আমাদের জীবনে নিত্য বৈষয়িকতার মধ্যেও বাস করে এক কবি-সত্তা। কখনও কখনও সে কোনো এক অতীতের দিকে তাকিয়ে বলে, 'এত দিন কোথায় ছিলেন?' কোনো কোনো প্রিয়জনকে আর বলা হয়ে ওঠে না, 'ইকলাকো ডোকনি?' সপ্তাহ দুয়েক আগে ঈশ্বরদী থেকে ছোট ভাই কে এম হিটু জানাল, ডোমিনিক বিশ্বাস আর বেঁচে নেই। যেমন বেঁচে নেই নূরজাহান রোডের উড়ে জ্যোতিষী অথবা প্রিয় ওসমান শওকত মামা। আমার ও এক বন্ধুর অজানা অতীত বলে চমকে দেওয়া জ্যোতিষী ভদ্রলোকের নামটাও জানা হলো না। আমার বহু গানের গীতিকার ওসমান শওকত মামা অবশ্য 'জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজও আমি' গানের জন্যই বহুজনের পরিচিত। হঠাৎ হারানো এঁদেরকে বলতে চেয়েছিলাম, 'ইকলাকো ডোকনি'- কেমন আছেন আপনি? সবাই তো জনিক নকরেক নন, মান্দিদের সাংসারেক ধর্মের খামাল জনিক আচ্চুর মতো তাদের সঙ্গে যোগাযোগও নিয়মিত ছিল না যে মৃত্যুর আগেই বিদায় নেবেন। জানিয়ে দেবেন আগাম খবর। তাদের আরও একবার বলা হয়নি, 'কেমন আছেন আপনি?'
'ইকলাকো ডোকনি' কি মালপাহাড়িয়া ভাষা? ফোনে উচ্চারণ ঠিক শুনেছি তো? এমন দ্বিধা ছিল মনে। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মাড়মি থেকে ফেরার দু'দিন পরে এক সকালে ডোমিনিক দাদা ফোনে জানতে চাইলেন- 'ইকলাকো ডোকনি?' বুঝতে পারলাম তিনি বলেছেন, 'আপনি কেমন আছেন?' ভাষাটা আসলে মালপাহাড়িয়াদের কিনা সংশয় ছিল। ভেবেছিলাম, এটা সাদরি ভাষাও হতে পারে। সাদরি আদিবাসীদের কয়েকটি জাতির একই রকম কথা বলার একটা মিশ্র ভাষা বা লিঙ্গুয়া-ফ্রাঙ্কা। সাদরিতে উর্দু, হিন্দি, মৈথিলী ও বাংলা ভাষার মিশ্রণ ঘটেছে। লিঙ্গুয়া-ফ্রাঙ্কার সমার্থক শব্দ হলো বাহক ভাষা বা সংযোগকারী ভাষা, যা বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে যোগাযোগের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহূত হয়ে থাকে। তবে পরে খ্রিস্টীনা বিশ্বাস দিদিমা নিশ্চিত করেছেন, 'ওটা পাহাড়িয়াদের মালতো ভাষা।' খ্রিস্টীনা বিশ্বাসের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার মিয়াপুর গ্রামে। তিনি জাতীয় আদিবাসী পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য।
ঈশ্বরদীর মাড়মিতে রয়েছে পাহাড়িয়াদের কিছু মানুষ। পাহাড়িয়ারা রাজশাহী, নাটোর, পাবনা, নওগাঁ, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও রংপুর জেলায় এখনও আছে বলে জেনেছি। তবে তাদের সংখ্যা অনুমান করতে পারছি না। শাওরিয়া পাহাড়িয়া, কুমুর পাহাড়িয়া ও মালপাহাড়িয়া নামে পাহাড়িয়াদের তিনটি প্রধান শাখা থাকলেও তাদের আলাদা করে ভাগ করা এখন কঠিন। প্রায় সবাই খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে বিশ্বাস পদবি নিয়েছে, তাই গোত্রচিহ্ন বিলুপ্তির পথে। তারা মনে করে, অতীতে তাদের পূর্বপুরুষ ভারতের