স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে 'স্বপ্ন' নামে একটি প্রকল্প রয়েছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো হতদরিদ্র নারীদের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনে প্রত্যক্ষ অবদান রাখা। বর্তমানে জামালপুর, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার ৯৯টি ইউনিয়নে ৩ হাজার ৫৬৪ জন অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নারীকে নিয়ে স্বপ্ন প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায় চলছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া বিভিন্ন স্কিমের আওতায় রাস্তাঘাট মেরামত, বাঁধ সংস্কার ও মাটি ভরাটে কাজ করছেন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত গ্রামীণ প্রান্তিক নারীরা। এর বিনিময়ে প্রত্যেক নারীকে মজুরি হিসেবে দৈনিক ২০০ টাকা পরিশোধ করা হয়। এই টাকার মধ্যে প্রতিদিন ৫০ টাকা সঞ্চয় করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এককালীন সঞ্চয়ের এই টাকা প্রান্তিক নারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তবে সম্প্রতি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের চোখ পড়েছে স্বপ্ন প্রকল্পে যুক্ত প্রান্তিক নারীদের জমানো এই সামান্য সঞ্চয়ের দিকেও। কৌশলে চক্রের সদস্যরা ওই নারীদের কাছে থাকা মোবাইল ফোনের পিন নম্বর জেনে তাদের টাকা তুলে নিচ্ছে। সঞ্চয়ের এই টাকা জালিয়াতি করে হাতিয়ে নেওয়ার পর দুস্থ এই নারীরা পড়েছেন বিপাকে।
এখন পর্যন্ত শুধু জামালপুরের ১৬ নারীর সঞ্চয়ের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই চক্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকাও জালিয়াতি করে নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সাইবার ক্রাইম বিভাগের সদস্যরা স্বপ্ন প্রকল্প ও উপবৃত্তির টাকা যারা তুলে নিচ্ছে, তাদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত ফরিদপুরের ভাঙ্গার আজিমনগরের একটি দলকে শনাক্ত করা গেছে, যারা অনেক দিন ধরেই ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেককে বোকা বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ ছাড়া স্বপ্ন প্রকল্পের ফিন্যান্স অ্যান্ড প্রশাসনিক কর্মকর্তা রাজীব আহমেদ বিজয় রমনা থানায় একটি মামলা করেছেন।
রাজীব আহমেদ সমকালকে বলেন, যাদের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে তাদের ১৫ মাস মেয়াদি একটি সঞ্চয় প্রকল্প ছিল। এটা ওই নারীদের কষ্ট ও ঘামের টাকা। এমন না যে, এটা কেউ তাদের অনুদান দিয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে স্বপ্ন প্রকল্প চালু থাকলেও এই প্রথম প্রতারণার খপ্পরে পড়েছেন কর্মীরা। আমরা তাদের প্রায়ই প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি, যাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন নম্বর কাউকে না জানান। এরপরও তাদের পটিয়ে পিন নম্বর জেনে টাকা তুলে নেওয়া হলো। এখন টাকা উদ্ধার করে এই হতদরিদ্র নারীদের হাতে দিতে পারলেই খুশি হব। আশা করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই ব্যবস্থা করে দেবে।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী নারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বপ্ন প্রকল্পে যে নারীরা যুক্ত, তাদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের জন্য কমন পিন রয়েছে। প্রতারক চক্রটি এই পিন নম্বর কৌশলে জেনে নিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এখন পর্যন্ত যাদের কষ্টের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে তারা হলেন জামালপুরের বকশিগঞ্জের জাগিরপাড়া গ্রামের স্বপ্নকর্মী মমতা বেগম। তার জমানো ১৮ হাজার ৪৫৯ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্রটি। এ ছাড়া একই এলাকার উজান কলকিহারা গ্রামের সোহেনা বেগমের সমপরিমাণ টাকা হাতানো হয়। এ ছাড়া আরও যারা একই চক্রের ফাঁদে পড়েন তারা হলেন- আম্বিয়া বেগম, আনোয়ারা বেগম, সুমিতা রানী, রাশেদা বেগম, ফুলমতি খাতুন, মোসাম্মৎ দুলফা, মনোয়ারা বেগম, চায়না বেগম, কমলা বেগম, আন্না বেগম, রেজিয়া ও আলপনা বেগম।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, এই চক্রটি প্রথমে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর তারা স্বপ্নকর্মীদের মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর পায়। এরপরই তারা তাদের টার্গেট করে। এখন পর্যন্ত প্রতারক চক্রটির অস্তিত্ব ভাঙ্গার একটি গ্রামকেন্দ্রিক বলে জানা গেছে। ওই গ্রামের বিভিন্ন বয়সের ১৩ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে, যারা সরাসরি এই প্রতারণায় সম্পৃক্ত। তাদের মধ্যে রয়েছেন ভাঙ্গার আজিমনগরের রতন মোল্লার ছেলে টিটু মোল্লা, শাহিন হাওলাদারের ছেলে মো. নাজমুল, কাওছার হাওলাদারের ছেলে মুন্না হাওলাদার, মোখলেছ হাওলাদারের ছেলে সাদ্দাম হাওলাদার, নুরু শেখের ছেলে পলাশ শেখ, কুটুমিয়া শেখের ছেলে উজ্জ্বল শেখ এবং শওকত শেখের ছেলে আজাদ শেখ।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, উপবৃত্তির টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করা থাকে। বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা তাদের মায়ের নামে নিবন্ধন করা মোবাইলে দেওয়া হয়েছে। ওই টাকা তুলতে এজেন্ট ও কাস্টমার কেয়ারে গিয়ে অভিভাবকরা জানতে পারেন, অ্যাকাউন্ট শূন্য। কে বা কারা এ টাকা উঠিয়ে নিয়ে গেছে। ভাঙ্গার এই প্রতারক চক্রটি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত পেয়েছে পুলিশ।
সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের ডিসি আ ফ ম আল কিবরিয়া সমকালকে বলেন, স্বপ্ন প্রকল্পের টাকা যারা হাতিয়ে নিয়েছে, তারা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। ভাঙ্গায় বসেই দেশজুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক। তাদের পেছনে কেউ থাকলে তারাও গ্রেপ্তার হবে।
সিটিসিসির এসি ধ্রুব জ্যোতির্ময় গোপ বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং-সংক্রান্ত পিন নম্বর ছাড়াও কোনো গোপন তথ্য কাউকে জানানো যাবে না। কেউ কর্মকর্তা পরিচয় দিলেও তা প্রকাশ করা ঠিক হবে না।