পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বিদ্যুতের বর্তমান পাইকারি দাম ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ১৭ পয়সা। একে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫৮ পয়সা করার প্রস্তাব করেছে পিডিবি। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কমিশনের টেকনিক্যাল কমিটি ভর্তুকি ছাড়া এক ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৮ টাকা ১৬ পয়সা করার পক্ষে মতামত দিয়েছে।

শুনানিতে অংশ নিয়ে দাম বৃদ্ধির বিরোধিতা করেছেন ভোক্তা প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, বিভিন্ন খাতে অপচয় বন্ধ করলে ৪০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পুষিয়ে তিন হাজার কোটি টাকা লাভে থাকবে পিডিবি। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ালে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে যাবে। শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।

বুধবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর রাজধানীর বিয়াম অডিটোরিয়ামে গণশুনানি শুরু হয়েছে। গণশুনানি গ্রহণ করছে বিইআরসি। আগামী সপ্তাহে বিদ্যুতের খুচরা মূল্যের ওপর গণশুনানি অনুষ্ঠিত হতে পারে।

পিডিবি দাম বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা বর্তমান উৎপাদন খরচ বিবেচনায়। এরপর গ্যাসের দাম ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে বিদ্যুতের দাম ৯ টাকা ১৪ পয়সা এবং গ্যাসের দাম ১২৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুতের দাম ৯ টাকা ২৭ পয়সা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবে পিডিবি বলেছে, চাহিদা মতো গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে।

এতে খরচ বেড়ে গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় জ্বালানি খরচ ছিল ২ টাকা ১৩ পয়সা, ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ টাকা ১৬ পয়সা। এখন জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, কয়লার মূসক বৃদ্ধির কারণে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি খরচ আরও বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৪ দশমিক ২৪ টাকা। এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ রয়েছে। তাই পাইকারি পর্যায়ে দাম না বাড়লে ২০২২ সালে ৩০ হাজার ২৫১ কোটি ৮০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হবে পিডিবিকে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন সদস্য মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী, বজলুর রহমান, মোহাম্মদ আবু ফারুক ও মো. কামরুজ্জান।

কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, প্রশ্ন উঠতে পারে যে, গ্যাসের দামের গণশুনানির ঘোষণা না দিয়ে কেন আমরা বিদ্যুতের দামের শুনানি নিচ্ছি? আপনারা জানেন- গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারের পলিসির বিষয় থাকে, সেটি দালিলিকভাবে প্রমাণের বিষয় থাকে। সেটার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। শেষ হলে গ্যাসের দামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। কমিশন তার আইনি প্রক্রিয়াগত কারণে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি করছে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের পক্ষে অধ্যাপক শামসুল আলম শুনানিতে অংশ নিয়ে বলেন, কয়েকটি পদক্ষেপ নিলে বিদ্যুতের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি সমন্বয় করার পর উদ্বৃত্ত থাকবে। এগুলো হলো- নতুনভাবে ৬ শতাংশ ট্যাপ আরোপ না করা, জ্বালানি তেলে শুল্ক্ক কর অব্যাহতি সুবিধা পুনর্বহাল করা, কয়লার ওপর ৫ শতাংশ নতুনভাবে আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করা এবং ব্যক্তি খাতের পরিবর্তে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত তেল বিপিসির মাধ্যমে আমদানি করে মোট ৮ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা ঘাটতি কমানো সম্ভব।

একই সঙ্গে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার এবং কুইক রেন্টালের ক্রয় করা অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় না করলে ঘাটতি ১৪ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা কমবে। পাশাপাশি পিডিবির কম্বাইন্ড সাইকেল প্লান্টগুলো ৫৩ শতাংশের পরিবর্তে ৬৭ শতাংশ পাওয়ার ফ্যাক্টরে উৎপাদন করে ঘাটতি ১৫ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা কমানো যাবে। ১৩২ কেভি থেকে ওপরের ভোল্টেজলেভেলের ভোক্তাদের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দামে ভর্তুকি না দিলে এবং বিতরণ ইউটিলিটি ভেদে তা অভিন্ন করলে ঘাটতি ১ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা কমবে।

এফবিসিসিআইর পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, যা এ অর্থনীতির ওপর পড়বে। কোভিড ও ইউক্রেন-রাশিয়া পরিস্থিতির মধ্যে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা কোনোভাবেই ঠিক হবে না। কারণ একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ১০-২০ শতাংশ লাভ করে।

বিইআরসি সর্বশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যুতের পাইকারি দর ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ১৭ পয়সা নির্ধারণ করে। বিদ্যুতের একক ক্রেতা পিডিবি। নিজেরা উৎপাদনের পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানি ও বেসরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনছে তারা। পাইকারি দরে বিক্রি করে আসছে পাঁচটি বিতরণ কোম্পানির কাছে।