দক্ষিণের মোকামগুলোতে হঠাৎ বেড়েছে ইলিশের আমদানি। বরিশাল নগরীর পথে-ঘাটে, অলিগলিতে হাঁকডাক দিয়ে ইলিশ বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা। দামও কমেছে প্রতি কেজিতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। গত এক সপ্তাহ ধরে ইলিশ বাজারে এ রমরমা অবস্থা। তবে এ খবর মোটেও স্বস্তির নয়।

গভীর সাগর ও দক্ষিণের নদনদীতে জেলেরা জাল ফেললেই ধরা পড়ছে ইলিশ। তবে আশঙ্কার খবর হচ্ছে, একটি মাঝারি বা বড় আকারের ইলিশ পাওয়া গেলে তার সঙ্গে ধরা পড়ছে আহরণ নিষিদ্ধ অনেক জাটকা (১০ ইঞ্চির কম আকারের ইলিশ)। জাটকা প্রকাশ্যে কেনাবেচা হচ্ছে মোকাম ও হাটবাজারে। অথচ ধরা না হলে এই জাটকা আগামী মৌসুম জুলাই-সেপ্টেম্বরে পরিণত হতো ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের পরিপূর্ণ ইলিশে।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত আশ্বিনের প্রজনন মৌসুমে রেকর্ড ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ মা ইলিশ ডিম ছেড়েছে। ফলে এবার জাটকা উৎপাদনও রেকর্ড পরিমাণ। সেগুলো নিষিদ্ধ জাল দিয়ে ধরছে জেলেরা।

উপকূলের একাধিক জেলে সংগঠক জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহ ধরে এক-একটি জেলে নৌকা এক দিনে ২০ থেকে ২৫ মণ ইলিশ ধরছে; যার দুই-তৃতীয়াংশই জাটকা। এভাবে জাটকা ধরা পড়ায় জেলেদের সাময়িক সন্তুষ্টি হলেও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ইলিশ সম্পদ বৃদ্ধি। জেলে সংগঠকদের মতে, এর বিরূপ প্রভাব দেখা দেবে ইলিশ মৌসুম আগামী জুলাই-সেপ্টেম্বরে।

বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস জানান, বছর চারেক আগে শীত মৌসুমে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) প্রচুর পরিমাণ ইলিশ পাওয়া শুরু হয়। পরপর দুই বছর এ অবস্থা চলায় মৎস্য অধিদপ্তর ধরে নিয়েছিল শীতে ইলিশের আরেকটি নতুন মৌসুম পাওয়া গেছে। কিন্তু গত দুই বছর শীতে ইলিশ পাওয়া যায়নি। চলতি জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে গভীর সাগরে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ ইলিশ পাচ্ছেন জেলেরা। গত এক সপ্তাহ ধরে অভ্যন্তরীণ নদনদীতেও একই অবস্থা।

ড. বিমল চন্দ্র স্বীকার করেন, গত কয়েক দিন ধরে ধরা পড়া মাছের বেশিরভাগই জাটকা। নিষিদ্ধ জাল দিয়ে জাটকা নিধন করা হচ্ছে। অভিযান চালিয়েও জাটকা নিধন ও বেচাকেনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
মেঘনা তীরের জনপদ হিজলা উপজেলার ধুলখোলা ইউনিয়ন জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মনির মাতুব্বর বলেন, গত ভরা মৌসুমেও মেঘনায় ইলিশ পাওয়া যায়নি। এখন জাল ফেললেই বোঝাই করে মাছ উঠছে। একটি নৌকা একবেলা জাল ফেলেই ২০ থেকে ২৫ মণ ইলিশ পাচ্ছে।

মনির মাতুব্বর বলেন, ১২ পিসে এক কেজি হয় এমন আকারের ইলিশও বেশি পাচ্ছেন জেলেরা। বড় ইলিশ বলতে তিনটিতে এক কেজি ওজন হয়, এমন আকারের মাছ পাওয়া যাচ্ছে। হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের ইলিশঘাট মালিকরা প্রতিদিন শত শত মণ জাটকা পাইকারি বিক্রির জন্য ট্রলারে করে শরীয়তপুরে মিয়ারহাটে পাঠাচ্ছেন। সেগুলো সেখান থেকে সড়কপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়।

একই কথা জানান পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি ধলা মাঝি। তিনি বলেন, ওই এলাকার নদী রামনাবাদ, বুড়াগৌরাঙ্গ ও তেঁতুলিয়া মোহনায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। তবে আহরিত ইলিশের দুই-তৃতীয়াংশই জাটকা। তিনি বলেন, গলাচিপার পানপট্টি লঞ্চঘাটসহ কমপক্ষে ১০টি পয়েন্টে প্রতিদিন সকালে ইলিশের সঙ্গে শত শত মণ জাটকা বিক্রি হয়। পাইকাররা সেগুলো কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর মোকামে নেওয়ার পর সড়কপথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়।

সাগরতীরবর্তী রাঙ্গাবালী উপজেলার জাতীয় ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, এবার সাগরেও প্রচুর পরিমাণ জাটকা ধরা পড়ছে। ট্রলিং জাহাজ দিয়ে সাগরের জাটকা ধরা হচ্ছে।

বরিশাল নগরীর প্রধান মোকাম পোর্ট রোডের আড়তদার ইয়ারউদ্দিন ও মিজান জানান, নদীতে বেশি ধরা পড়ায় মোকামে মাছের আমদানি বেড়েছে। গত কয়েকদিন ধরে প্রতিদিন ৫০০ মনের বেশি জাটকা ও ইলিশ আসছে। এক সপ্তাহ আগেও এর পরিমাণ ২০০ মণের বেশি ছিল না।

প্রজনন নিরাপদ করার জন্য প্রতি বছর আশ্বিনের পূর্ণিমার আগে ও পরে মোট ২২ দিন নদী-সাগরে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। এবার নিষেধাজ্ঞা ছিল গত ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর। নিষেধাজ্ঞা শেষে পর্যবেক্ষণের পর চাঁদপুর ইলিশ গবেষণা কেন্দ্র গত ৪ নভেম্বর জানায়, ২২ দিনে ইলিশের প্রধান অভয়াশ্রম পদ্মা-মেঘনায় ৫১ দশমিক ৭ ভাগ মা ইলিশ ডিম ছেড়েছে।

চাঁদপুর ইলিশ গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান জানান, ডিমের ১০ ভাগ টিকে থাকলে ৪০ হাজার কোটি জাটকা জন্মাবে। সেগুলো নিরাপদে বড় হতে পারলে বছর শেষে ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে পৌনে ছয় লাখ টন।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার বলেন, এবার নদনদীতে যে জাটকা, তা গত পাঁচ বছরেও দেখা যায়নি। এগুলো রক্ষা করতে পারলে ইলিশের ব্যাপক উৎপাদন হবে। তবে বরিশাল বিভাগে জেলে সাড়ে তিন লাখ। মৎস্য অধিদপ্তরের জনবল আছে মাত্র ১৭০ জন। তাদের পক্ষে সাড়ে তিন লাখ জেলেকে পাহারা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তারপরও জাটকা রক্ষায় সাধ্যমতো চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা।