দেশে করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রিপরিষদ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ ১১ দফা বিধিনিষেধ জারি করেছে কিছুদিন আগেই। সরকারের জারি করা এই নির্দেশনা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই মানছেন না। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে চলছে সরকারি অফিস-আদালত। মন্ত্রিসভা বৈঠকেও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত থাকছে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা সামাজিক দূরত্ব মানছেন না। দপ্তরগুলোতে তাই করোনা আক্রান্তের হিড়িক পড়েছে। এরই মধ্যে বিচারপতি, মেয়র, প্রতিমন্ত্রী, সচিব, জেলা প্রশাসকসহ শতাধিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সর্বশেষ গতকাল শেষ হওয়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষার চিত্র দেখা গেছে।
এরই মধ্যে দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক দিনে শনাক্তের সংখ্যা ১১ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ ঘটনাকে উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তাদের অভিমত, মন্ত্রী-এমপি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে উদাসীন হলে জনসাধারণের ওপর তার প্রভাব পড়বে। নিজে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে তার পক্ষে অন্যকে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ বা নির্দেশনা দেওয়া সম্ভব হবে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয় ঘুরে দেখা যায়, ভেতরে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মুখে মাস্ক নেই। করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ে সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও এবার তা স্বাভাবিকভাবেই চলছে।
অন্যান্য দপ্তর এবং মাঠপর্যায়েও স্বাস্থ্যবিধি ব্যাপকভাবে উপেক্ষিত থাকছে। দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বিধিনিষেধ জারির পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নিজেই ৬৪ জেলার ডিসি ও বিভাগীয় কমিশনারদের নিয়ে আয়োজন করেছে ডিসি সম্মেলন। আগামী ২৩ জানুয়ারি শুরু হচ্ছে পুলিশ সপ্তাহ। ডিসি সম্মেলন উপলক্ষে করোনা টেস্টের রিপোর্টে শীর্ষ অনেক কর্মকর্তার পজিটিভ এসেছে। কক্সবাজার, রাজশাহী, পটুয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। এ ছাড়া রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের দুই কমিশনার কভিডে ভুগছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনও করোনা আক্রান্ত হয়েছেন।
করোনা সংক্রমণের শুরুতে সচিবালয় ক্লিনিকের উদ্যোগে সচিবালয়ের প্রবেশপথে থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপা হলেও এবার সেটি বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রবেশপথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিস্কারের কার্যক্রমও বন্ধ। এমনকি স্বাস্থ্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৌচাগারগুলোতে সাবান নেই। তথ্য ও জনপ্রশাসনসহ বেশিরভাগ মন্ত্রণালয়ের শৌচাগারে জমেছে ময়লার স্তূপ। তথ্য, স্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন ছাড়াও অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগেও এমন চিত্র দেখা যায়।
সচিবালয়ের বাইরের বিভাগ ও অধিদপ্তরের কিছু শৌচাগারে তরল সাবান রাখার বক্স থাকলেও সেগুলো ছিল ফাঁকা। করোনাকালে সচিবালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে নতুন নতুন বেসিন তৈরি করা হলেও তা অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, করোনা সংক্রমণের পরিস্থিতিটা পর্যবেক্ষণ করছি। জনসচেতনা তৈরির চেষ্টা করছি। যদি প্রয়োজন মনে হয়, তাহলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। ডিসি সম্মেলনের তারিখ আগেই নির্ধারণ হওয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে পরিস্থিতি খারাপ হলে পুলিশ সপ্তাহ বাতিল হতে পারে।
আদালত অঙ্গনেও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত থাকছে। প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীসহ উচ্চ আদালতের ২২ বিচারপতি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইনজীবীরা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়াও আক্রান্ত হয়েছেন দেশের বিভিন্ন বিচারিক আদালতের ৭৯ জন বিচারকসহ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন আহম্মদসহ বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে আছেন। তার পরও ডিএসসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের চিত্র অনুপস্থিত। অনেকেই মাস্ক ছাড়া এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যাচ্ছেন। সেবা গ্রহীতারাও স্বাভাবিক সময়ের মতোই নগর ভবনে যাতায়াত করছেন। অনেকের মুখে মাস্ক নেই। কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রধান ফটকেও কোনো জীবাণুনাশক স্প্রে করার ব্যবস্থা করা হয়নি। হাত ধোয়ারও কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ প্রথম ঢেউয়ের সময় নগর ভবনের আঙিনার রাস্তায় জীবাণুনাশক জলাশয় তৈরি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থাসহ আরও কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল। সেবা গ্রহীতারা লিফটগুলোতে গাদাগাদি করে ওপর-নিচ করছেন।
