ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয়াবহ আসক্তির জন্ম দিচ্ছে- একটি গবেষণার উদ্ৃব্দতি দিয়ে মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এই ভাষ্য আমাদের উদ্বিগ্ন করলেও বিস্মিত করে না। অনলাইনে ব্যয় করা মাত্রাতিরিক্ত সময় কীভাবে শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনা হ্রাস করছে, সেই চিত্র আগেও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগ হারাচ্ছে। এর ফলে একাডেমিক ফল খারাপ হচ্ছে- আলোচ্য গবেষণার এমন পর্যবেক্ষণ শিক্ষক, বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের পক্ষে সমকালের মতামত, সংবাদ ও ফিচারেও বিভিন্ন সময় প্রকাশ হয়েছে। আলোচ্য গবেষণাটি যদিও চট্টগ্রামের ছয়টি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের কমবেশি ছয়শ শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত; এই নমুনায়নকে দেশের সামগ্রিক চিত্র হিসেবে ধরে নেওয়া যেতে পারে। তবে আমরা সুপারিশ করব, দেশের সব অঞ্চল থেকে নমুনা সংগ্রহ করে আরেকটি গবেষণা পরিচালিত হোক। প্রয়োজনে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পক্ষ যৌথভাবেও এ জরুরি কাজ করতে পারে।
আলোচ্য গবেষণায় বলা হয়েছে, ইন্টারনেটে আসক্তি অন্তত ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছড়িয়েছে এবং ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী এ কারণে ক্লাসে মনোযোগ হারাচ্ছে। এই হার নিঃসন্দেহে বাড়তি উদ্বেগের। একই সঙ্গে এটাও প্রণিধানযোগ্য- গবেষণা নমুনার আওতাভুক্ত শিক্ষার্থীরা সবাই চিকিৎসা-সংক্রান্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত। এর অর্থ, তারা সবাই পরিণত বয়স্ক। তাদের প্রায় সবাই শিক্ষা শেষ করে অন্যদের যে চিকিৎসা দেবেন, তার মধ্যে বিভিন্ন আসক্তি ও মানসিক অস্থিরতাজনিত চিকিৎসাপ্রার্থীও থাকবেন। এখন এই পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরই যদি এমন অসচেতনতা ও আসক্তি স্পষ্ট হয়, তাহলে বাকিদের পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সর্বব্যাপ্ত ব্যবহারের এই যুগে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবে ইন্টারনেট জগতের বাইরে থাকতে পারবে- বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এমন প্রত্যাশা অস্বাভাবিক। করোনা পরিস্থিতিতে আমরা দেখছি, বিদ্যায়তনিক তৎপরতা কীভাবে ঢুকে গেছে বৈদ্যুতিন বাক্সের ভেতর। 'নতুন স্বাভাবিক' সময়ের আগে থেকেই মোবাইল ফোন, ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ কম্পিউটার, ট্যাব- নতুনতর সব প্রযুক্তিও হয়ে উঠেছে গৃহস্থালি পণ্য। শিক্ষালয়ে কিংবা পরিবারে অবস্থান করার সময় শিক্ষার্থীরা এসবের কী ধরনের ব্যবহার করছে, তা নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারিতে রাখা কঠিন। আমাদের মনে আছে, মানবাধিকার বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষে গত বছর পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনের সারাংশে দেখা গিয়েছিল, শিশুরা পর্যন্ত অনলাইনে গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। চট্টগ্রামের এ গবেষণায় উঠে আসা 'আসক্তি' যে নিছক 'সামাজিক' যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়- তাও বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
অনলাইনে বিভিন্ন মাত্রায় আসক্তির মতো সামাজিক প্রপঞ্চের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বিভিন্ন সময়ে উচ্চারণ করেছি। কিন্তু সব পক্ষের সচেতনতা ও সক্রিয়তার অভাবে পরিস্থিতির কত দ্রুত অবনতি ঘটছে; আলোচ্য গবেষণাচিত্র তার প্রমাণ। এ ব্যাপারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সতর্কতার যে বিকল্প নেই- সে কথাটি আমরা আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই। চিকিৎসাশাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত গবেষণাতেও সুপারিশ করা হয়েছে, ইন্টারনেটের আসক্তি থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ইন্টারনেট ব্যবহারে 'নন-একাডেমিক' তৎপরতা নিরুৎসাহিত করতে কাঠামোগত প্রক্রিয়া নেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু অনলাইন সংকটে শুধু অফলাইন সমাধান কাজে আসবে বলে মনে হয় না; বরং অনলাইনেই সুস্থ ও বিকল্প আধেয়ও সুলভ করায় মনোযোগ দিতে হবে।
স্বাভাবিকতা বিনাশী এই প্রপঞ্চ নিয়ন্ত্রণ কঠিন, সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা মনে করি, সব পক্ষ সক্রিয় হলে তা অসম্ভব হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ ও নাগরিক সংগঠনগুলো ইন্টারনেট আসক্তি নিয়ে গবেষণা, প্রচারণা ও সচেতনমূলক কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। সুস্থ বিনোদন ও শিক্ষামূলক আধেয়র প্রতি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে তোলা গেলে তারা ক্ষতিকর আধেয়গুলোর প্রতি আসক্ত হবে না। এর ফলে অনলাইনে বেশি সময় ব্যয় করে অফলাইন ক্লাসে মনোযোগ হারানোর হারও নিশ্চয় কমে আসবে।

বিষয় : অনলাইন আসক্তি

মন্তব্য করুন