নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সংলাপ শেষ হলো। সব রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সারাদেশের মানুষ এখন তাকিয়ে রাষ্ট্রপতির দিকে। তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন, সেটাই এখন আলোচনার বিষয়। সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ৮৪ শতাংশই নতুন আইন প্রণয়ন করার পক্ষে মত জানিয়েছে। বেশ কয়েকটি দল নির্বাচনকালীন সরকারের প্রস্তাব দিয়েছে। সার্চ কমিটির পক্ষেও রয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এতদিন আইন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে এলেও সংলাপে ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের পক্ষেই মত দিয়েছে। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেয়। পরে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, রাষ্ট্রপতির কাছে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ মেনে ইসি গঠনে একটি আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি। এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্র্রপতি নতুন ইসি গঠন করবেন, যার অধীনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
রাষ্ট্র্রপতি গত ২০ ডিসেম্বর থেকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেন। বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত এ সংলাপে গতকাল পর্যন্ত ২৫টি দল অংশ নিয়েছে, যা মোট নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ৬৪ শতাংশ। প্রথম দিন সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিকে দিয়ে সংলাপ শুরু হয়। সর্বশেষ গতকাল সোমবার সংলাপে অংশ নেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা।
বর্তমানে দেশে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯টি। এর মধ্যে ৩২টি দলকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। প্রায় ১৮ শতাংশ দল (৭টি) আমন্ত্রণ পায়নি। আমন্ত্রিত দলগুলোর মধ্যে বিএনপিসহ সাতটি দল (প্রায় ১৮ শতাংশ) সংলাপ 'বর্জন' করে। সংলাপে অংশগ্রহণ না করা অন্য ছয়টি দল হচ্ছে- বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)।
সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বাদে সংলাপে অংশ নেওয়া ২৫ দলের মধ্যে ২১টি ইসি গঠনে সংবিধানের আলোকে স্থায়ী আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, ১৪ দলের সাত শরিক, সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও রয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকটি দলের মত, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংসদে আইন করা যেতে পারে।
একাদশ জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই আইন উত্থাপন ও পাসের প্রস্তাব করে বলা হয়েছে, পাঁচ বছর পরপর যেন ইসি গঠন করতে গিয়ে বিব্রত হতে না হয়, সে কারণেই আইনটা প্রয়োজন। কয়েকটি দলের সঙ্গে সংলাপকালে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ নিজেও ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের পক্ষে মত দিয়েছেন।
তবে সংলাপে অংশ নেওয়া কয়েকটি দল এই সময়ের মধ্যে আইন প্রণয়ন সম্ভব না হলে গত দু'বারের মতো এবারও সার্চ (অনুসন্ধান) কমিটির মাধ্যমে নতুন ইসি গঠনের পক্ষে মত তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে সৎ, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে সার্চ কমিটি এবং নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে তারা। সার্চ কমিটি চেয়েছে ১০টি বা প্রায় ৪০ শতাংশ দল।
সার্চ কমিটির সদস্য এবং নির্বাচন কমিশনার হিসেবে বেশ কিছু নাম ছাড়াও এক বা একাধিক নারী কমিশনার নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে কয়েকটি দল। এ ছাড়া নির্বাচন ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাবও এসেছে।
এর আগে ২০১২ ও ২০১৭ সালের ইসি গঠনের সময় নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপ শেষে সার্চ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ এবং ২০১২ সালে প্রয়াত রাষ্ট্র্রপতি মো. জিল্লুর রহমান সংলাপ শেষে সার্চ কমিটি করে দেন।
ক্ষমতাসীন জোটও চায় আইন হোক :ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল শরিকদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ছাড়াও আরও সাতটি দল সংলাপে অংশ নিয়েছে। সব দলই নতুন ইসি গঠনে আইন প্রণয়নের পক্ষে মত দিয়েছে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সংলাপে ইসি গঠনে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছে। দলটি একই সঙ্গে সাংবিধানিক বিভিন্ন সংস্থায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে সার্চ কমিটি করার মাধ্যমে ইসি গঠনকে তুলনামূলক ভালো উদ্যোগ বলে মত দিয়েছে।
