নারায়ণগঞ্জে ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের পর এবার মহানগর শ্রমিক লীগের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কেন্দ্রীয় নেতাদের পরামর্শে এসব সিদ্ধান্ত আসছে। এরই মধ্যে যেসব কমিটি ছেঁটে ফেলা হয়েছে, সেগুলোতে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের অনুসারীদেরই আধিক্য রয়েছে।
আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্ব পাওয়া কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম সমকালকে জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন করা হবে। অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনগুলোও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে আনার চিন্তা-ভাবনা চলছে। খুব কম সময়ের মধ্যেই ব্যক্তির বলয় থেকে নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ পরিবারকে মুক্ত করা হবে। নতুন কাঠামোতে স্থান পাবেন ত্যাগী, পরীক্ষিত ও আদর্শবান নেতা।
ইতোমধ্যে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ জেলা এবং মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি ছেঁটে ফেলার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতারা দলের নীতিনির্ধারক নেতাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই এ ব্যাপারে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত
জানানোর তোড়জোড় রয়েছে। তিন বছর মেয়াদি এ দুই সাংগঠনিক কমিটির সময়সীমা অনেক আগেই ফুরিয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর জেলা কমিটি এবং ২০১৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মহানগর কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা এমপি শামীম ওসমান এবং মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ঘরানার রাজনীতিতে টুকরো হয়ে আছেন। এর মধ্যে দুই কমিটিতেই তুলনামূলক বিচারে শামীম ওসমান অনুসারী নেতাদের প্রাধান্য বেশি। শীর্ষ নেতাদের মধ্যে আইভী বলয়ে রয়েছেন জেলা সভাপতি আবদুল হাই ও মহানগর সভাপতি আনোয়ার হোসেন। শামীম বলয়ে আছেন জেলা সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদল ও মহানগর সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা।
নাসিক নির্বাচন পরিদর্শন করে আসা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নীতিনির্ধারক নেতা সমকালকে জানিয়েছেন, এই নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী আইভী জয় পেলেও শামীম ওসমানের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী অনেকেই দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করেছেন। এ কারণে শামীম ওসমানের বলয় ভেঙে ফেলার প্রস্তুতি চলছে।
নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যেই প্রথমে ৯ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগ, পরে ভোটের দিন জেলা-মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবার নারায়ণগঞ্জ মহানগর শ্রমিক লীগের কমিটিও বিলুপ্ত করা হলো। স্থানীয় নেতারা বলছেন, এই কমিটিগুলোর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ বেশিরভাগ নেতাই শামীম ওসমান বলয়ের। অবশ্য সংখ্যায় কম হলেও এই সংগঠনগুলোর কয়েকজন নেতা সেলিনা হায়াৎ আইভীর অনুসারী।
কেন্দ্রীয় নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মহানগর ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ, সাধারণ সম্পাদক হাসনাত রহমান বিন্দু, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়া খোকন, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধান, জাতীয় শ্রমিক লীগের জেলা শাখার আহ্বায়ক আবদুল কাদের, সদস্য সচিব কামাল হোসেন, মহানগর শাখার সভাপতি কাজিম উদ্দিন প্রধান, সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান মুন্না স্থানীয় রাজনীতিতে শামীম বলয়ের। আবার আত্মীয়তার দিক থেকে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক নিজাম উদ্দিন আহমেদ হলেন আইভীর মামা।
এই প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগ সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় বলেছেন, নাসিক নির্বাচনে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা থাকায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে সম্মেলনের মাধ্যমে এ কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। এর পর পুনর্গঠন করা হবে জেলা কমিটি। জানা যায়, মহানগর কমিটির মতো জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আজিজুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম রাসেল স্থানীয় রাজনীতিতে শামীম ওসমানের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক নিজাম উদ্দিন আহমেদ পারিবারিক সম্পর্কের দিক থেকে আইভীর মামা হলেও এই সংগঠনের প্রধান তিন নেতা শামীমের রাজনীতি অনুসরণ করেন। তারা হলেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়া খোকন, মহানগর শাখার সভাপতি জুয়েল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধান।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবু বলেন, নাসিক নির্বাচনে বিতর্কিত ভূমিকা থাকায় নারায়ণগঞ্জ জেলা, মহানগরসহ সদর, ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ এবং মহানগরের আওতাধীন ২৭টি ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। দ্রুতই সম্ভাব্য নেতৃত্বের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের পর আলোচনা কিংবা সম্মেলনের মাধ্যমে সব কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
স্থানীয় মহিলা আওয়ামী লীগ এবং যুব মহিলা লীগে একচ্ছত্র প্রাধান্য শামীম ওসমান বলয়ের। তাদের মধ্যে রয়েছেন মহিলা আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি শিরিন বেগম, মহানগর সভাপতি ইসরাত জাহান স্মৃতি, সাধারণ সম্পাদক রেহেনা বেগম, যুব মহিলা লীগের জেলা আহ্বায়ক সাদিয়া আফরিন ও মহানগর আহ্বায়ক সুইটি ইয়াছমিন। এ দুই অঙ্গ সংগঠনও ঢেলে সাজানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।
মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগম জানিয়েছেন, খুব কম সময়ের মধ্যেই সম্মেলনের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর শাখা পুনর্গঠন করা হবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, সংগঠনের নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর কমিটি নতুন করে সাজানো হবে। অর্থাৎ সম্মেলনের মাধ্যমে এ দুই কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
নারায়ণগঞ্জ যুবলীগ, কৃষক লীগ এবং তাঁতী লীগের নেতাকর্মীরাও আলোচিত দুই নেতাকে ঘিরে বিভক্ত হয়ে আছেন। এদের মধ্যে যুবলীগের জেলা সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদল, মহানগর সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনু, কৃষক লীগের জেলা সভাপতি নাজিম উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম চেঙ্গিস, মহানগর সভাপতি শরীফুজ্জামান জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান লিটন, তাঁতী লীগের জেলা সভাপতি হাসান ফেরদৌস জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন, মহানগর আহ্বায়ক শাহেদ হোসেন ও সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর আলম জড়িয়ে আছেন শামীম ওসমান বলয়ের রাজনীতিতে। আইভীর ছোট ভাই মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আহাম্মেদ আলী রেজা উজ্জ্বল ও জেলা যুবলীগের সভাপতি আবদুল কাদির আইভী ঘরানার।