বিতর্কিত গণভোটের পর ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল রাশিয়ার অঙ্গীভূত করার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলে মনে করছেন ভূরাজনীতি বিশ্নেষকরা। তাঁরা বলছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন এ পদক্ষেপের মাধ্যমে আবারও ইউরোপের মানচিত্র পাল্টে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার দখল করা এ অঞ্চল উদ্ধারের জন্য ইউক্রেন হামলা চালালে তাকে আগ্রাসন হিসেবে দেখবে মস্কো। এ ক্ষেত্রে পরমাণু হামলাসহ যে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেবে রাশিয়া।
বিশ্নেষকদের মত, এর মাধ্যমে পুতিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউক্রেনের মিত্রদের এই বার্তা দিতে চেয়েছেন- তারা যেন কিয়েভকে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র না দেয়। তবে রাশিয়ার এ হুমকিকে পাত্তা দিচ্ছে না ওয়াশিংটন ও তার মিত্ররা। তারা ইউক্রেনকে আরও বেশি সহায়তা দিতে প্রস্তুত। ফলে যুদ্ধ প্রলম্বিত হতে পারে।
রাশিয়া নতুন করে যে চারটি অঞ্চল

দখল করেছে তা ইউক্রেনের মোট ভূখণ্ডের ১৫ শতাংশ। যা হাঙ্গেরি রাষ্ট্রের সমান। এর আগে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়াও এভাবে দখল করে নেয় রাশিয়া।
বিশ্নেষকরা বলছেন, পুতিনের এ দখল একটি বিশেষ দিক থেকে নজিরবিহীন ঘটনা। তার বাহিনী যখন ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকা থেকে পিছু হটছে, তখনই তিনি আবার কিছু অঞ্চল দখল করেও নিলেন। সাত মাসের আগ্রাসনে তাঁর বাহিনী এখন পর্যুদস্ত। নিজ দেশের জনমতও এখন দ্রুতই যুদ্ধের বিপক্ষে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি রাশিয়ার জাতীয়তাবাদীদের মন জয়ের একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন চার অঞ্চলকে যুক্ত করার ঘটনাকে।
ইউক্রেনঅ্যালার্টের সম্পাদক পেটার ডিকিনসন আটলান্টিক কাউন্সিলকে বলেন, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভে রাশিয়ার পরাজয়ের মোড় ঘোরাতেই পুতিন এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছেন।

ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জন হার্বস্ট বলেছেন, কিয়েভ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যেসব অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র চাচ্ছে তা যেন ওয়াশিংটন সরবরাহ না করে, তা নিশ্চিত করতে চান পুতিন। কারণ ইউক্রেনের পাল্টা সফল হামলায় রুশ সেনারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় ইউক্রেন ট্যাঙ্ক, জঙ্গিবিমান ও দূরপাল্লার গোলাবারুদের মতো আরও উন্নত সমরাস্ত্র পেলে তা রাশিয়ার জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হতে পারে।

রাশিয়ার দখল করা অঞ্চলে ইউক্রেন হামলা চালালে তাকে রুশ ভূখণ্ডে আগ্রাসন হিসেবে প্রচার করে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়ে রেখেছেন পুতিন।
তবে পুতিনের এ সিদ্ধান্তের উল্টো ফল হতে পারে। চার অঞ্চল দখল করার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সহায়তা আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। একই পদক্ষেপ নিয়েছে জি সেভেন। ইউক্রেনও সামরিক সহায়তা লাভের জন্য ন্যাটোর সদস্যপদ লাভের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তবে তুরস্কের মতো দেশের কারণে সেটা রাতারাতি সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্নেষকরা।

পুতিন শুক্রবার দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়া দখলের ঘোষণা দিলেও এসব অঞ্চলের বহু অংশ এখনও ইউক্রেনের দখলে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের এত ভূখণ্ড আর কখনও বেদখল হয়নি।

এ দখলের ঘোষণার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পাশাপাশি ইউক্রেনের জন্য আরও ১২৩০ কোটি ডলার সহায়তার অনুমোদন দিয়েছে। ইউক্রেনের সেনাদের প্রশিক্ষণের প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছে বাইডেন প্রশাসন। গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ১৬০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে ইউক্রেনকে। যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব হচ্ছে ইউক্রেনকে দীর্ঘমেয়াদে লড়তে সহায়তা করা। পুতিনের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত পিছু হটার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল। সূত্র : বিবিসি, আটলান্টিক কাউন্সিল ও দ্য হিল।