বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী মৌলবাদী শক্তির উপস্থিতি ‘তীব্রতর’ হয়ে উঠায় সমাজে বিদ্বেষেরবীজ ছড়িয়ে যাচ্ছে। সামনে অপেক্ষা করছে ভয়াবহ সংঘাতময় সময়। 

শহীদজননী জাহানারা ইমামের ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে নির্মূল কমিটির জাহানারা ইমাম স্মারক বক্তৃতায় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ এই মন্তব্য করেন।

শহীদজননীর ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রোববার বিকেলে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে স্মারক বক্তৃতা, আলোচনা সভা এবং জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সভাপতি, নাট্য নির্দেশক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফের বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান এবং আমাদের দায়’। 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির।

জাহানারা ইমাম স্মারক বক্তৃতায় বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘বর্তমানের সামাজিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ কি আমাদের এ ইঙ্গিত দেয় না যে, বাংলাদেশে এই মানবতা বিরোধী মৌলবাদী শক্তির তীব্র উপস্থিতি? ঐতিহ্যবাহী বাঙালি ও আদিবাসী সংস্কৃতির চ্যালেঞ্জ করে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে হিংসা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচার করে সমাজে হিংসা ও ভিন্নধর্মের প্রতি অসহিষ্ণুতা ছড়িয়ে দিচ্ছে।‘

তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দেশের আনাচেকানাচে বিদ্বেষের বীজ ছড়িয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন নাসির উদ্দীন।

তিনি বলেন, ‘সমাজ বিভক্ত হচ্ছে। রাষ্ট্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শক্তির হাতে কিন্তু সমাজ ক্রমশ আমাদের হাত থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। সম্মুখে এক ভয়াবহ সংঘাতময় সময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।’

নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বলেন, ২০০৮ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে মৌলবাদীরা কৌশল বদলে মসজিদ ও মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে তাদের তৎপরতা চালাতে থাকে।

তিনি বলেন, ‘২০০৮ এর নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিজয় হলে মৌলবাদীরা পিছু হটে। কৌশলও বদলে ফেলে। মসজিদ ও মাদ্রাসাকে লক্ষ্য করে তাদের তৎপরতা চালাতে থাকে। কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকাতে তাদের মাধ্যমে অর্থাৎ মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রক হেফাজতে ইসলামের মাধ্যমে তারা এক নতুন কৌশল অবলম্বন করে।’

২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে উত্তাল সেই প্রেক্ষাপটে আবির্ভাব হয় হেফাজতে ইসলামের। 

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধী, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও ২১ আগষ্টের হত্যাকারীদের রক্ষার জন্য ও ইসলামী শাসন কায়েমের লক্ষে বিএনপি ও অন্যান্য ইসলামী সংগঠনের সহায়তায় শাপলা চত্বরে একটি মৌলবাদী সমাবেশ করে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটাতে চেয়েছিল। কিন্তু সরকার ও নতুন প্রজন্মের সামাজিক শক্তির প্রতিরোধে তা নস্যাৎ হয়ে যায়। কিন্তু সমাজের অভ্যন্তরে পুষ্ট হতে থাকা জঙ্গিবাদ হলি আর্টিজানের মত নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে জানান দেয় তাদের ভয়াবহ অস্তিত্ব।’

হেফাজতের ইসলামীর দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকলেও সরকার তাদের ‘বশে আনার’ যে কৌশল নেয় তার সমালোচনাও করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি। 

নাসির উদ্দীন বলেন, ‘আমরা প্রত্যক্ষ করি, একটি ভারসাম্য রক্ষার নিমিত্তে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার হেফাজতে ইসলামকে দমন না করে বশে আনার কৌশল নেয়! বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনে নিযুক্ত হওয়া স্বাধীনতা বিরোধীরা এই কৌশল সরকারের কাছে প্রস্তাব করেছে বলে আমাদের ধারণা। কিন্তু এ কৌশল সাময়িক সাফল্য অর্জনে সমর্থ হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা ফলপ্রসূ হবে না। কেন না, হেফাজতে ইসলাম মনে করে ১৯৭১-এ তারা পরাজিত হয়েছিল। সাধের পাকিস্তান কার্যত ধ্বংস হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের জন্য। আর বাংলাদেশের তথাকথিত সকল মৌলবাদী সংগঠনের লক্ষ হচ্ছে মৌলবাদী ইসলামী রাষ্ট্র। যা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের পরিপন্থী ‘ 

সাংবিধানিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এর জন্য দরকার শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন। রাষ্ট্রকে এ নিশ্চয়তা দিতে হবে যে শিক্ষা কার্যক্রম একমুখি ও বিজ্ঞানভিত্তিক হবে। কোনো ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব নয় সকল ধর্মের মানবিক শিক্ষাই উত্তম। রাষ্ট্রের সকল স্তরে সকল ধর্ম বর্ণের মানুষের যুক্ত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত হবে। নারী পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করে পরিবার সমাজে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। দরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘এ দেশটি তার হাজার বছরের লালিত সংস্কৃতির আলোকে বিকশিত হয়েছে। দেশভাগ, ধর্মীয় দাঙ্গা, রাজনৈতিক সহিংসতা সকল কিছুকে অতিক্রম করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি অসা¤প্রদায়িক, সমতা ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে বিকাশমান। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ আজ প্রভূত উন্নয়নের মুখে। এই উন্নয়ন তখনই শতভাগ সফল হবে যখন দেশটি সকল ধর্ম, বর্ণ, জাতিসত্তার মানুষের হবে।’

এ অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউটের সভাপতি নাট্যজন বীর মুক্তিযোদ্ধা রামেন্দু মজুমদার, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহ-সভাপতি শিক্ষাবিদ শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, ১৯৭১: গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট-এর সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটর সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, সঙ্গীতশিল্পী ফরিদা পারভীন এবং বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি যাত্রাভিনেতা, পালাকার ও নির্দেশক মিলন কান্তি দে।

শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় রয়েছে, যা আরম্ভ হয়েছে ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর থেকে। সমাজ ও রাজনীতিতে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে জামায়াত-বিএনপি-হেফাজত। সরকার ও প্রশাসন এ বিষয়ে শুধু নির্বিকার নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্রয়ও দিচ্ছে।’

মৌলবাদের আস্ফালনে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, ‘কখনও ওয়াজের নামে, কখনও নামাজের খোৎবার নামে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেভাবে ’৭১-এর পরাজিত শক্তি ভিন্নধর্ম, ভিন্নমত ও ভিন্ন জীবনধারায় বিশ্বাসী মানুষের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও সন্ত্রাসের ভাইরাস ছড়াচ্ছে একে প্রতিহত করতে না পারলে বাংলাদেশ অন্তিমে মোল্লা উমরের তালেবানি আফগানিস্তানে পরিণত হবে।’

সম্প্রতি মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তদের হাতে পুলিশের উপস্থিতিতে নড়াইলে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের লাঞ্ছনার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান বক্তারা।

ইতিহাসের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘একজন শিক্ষকের এই অপমান বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের জন্য চরম অপমান এবং গোটা জাতির জন্যও অপমান। যে পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এবং প্রশ্রয়ে এই চরম ন্যাক্কারজন ঘটনা ঘটেছে, সেসব ব্যক্তিকে জবাবদিহিতা ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার জঙ্গি মৌলবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার ঘোষণা দিয়েছেন। স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে আমাদের রাস্তায় নামতে হবে।’

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রতি বছরের মতো এ বছরও বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনকে ‘জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক’ প্রদান করা হয়। 

এ বছর ব্যক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঢাকার চিফ প্রসিকিউটর ভাষা সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু ও ফরিদা পারভীন ফাউন্ডেশনের সভাপতি লালনগীতি সম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীনকে এবং সংগঠন হিসেবে ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’-কে জাহানারা ইমাম স্মৃতিপদক প্রদান করা হয়। গোলাম আরিফ টিপুর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন তার মেয়ে ডানা নাজলী।

এর আগে রোববার সকাল ৮টায় মিরপুরে শহীদজননী জাহানারা ইমামের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সদস্যরা।