দুমকা জেলার রাজমহল পাহাড়ে বাস করত। ফাদার স্টিভেন জি. গমেজ ও ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কের মতে, পাহাড়িয়ারা আগে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকে বসবাস করত। পরে জীবিকার সন্ধানে বাংলা-বিহার-ওডিশার সোনা নদীর আশপাশে বাস করতে থাকে। সেখান থেকে মুসলমানদের আগ্রাসনের ফলে রাজমহলে এসে বসবাস শুরু করে। পরে বাংলার বরেন্দ্র অঞ্চলের কিছুটা রুক্ষ, লালচে মাটিতে আবাদ শুরু করার দুরূহ কাজটি তারাই করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও এসব অঞ্চলে প্রচুর বন্যশূকর, খরগোশসহ শিকারের জন্য আরও বন্যপ্রাণী পাওয়া যেত। তারপর
দেশের অতিরিক্ত সংখ্যক গণমানুষের জন্য খাবার জোগান দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে এবং মানবজীবনে খাদ্য ও ভোগ বৃদ্ধিই একমাত্র লক্ষ্য- এ দর্শন দিয়ে পরিচালিত রাষ্ট্রে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। সাধারণ গ্রামীণ মানুষের ঋণগ্রস্ত মানুষ হয়ে ওঠা, নাগরিক হওয়ার চেষ্টা, বন-বনানীর নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্রমাগত প্রান্তে পড়ে যায় গ্রামীণ মানুষ। নাগরিক মানুষ ভোগবাদ এবং অসুস্থ দেহের ভার বহন করছে। সবচেয়ে বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়েছে আদিবাসী মানুষ। প্রকৃতির সঙ্গে যত যুক্ত যে মানুষ, তত বেশি বিপন্ন হয়েছে সেই মানুষ। আমি হতাশ নই। জানি, প্রকৃতি স্বনির্ভর; সে তার উত্তর দেবে নিজস্ব নিয়মে, ধীরে, কিছুটা অলক্ষ্যে।
মানুষ এক আশ্চর্য প্রাণী। যে মানুষকে রূঢ় মনে হয়, তার ভেতরেও থাকতে পারে অসীম মায়ার আধার। মালপাহাড়িয়াদের গ্রামে যাচ্ছি ভেবে প্রথম দিন চলে গিয়েছিলাম পতিরাজপুরে, বাগদীদের গ্রামে; সেখানে পেলাম অনেক মায়া। পরের দিন মালপাহাড়িয়া গ্রামে যাওয়ার পথে মোটরবাইক দুর্ঘটনায় পড়লাম। তবে তৃতীয় দিন সত্যি সত্যি মাড়মি পৌঁছে গেলাম। এত বাধা পার হয়ে যেখানে গেলাম, আগের দিন এবং তৃতীয় দিনেও যারা হাসিমুখে আমার জন্য অপেক্ষা করেছেন, এক সন্ধ্যায় তারা আমার হৃদয়ে ঢুকে গেলেন। আমার পথের বাধার মতো মালপাহাড়িয়া জাতিও তাদের জীবনে অনেক বাধা ডিঙিয়েছে। সমতলের শান্তি ছেড়ে পাহাড়ে চলে গেছে। নিজেদের জীবনে ধারণ করেছে বিষাদ। তারা মনে করে, 'কাঁজদু এংগেন লাপেনি, এন হন্দ্রিক কাঁজান লাপেনি।' বাংলা হলো, 'মাটি আমাকে খাবে, আমি কেন মাটি নেব।' ব্রিটিশ আমলে সরকার জমি বন্দোবস্ত দিতে চাইলে মালপাহাড়িরা এমনটা ভেবেছিল। এই কথার মানে কী? 'আমার সারা দেহ খেও গো মাটি' ধরনের ভাবনা? নাকি মাটি নিয়ে বিরোধ, সংঘাত এবং মামলা করে পস্তানোর ভয়? নিশ্চিত করে জানি না। তবে মালপাহাড়িদের পাহাড়ে, নিরুপদ্রবে থাকতে চাওয়ার মনোভাব ছিল।