১৪ দলীয় জোটের অন্য পাঁচ শরিক দলের মধ্যে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের পাঁচ দফা, তরীকত ফেডারেশনের চার দফা, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাত দফা, গণতন্ত্রী পার্টির আট দফা এবং জাতীয় পার্টি (জেপি) প্রায় অভিন্ন সুরে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে স্থায়ী আইন প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছে। সাম্যবাদী দলের প্রস্তাবে জাতীয় নির্বাচনকালে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
প্রথম দিনের সংলাপে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি নতুন ইসি গঠনে আইন প্রণয়নসহ তিন দফা প্রস্তাব দেয়। দলটি সার্চ কমিটির জন্য চারজন এবং নির্বাচন কমিশনার হিসেবে একজনের নাম প্রস্তাব করেছে।
গণফোরাম সংবিধান অনুযায়ী ইসি গঠন করতে আইন প্রণয়ন এবং এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রস্তাব দিয়েছে। বিকল্পধারা স্থায়ী আইন করা এবং আইন না হওয়া পর্যন্ত সার্চ কমিটি গঠনসহ তিনটি প্রস্তাব দিয়েছে। সার্চ কমিটির জন্য তিনজনের নামও প্রস্তাব করে দলটি।
সংলাপকালে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নতুন ইসি গঠনে আইন প্রণয়নসহ ছয় দফা প্রস্তাব দেয়। আইন প্রণয়ন সম্ভব না হলে 'মেরুদণ্ড আছে এমন লোককে' দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার প্রস্তাব দেয় দলটি। আর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) আইন প্রণয়ন ছাড়াও সামরিক বাহিনীকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সহযোগী শক্তি হিসেবে সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেয়।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি এখনই নির্বাচনী আইন প্রণয়ন সম্ভব না হলে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে বলেছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ইসি গঠনে আইন প্রণয়নসহ ছয় দফা প্রস্তাব দেয়। খেলাফত মজলিস নির্বাচনকালে সংসদ ভেঙে দিয়ে 'নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার' গঠনসহ পাঁচ দফা প্রস্তাব করে। দলটি একজন আলেম ও এক নারী সদস্যকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের আহ্বানও জানিয়েছে।
জাকের পার্টির চার প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল নির্বাচনী আইন প্রণয়ন এবং নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সার্চ কমিটি গঠন। ইসলামী ঐক্যজোট আইন প্রণয়ন না হলে দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন আলেমসহ ইমানদার ও আমানতদার ব্যক্তিদের নিয়ে সার্চ কমিটি ও নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেয়। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম আইন করে নির্বাচন কমিশন গঠন এবং জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনে ইসিকে ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী সময়োপযোগী আইন প্রণয়ন ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনসহ পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ। নতুন ইসি গঠনে আইন প্রণয়ন ও আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (ইএমএস) গ্রহণ করাসহ তিন দফা প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ)।
বাংলা?দেশ ন?্যাশনা?লিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) ?নির্বাচন ক?মিশন গঠনে সার্চ ক?মি?টি গঠন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশ?ক্তির সমন্ব?য়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনসহ তিন দফা প্রস্তাব করেছে।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট বিদ্যমান সাংবিধানিক ধারা সংশোধন করে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন এবং জাতীয় নির্বাচনে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করার ক্ষমতার পাশাপাশি নির্বাচনকালীন স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কমিশনের ওপর ন্যস্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠনে পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম প্রস্তাবও করেছে দলটি।
গণফ্রন্ট স্বাধীনতার পর থেকে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন জাতীয় সরকার গঠনসহ ১৪ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) সৎ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন এবং সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নেতাদের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনসহ পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছে।


বিষয় : (ইসি) গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সংলাপ

মন্তব্য করুন