেন, 'আমাদের সবচেয়ে বড় যেই শক্তির আধার, সেটি আমাদের তরুণ প্রজন্ম এবং আমাদের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তারা। কাজেই তারাই হচ্ছে আমাদের অমিত সম্ভাবনার চাবিকাঠি। তাদেরকে যথাযথ সুযোগ দিয়ে যদি আমরা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই ধারাই অব্যাহত থাকবে, এবং আগামী দিনে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবেই আমরা আমাদের দেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো।'

প্রেরণা ফাউন্ডেশন কর্তৃক সম্প্রচারিত 'প্রেরণার কথা'র অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ'র সহযোগী অধ্যাপক ড. মেলিতা মেহজাবীন এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন। সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি দেখা যাবে প্রেরণা ফাউন্ডেশনের ইউটিউব চ্যানেলে: https://rb.gy/1vbi9a।