বিদেশি ঋণচুক্তি, প্রকল্প বাস্তবায়ন বা নীতিনির্ধারণ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সচিবদের আরও সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গতকাল সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে 'শুদ্ধাচার কৌশল' বিষয়ক এক কর্মশালায় এমন বার্তা দেওয়া হয়।

কর্মশালায় প্রধান অতিথি মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, যাঁরা যে কাজের জন্য স্বাক্ষর করবেন, দায় তাঁদের ওপরেই বর্তাবে। তাই আইনবিধি না বুঝে কোনো কাজ করবেন না। এতে দেশের ক্ষতি হয়।

কর্মশালায় সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগসহ বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ সংস্থায় কর্মরত সচিব মর্যাদার ৭৮ জনসহ ৯৮ জন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে ডাকা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ জন সচিব উপস্থিত ছিলেন। সকাল ১০টার দিকে শুরু হওয়া বৈঠকটি শেষ হয় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে।

বৈঠক সূত্র জানায়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। ঋণ বা অনুদান যে ধরনের প্রকল্পই হোক, সেটি দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে হবে। অনেকে আছেন বড় অফিসার, কিন্তু বিদেশি চুক্তি-টুক্তি করার আগে সেটা পড়েও দেখেন না। এমনটা চলবে না। চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা আছে উল্লেখ করে প্রশাসনের শীর্ষতম এ কর্মকর্তা আরও বলেন, যে ধরনের প্রকল্পই হোক, সেখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব-সংক্রান্ত কোনো বিষয় যাতে না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। যে দেশের ঋণ সে দেশেরই পরামর্শক, আবার সেই দেশ থেকেই কেনাকাটা- এগুলো স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের প্রতিটি টাকা সাধারণ মানুষের পকেট থেকে আসে। এর সদ্ব্যবহার করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।

শুধু বিদেশি নয়, দেশি অনেক প্রতিষ্ঠানের কাজেও নিয়ম মানা হচ্ছে না। উদাহরণ দিয়ে আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, দেখা যায় এক দপ্তরের কাজ অন্য দপ্তর দিয়ে করানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু দপ্তর সরকারের পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) মেনে কাজ করছে। আবার কেউ কেউ সেটা মানছে না! এটা হবে না। এই দেশের যে দপ্তর-সংস্থাই হোক, আইন মেনে তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। যাঁরা এ নিয়ম বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, দায় কিন্তু তাঁদেরই থাকবে। এ ছাড়া কর্মশালায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রকল্প প্রণয়ন, প্রকল্প বাছাই ও বাস্তবায়নে দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দেওয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকজন সচিব বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মতামত দেন। বৈঠক সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব সাইফুল হাসান বাদল ভালো কর্মকর্তারা কেন প্রকল্প পরিচালক হতে চান না তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রকল্প পরিচালকরা প্রকল্পের বরাতে ভালো গাড়ি পেলে নিজেদের গাড়ির জন্য ৫০ হাজার টাকার বদলে ২৫ হাজার টাকা পান। অন্যদিকে প্রকল্পের ভালো গাড়ি মন্ত্রণালয় থেকে চাপ দিয়ে নিয়ে নেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখা থেকে বিভিন্ন খাতের খরচ বহনের সুপারিশ আসে। অর্থ বিভাগ ঠিকভাবে টাকা ছাড় করে না। আবার কোনো কোনো কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালক হওয়াকে ডাম্পিং পোস্টিং মনে করেন। প্রকল্পে কাজ করলে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের সংস্পর্শে থাকা যায় না। ফলে পদোন্নতির সময় সমস্যা হয়। আবার অনেকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় পিডি হতে চান না। কেউ কেউ প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয়ে অডিট আপত্তি ওঠার কারণেও প্রকল্পের পরিচালক হতে চান না।

এসব বিষয়ে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার বিষয়ে জোর দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি বলেন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জন্য টেকনিক্যাল ব্যক্তি হতে হয় না। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যম প্রকল্প ব্যবস্থাপনার জন্য উপযুক্ত প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করা সম্ভব।

জানা যায়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কবির বিন আনোয়ার চলমান প্রকল্পের অগ্রাধিকার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি তোলেন। সম্প্রতি কৃচ্ছ্র সাধনের অংশ হিসেবে প্রকল্পের এ, বি ও সি গ্রেড করার বিষয়ে বলেন, মন্ত্রণালয়ের কোন প্রকল্প কোন পর্যায়ে আছে সেটা সেই মন্ত্রণালয় ভালো জানে। দেখা গেছে কম গুরুত্বের হলেও একটি প্রকল্পের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ হয়ে আছে। এখন এই পর্যায়ে এসে সেটি বন্ধ রাখা ভালো যুক্তি নয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সচিব সমকালকে বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে এনআইএস (শুদ্ধাচার কৌশলপত্র) খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। ২০১২ সালে প্রণীত এ দলিলটি প্রণয়ন হলে বাস্তবে এর প্রয়োগ প্রশাসনে দৃশ্যমান হয়নি। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম দায়িত্বে আসার পর থেকে এনআইএস বাস্তবায়নে প্রায় প্রত্যেক বৈঠকে জোর দিয়ে কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে এর অগ্রগতি সামান্যই।

কোনো কোনো সচিবের পক্ষ থেকে শুধু প্রশাসন ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে এনআইএস বাস্তবায়ন সফল হবে না বলে মত তুলে ধরা হয়। তাঁরা বলেন, শুদ্ধাচার কৌশল একটি সামগ্রিক পদক্ষেপ। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এর বাইরে ব্যবসায়ী, এনজিওসহ বেসরকারি খাতেও শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। শুধু একপক্ষীয় বাস্তবায়নে এটা সফল হবে না।