ডিএসসিসির মুখপাত্র আবু নাছের সমকালকে বলেন, এবার বিশেষ কোনো নির্দেশনা করপোরেশন থেকে দেওয়া হয়নি। তবে মাস্ক তো সবারই পরা উচিত। এটা তো অনেক আগে থেকেই বলা হচ্ছে। এ ছাড়া করোনা রোধে ভবিষ্যতে কোনো নির্দেশনা এলে অবহিত করা হবে।
করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই সেবাগ্রহীতাদের নগর ভবনে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সেটা বলবৎ আছে। মাস্ক ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রবেশমুখে হাতে স্প্রে করার জন্য কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীও দাঁড়িয়ে থাকেন।
দুই বছর আগে কারওয়ান বাজারে ঢাকা ওয়াসা ভবনে সাধারণের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল কর্তৃপক্ষ। করোনা শুরুর পর বহিরাগতদের প্রবেশ প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সেবাগ্রহীতা কার কাছে যাবেন ইন্টারকমে ওই কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করার সুযোগ দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে দর্শনার্থীর নাম-ফোন নম্বর ও ছবি তুলে রেখে তবেই প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। তবে এবার এসবের কিছুই করা হয়নি।
সংস্থাটির তথ্য কর্মকর্তা মোস্তফা তারেক বলেন, খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে আর কক্ষে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছেন না। এর বাইরে অন্য কোনো উদ্যোগ নেই।
প্রথম ঢেউয়ের সময় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) মূল ভবনের সামনে একটি জীবাণুনাশক টানেল বসিয়েছিল। ভবনে প্রবেশকারীদের সবাইকে ওই টানেলের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে হতো। এ ছাড়া সামনে কিছু হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপনসহ সাবান-পানির ব্যবস্থা করেছিল। এবার এমন কোনো উদ্যোগ নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরিধানের নির্দেশনা মানছেন না।
এ প্রসঙ্গে রাজউকের মুখপাত্র সাইদুল ইসলাম বলেন, ওই টানেল ও বেসিনগুলো সব ভেঙে গেছে। তবে এবার করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির পর থেকেই অফিস মিটিংগুলোতে একটি চেয়ার খালি রেখে মিটিং করা হচ্ছে। মিটিংয়ের সময় সবাই মাস্কও পরছেন। হয়তো বক্তব্য দেওয়ার সময়টুকুতে মাস্ক নামিয়ে রাখছেন।
করোনার সংক্রমণ রোধে গত ১০ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ১১টি নির্দেশনা জারি করা হয়। এর ১ নম্বরে ছিল, 'দোকান, শপিংমল ও বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা এবং হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সব জনসমাগমস্থলে বাধ্যতামূলকভাবে সবাইকে মাস্ক পরিধান করতে হবে।' ২ নম্বরে ছিল, 'অফিস-আদালতসহ ঘরের বাইরে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে ব্যত্যয় রোধে সারাদেশে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে।' কিন্তু করোনা প্রতিরোধের প্রথম উপায় 'মাস্ক' ব্যবহারের বিষয়ে সর্বত্রই উদাসীনতা বিরাজ করছে। আর মোবাইল কোর্ট পরিচালনার চিত্রও হতাশাজনক।
বিপদ বাড়বে :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সমাজের যারা শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক, তারাও সাধারণ মানুষের ধারায় চলে গেলে তখন পরিণতি খারাপ হয়। কারণ, সমাজের সচেতন ও শিক্ষিত মানুষকে সাধারণ মানুষ অনুসরণ করেন। সুতরাং তাদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। কিন্তু সেটি যথাযথ না হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের জনগণের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এটি বিবেচনায় নিয়ে অন্তত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে তারা দায়িত্বশীল হবেন বলে প্রত্যাশা করি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, সরকার যদি তার নিজের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে দায়িত্ববান করে তুলতে না পারে, তাহলে জনসাধারণকে কীভাবে করবে? তাহলে ঢাকঢোল পিটিয়ে ১১ দফা কেন জারি করা হলো? এ ধরনের কাগুজে বিধিনিষেধ জারি করে কোনো লাভ হবে না।