ডোমিনিক দাদার সঙ্গে যেদিন দেখা হয়েছিল, নিজেই বলেছিলেন, মালপাহাড়িদের আদি ভাষা 'মালতো'টা ভালো জানা নেই তাদের কারোর। তবে ঈশ্বরদীর চেয়ে রাজশাহীতে হয়তো তাদের নিজ ভাষার চর্চা বেশি। রাজশাহীর খ্রিস্টীনা দিদিমার সঙ্গে আলাপ করে তেমনই মনে হলো। আরও বেশি করে মনে হলো, মালপাহাড়িয়া নারীরা হয়তো অনেক বেশি ভাইব্রেন্ট। পুরুষরাও। আদনিক বিশ্বাস দিদি, ডোমিনিক বিশ্বাসের স্ত্রী সেই সন্ধ্যায় অভিমান করেছিলেন আমার প্রতি। অভিমান করার কারণ ছিল। বিকেলবেলা বাচ্চাদের খেলাধুলার কয়েকটা ছবি তুলে পুকুরপাড়ে বসলাম আমরা। তিন দিন ধরে তারা অপেক্ষা করেছিলেন। বারবার বাধা পড়ছিল, যেতে পারছিলাম না। তবুও গল্প শেষে নাচ-গান চলল। তখন আঁধার। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় স্বপ্নময় পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। অদ্ভুত মাদক সুরে কিশোরীরা গান গাইছিল। আদনিক দিদি লুকিয়ে আমাকে খেজুর রস দিয়ে ঘরে বানানো যে পানীয় পান করতে দিলেন- এত মিষ্টি, এত সুস্বাদু পানীয় আর কখনও খেয়েছি কিনা মনে করতে পারি না। মিষ্টতা আমার ভালো লাগে। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ঘোর লাগছিল, মায়া লাগছিল। দিদি তার ঘরে যেতে বললেন; কিন্তু আমার তখন হঠাৎ একটা খবর এলো, ফেরার তাড়া নিয়ে। যাইনি তার ঘরে, তিনি অভিমান করে ছুটে চলে গেলেন পুকুরপাড় ধরে। আমিও তার পেছনে দৌড় দিলাম। কিন্তু দ্বিধা আমাকে বাগান পার হতে দিল না। ফিরে এলাম। আর দেখা হয়নি। মান ভাঙাতে যাব ভেবেছিলাম। খুব বেশি দেরি করিনি। তবুও পরের ফেব্রুয়ারি আসার আগেই চলে গেলেন ডোমিনিকদা।
পক্ষাঘাতগ্রস্ত ডোমিনিক বিশ্বাস ক্র্যাচে ভর করে হাঁটতেন। তবে স্মৃতি হারাননি কিছুই। বলছিলেন, একসময় বন-জঙ্গলে শিকার করাই ছিল তাদের মূল পেশা। তার শৈশবেই বাড়ির পাশে বন ছিল। এখন এই মাড়মি গ্রামের মালপাহাড়িয়াদের বসতভিটা ছাড়া সব জমি বেদখল হয়ে গেছে। মাড়মিতে বাস করে মালপাহাড়িদের ৭০ থেকে ৭৫টির মতো পরিবার। তাদের কেউই আদি ধর্ম পালন করে না। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাসী হওয়ার উদাহরণ হিসেবে বোধ হয় পাদ্রিরা বিশ্বাস পদবি দান করেছে। কথিত আছে, ১৭৭২ সালে তীর-ধনুক দিয়ে বাংলার তৎকালীন গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসকে পরাজিত করে পাহাড়িরা। পরে অগাস্টাস ক্লিভল্যান্ড তাদের চাকরিতে নিয়োগ দিয়ে খানিকটা বশীভূত করে। পাহাড়িয়াদের প্রভাবিত করে সাঁওতাল বিদ্রোহ দমনে সিপাহি হিসেবে ব্যবহার করে। আদিবাসীর সঙ্গে আদিবাসীর লড়াই করতে বাধ্য করল তারা। খানিকটা বাংলাদেশের পাহাড়ে চলমান কূটরাজনীতির মতো। কিন্তু অতীতের ওই ঘটনার জন্য গভীর বেদনা আছে পাহাড়িয়াদের মনে। তারা ভাই হয়ে ভাইকে আঘাত করার ব্যথায় এখনও কাতর।

বিষয় : বন-পাহাড়ের দেশে

মন্তব্য করুন