রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার বেশিরভাগই করোনাভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি ও বিধিনিষেধ মানছে না। সামাজিক দূরত্ব তো দূরের কথা, ভিড়ের মধ্যেই কেনাকাটা করছে। অনেকের মুখে দেখা যায়নি মাস্ক। গতকাল সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১০টি কাঁচাবাজার ঘুরে এ দৃশ্য দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে অন্যদের শরীরে। এ জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘর থেকে বের হতে বলা হচ্ছে। মুখে মাস্ক থাকা অবধারিত। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করলেই করোনা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
গতকাল সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আধ ঘণ্টা মগবাজার নয়াটোলায় রাস্তার দু'পাশের বউবাজারে দেখা যায় ভীতিকর চিত্র। ছোট্ট জায়গায় গড়ে ওঠা এই বাজারে মানুষের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। অনেক দোকানির মুখেও মাস্ক নেই। বেশিরভাগ ক্রেতার একই অবস্থা। মাজার রোডের বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী আজমেরী বেগমের মুখেও মাস্ক দেখা যায়নি। তিনি জানান, তার স্বামী ও বড় ছেলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
ঘরে ১১ বছরের এক কন্যাসন্তান আছে। যে কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাকেই সংসারের প্রয়োজনীয় বাজার করতে হয়। মাস্ক মুখে পরে হাঁটলে হাঁপিয়ে ওঠেন তিনি।
একজন শাক বিক্রেতার মুখে মাস্ক না থাকার কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'মাস্ক পরে কাস্টমারের (ক্রেতা) সঙ্গে কথা বললে শুনতে পায় না। কাস্টমার অন্যদিকে চলে যায়। এ কারণে মাস্ক পরি না।'
সকাল ১১টায় হাতিরঝিল থানার অদূরে মধুবাগ বাজারে দেখা যায় প্রায় একই চিত্র। এ বাজারেও বেশিরভাগ মানুষের মুখে মাস্ক নেই। চার ব্যক্তি মাছ কেনার জন্য দরকষাকষি করছিলেন। পরস্পর ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারা। তাদের একজনের মুখে মাস্ক ছিল; নাম হাফিজুর রহমান। বেশিরভাগ মানুষ মাস্ক না পরায় তিনিও ক্ষুব্ধ।
হাফিজুর রহমান বলেন, করোনা সংক্রণ বৃদ্ধির কথা কে না জানে! এর পরও মানুষ মাস্ক না পরেই বের হচ্ছে। তিনি বাজারের অন্যদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলেন, তাকিয়ে দেখেন- কয়জনের মুখে মাস্ক আছে? দোকানদারদের মুখেও মাস্ক নেই।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মগবাজার পেয়ারাবাগ বাজারে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। বাজারের বেশিরভাগ মানুষের মুখ মাস্কহীন। রামপুরা, শান্তিনগর, মালিবাগসহ আরও কয়েকটি বাজারে একই দৃশ্য দেখা গেল।
করোনা সংক্রমণ রোধে ১৩ জানুয়ারি থেকে ১১টি বিধিনিষেধ জারি করেছে সরকার। সেগুলো বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে দায়িত্বশীলদেরও ভূমিকা সেভাবে দেখা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ অন্য সংস্থাগুলো কাঁচাবাজারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যারা নিয়মিত মাস্ক পরে বাজারে যাচ্ছেন তাদের দাবি, বাজারগুলোতে সংশ্নিষ্টদের নজরদারি বাড়ানো দরকার।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) ফারুক হোসেন সমকালকে বলেন, ডিএমপিতে মাত্র একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি প্রতিদিনই স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন। ম্যাজিস্ট্রেটস্বল্পতার কারণে সব বাজারে অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
ডিএমপির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সজীব দাশ জানান, গতকাল দুপুরে নিউমার্কেট ও এর আশপাশ এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন তিনি। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করায় ১৩ জনকে জরিমানা করা হয়েছে।
গতকালও রাজধানীর বাসগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের চিত্র ছিল হতাশাজনক। অনেক পরিবহনই আসনসংখ্যার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করেছে। অনেক যাত্রী-হেল্পার-চালকের মুখেও মাস্ক ছিল না। থাকলেও বেশিরভাগ থুতনির নিচে নামিয়ে রেখেছেন। লোকাল ট্রেনগুলোতেও সরকারি নির্দেশনার চিত্র ছিল হতাশাজনক। লঞ্চের অবস্থাও ছিল অভিন্ন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালায়। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় কয়েকজনকে জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে বাসের রুট পারমিট, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় কয়েকজন চালক ও মালিককে জরিমানা করা হয়।