নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে একটি উপযুক্ত আইন প্রণয়নের পক্ষে মত দিয়েছে আওয়ামী লীগ। কেএম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির মেয়াদ শেষে নতুন আইনেই ইসি পুনর্গঠন হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে ক্ষমতাসীন দলটি বলেছে, গত দু'বার যেভাবে সার্চ কমিটির মাধমে ইসি গঠিত হয়েছে, সেই রীতির আলোকে এবং এই প্রক্রিয়ালব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের আলোকে একটি আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।

সোমবার বিকেলে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সংলাপে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। এ সময় দলের পক্ষ থেকে ইসি পুনর্গঠনে নতুন আইন প্রণয়নসহ চারফা লিখিত প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। ইসি পুনর্গঠন ইস্যুতে রাষ্ট্রপতির সংলাপের ১৭তম এবং শেষ দিনে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এই বৈঠক করেন আবুল হামিদ।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নিয়েছেন। সোমবার বিকেল ৩টা ৫৫ মিনিটে প্রতিনিধি দলটি বঙ্গভবনে পৌঁছেন। বিকেল চারটা থেকে এক ঘণ্টারও বেশি সময় বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ করেন তারা। সংলাপ শেষে বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে বঙ্গভবন থেকে বের হন আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দলটি।

সংলাপে অংশ নেয়া প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, তোফায়েল আহমেদ এমপি, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী এমপি, শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমান।

এদিকে, সংলাপ শেষে সন্ধ্যা ছয়টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা ও দলের প্রস্তাবনার বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন।

এ সময় নতুন ইসি গঠনে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি আইন করা সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, কাম এন্ড সি, নাথিং ইজ ইমপসিবল। যেহেতু এটা জনদাবি, সর্বাত্মক প্রয়াস অব্যাহত থাকবে।

সার্চ কমিটির মাধ্যমে ২০১২ এবং ২০১৭ সালের ইসি গঠনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, দু'বারই দেশের সকল রাজনৈতিক ল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই অনুশীলনে অংশগ্রহণ করেছে। এ অবস্থায় এই রীতির আলোকে এবং এই প্রক্রিয়ালব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের আলোকে একটি আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।

নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষে খসড়া আইনটি সোমবারই মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে উত্থাপনের অনুমোদন পেয়েছে জানিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে ইসি গঠনে আইন মন্ত্রণালয় আইনের খসড়া প্রস্তুত করেছে। খসড়াটি মন্ত্রিসভায় উপস্থিত ও নীতিগতভাবে উত্থাপনের অনুমোদন পেয়েছে। যথাযথ আনুষ্ঠনিকতা শেষ করে আইন মন্ত্রণালয় খসড়া আইনটি জাতীয় সংসদে পাঠাবে। জাতীয় সংসদ প্রচলিত আইন বিধিবিধান অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।

সময়ের কারণে আইন করা সম্ভব না হলে ইসি গঠনে বিকল্প কোনো প্রস্তাব দেয়া হয়েছে ক না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আওয়ামী লীগের হাতে ভিন্ন কোনো প্রক্রিয়া নেই। অথবা আইন পাসের ক্ষেত্রে আমাদের কাছে কোনো ম্যাজিকের তাস নেই। আইন আইনের গতিতেই হবে, আইনের বিকল্প কোনো বিধান নিয়ে ভাবার কোনো অবকাশই নেই।'

এ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, কেউ কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পেরেছে বা প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে পেরেছে, কেউ পারেনি। কেউ নির্দিষ্ট সময়ে পারেনি বা পেরেছে, এটা হতে পারে। অন্য কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। আর ৫০ বছর আগের আইনে যেহেতু চলছে, জাতীয় স্বার্থে একটা আইন অনেক আগে হওয়ার কথা ছিল। আমরা প্রথম ও দ্বিতীয়বার পারিনি, তৃতীয়বারের আগেও হয়ে যেতে পারে। প্রথম ও দ্বিতীয়বার হয়নি এবার হবে না এমন কোনো কথা নয়। আইনটা হয়ে গেলে এবারই হবে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ইসি শক্তিশালীকরণ, ইসির আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাবনাও দেয়া হয়েছে।

অর্থবহ সংলাপ আহ্বানের মধ্য দিয়ে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি ইসি গঠনের উদ্যোগ নেয়ায় রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ দেশের সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। রাষ্ট্রপতির দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সুগভীর জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সুবিবেচনার প্রতি আওয়ামী লীগের পরিপূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। রাষ্ট্রপতি গৃহীত যেকোনো ন্যায়সঙ্গত উদ্যোগের প্রতিও আওয়ামী লীগের পরিপূর্ণ আস্থা রয়েছে।

কেএম নুরুল হুদার নেত্বাধীন বর্তমান ইসির পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি। এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি একটি নতুন ইসি গঠন করবেন, যার অধীনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই ইস্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত ২০ ডিসেম্বর থেকে বঙ্গভবনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক লগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেন। প্রথমে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে দিয়ে সংলাপ শুরু হয়। সর্বশেষ সোমবার সংলাপে অংশ নেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা।

বর্তমানে দেশে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক লের সংখ্যা ৩৯টি হলেও ৩২টি লকে রাষ্ট্রপতির সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমন্ত্রিত লগুলোর মধ্যে সাতটি ল সংলাপে অংশগ্রহণ থেকে বিরত ছিল। লগুলো হচ্ছে, বিএনপি, বাস, সিপিবি, জেএসডি, ইসলামী আন্দোলন, এলডিপি এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল)।