রাজধানীর মহাখালীর একটি মোটর ওয়ার্কশপের কর্মী ১৬ বছর বয়সী মামুন হোসেন করোনার প্রতিষেধক টিকা পায়নি। একই ওয়ার্কশপের কর্মী ১৫ বছর বয়সী রাজ্জাক, রহমান এবং পাশের আরেকটি গ্যারেজের সুমিত এবং রহিমও টিকা পায়নি। অথচ তাদের ছোটবেলার বন্ধুদের মধ্যে যারা পড়াশোনা করছে, তারা টিকা পেয়েছে।
রাজ্জাক জানায়, অভাবের সংসারে হাল ধরতে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা হয়নি। প্রথমে একটি খাবারের হোটেলে, পরে গ্যারেজে চাকরি নিয়েছে। রাজ্জাকের মতো অন্যদের বক্তব্যও প্রায় একই ধরনের। রাজ্জাক ও রহমান গত জুলাইয়ে করোনা আক্রান্ত হয়েছিল। রাজ্জাককে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে ১০ দিন। মামুনের অভিযোগ, তারা গরিব হওয়ায় সমাজে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। করোনার টিকার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। স্কুলে যাওয়া সবাই টিকা পেলেও তারা পাচ্ছে না। পড়াশোনা না করা কেউ কি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবে না?
মামুন-রাজ্জাকদের মতো ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় এক কোটি শিশু-কিশোর টিকা পায়নি। শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ঝরে পড়া এই শিশু-কিশোরদের টিকার আওতায় আনতে সরকার এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি। তাদের বড় একটি অংশ কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে শিশু বয়সেই। অথচ সমবয়সী এক কোটি ১৩ লাখের মতো শিক্ষার্থী টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছে। প্রথম ডোজ গ্রহণ করাদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ১২ লাখ ১৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। তবে ১৬ লাখের মতো শিক্ষার্থী এখনও টিকা নেয়নি।
বৈশ্বিকভাবে করোনার টিকাদান শুরুর আগেই এ ক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, টিকাদানে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা না গেলে মহামারি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। কিন্তু বাংলাদেশ হাঁটছে উল্টো পথে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, টিকার ক্ষেত্রে ন্যায্যতার অর্থ হচ্ছে যার প্রয়োজন তিনি টিকা পাবেন। এ ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আবাসস্থল, বয়স, লিঙ্গ ও জাতিসত্তা বিবেচ্য হবে না। দেশে টিকাদানে এই ন্যায্যতার ঘাটতি থাকায় করোনা নিয়ন্ত্রণে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে।
গত ৮ থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত হয়। এখনও ১৬ লাখ শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব না হলেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টিকা গ্রহণ না করা শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারবে না। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইন অনুযায়ী নির্ধারিত বয়সের সবাইকে টিকার আওতায় আনা হবে। বাদ পড়া শিক্ষার্থীরাও টিকার আওতায় চলে আসবে। পরিবহন শ্রমিকদের টিকাকরণ শুরু হয়েছে। এক কোটির মতো শিশু-কিশোর স্কুলে যায় না। তাদেরও টিকাদানের পরিকল্পনা হয়েছে। একই বয়সী শিক্ষার্থীদের আগে দেওয়ার কারণ তারা স্কুলে যায় এবং মানুষের সংস্পর্শে আসে। তাদের ঝুঁকি বিবেচনায় আগে টিকা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত :টিকাদানে বৈষম্য করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করবে বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক শিক্ষামন্ত্রী। তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য টিকার ব্যবস্থা করতে পেরেছেন। কিন্তু স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোরদের কথা কেউ বিবেচনায় নেয়নি। তাদের প্রতি সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুরু থেকেই টিকাদানে ন্যায্যতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। কিন্তু দেশে টিকা নিয়ে বৈষম্য হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুল থেকে ঝরে পড়াদের টিকাদানে সরকারের সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। এই শিশু-কিশোরদের কারও জাতীয় পরিচয়পত্র হয়নি। এমনকি জন্মনিবন্ধন সনদও নেই। তাহলে কী উপায়ে তাদের টিকা দেওয়া হবে? বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেছেন, দেশে টিকার কোনো সংকট নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত বয়সসীমার কেউ টিকার বাইরে থাকবে না। স্কুল থেকে ঝরে পড়াদের টিকাদানের পরিকল্পনা আছে।