ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের চার মেয়রকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মেয়রদের মর্যাদা নির্ধারণ করে গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি দিয়ে সংশ্নিষ্ট মেয়রদের নামের পাশে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মর্যাদা দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে গেজেট প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। তবে এ-সংক্রান্ত চিঠি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এক সপ্তাহ আগে চিঠি দেওয়া হলেও গতকাল এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। সাধারণত প্রধানমন্ত্রী কোনো বিষয়ে অভিপ্রায় ব্যক্ত করলে যত দ্রুত সম্ভব, সেটা বাস্তবায়ন হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (নির্বাহী সেল) আল-মামুন মুর্শেদ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, মেয়রদের মর্যাদা নির্ধারণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী 'অনুমোদন' প্রদান করেছেন। চিঠি ইস্যু করার পরদিন প্রযুক্তি যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকের কাছে সেটা পৌঁছে যায়। এ বিষয়ে সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তার মতামত জানতে চাইলে এ ধরনের চিঠির যৌক্তিকতা নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী 'অভিপ্রায়' ব্যক্ত করেন আর রাষ্ট্রপতি 'অনুমোদন' দেন। চিঠিতে যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা সাংবিধানিক গণতন্ত্রের রীতির সঙ্গে যায় না।

সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দান করবেন।

এ-সংক্রান্ত কাজ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী মর্যাদায় কাউকে নিয়োগ দিতে চাইলে সরকারপ্রধান অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তৈরি প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

জানতে চাইলে সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান বদিউর রহমান সমকালকে বলেন, মেয়ররা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সে মন্ত্রণালয় থেকে যদি প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব যায়, তাহলে সেই প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়টি আসতে পারে। আর যদি সে রকম কিছু না হয়, তাহলে কাউকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা সমপর্যায়ের সম্মান দেওয়ার বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাজ। এভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি দেওয়ার কথা নয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্‌ উদ্দিন চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, মন্ত্রী মর্যাদার বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এখতিয়ার। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব কোথাও পাঠানো হয়নি।

এ বিষয়ে সাবেক একাধিক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই বলেছেন, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা তাঁদের মর্যাদার কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, তা সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ের বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ীই রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দেন। এটাই সাংবিধানিক রীতি। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়কে ব্যতিক্রম করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে সংবিধান দেয়নি। কিন্তু রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব যাওয়ার আগেই সেটা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর 'অনুমোদন' বলা যায় না। এতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বকে খাটো করা হয়।

সাবেক একজন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, এ বিষয়গুলো বোঝার মতো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কেউ আছে কিনা, আমার জানা নেই। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া চিঠিতে এ ধরনের শব্দ ব্যবহার কীভাবে হলো, খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এটা সুচিন্তিতভাবে লেখা হয়েছে, নাকি সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তার অজ্ঞতার কারণে হয়েছে- সেটা বের হওয়া প্রয়োজন।

সাবেক একজন সচিব নিজে যুগ্ম সচিব (বিধি অনু বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ) থাকাকালের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, সাধারণত এসব বিষয়ে সরকারপ্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে একান্তভাবে নির্দেশ দেন। তাঁদের সময়ে এমন ঘটনার কথা চিন্তাও করা যেত না। এমন হলেও সেটা তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিবরা গ্রহণ করতেন না।