বাংলাদেশে দূষণের মাত্রা প্রতি বছর ভয়াবহ মাত্রায় বাড়ছে। এর পেছনের কারণ হিসেবে অতি মাত্রায় প্লাস্টিকের ব্যবহার, ইটভাটার দৌরাত্ম্য, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতিকে প্রধান হিসেবে দায়ী করেছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলেন, এর ফলে প্রতি বছর মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে দেশের। এই অবস্থার নিরসনে সমন্বিত বহুমাত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

সোমবার রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক ইন সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত 'সিপিডি-গ্রিন সিটিস ইনিসিয়েটিভ' শীর্ষক কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আলোচনা সভায় বক্তারা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন। আলোচ্য বিষয় ছিল, 'গ্রিনিং সিটিস থ্রু রিডিউসিং এয়ার এন্ড প্লাস্টিক পলুশন'।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ ফেলো সৈয়দ ইউসুফ সাদাত। তিনি বলেন, পলিথিন-প্লাস্টিকের কারণে দেশের নদীগুলো মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর দূষণের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের দায় ৩৯ শতাংশ। রূপসা নদীর ক্ষেত্রে এ হার ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য নদী দূষণের ক্ষেত্রেও প্লাস্টিক দায়ী।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, রাজধানীতে প্রতি বছর ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়। ৩৭ শতাংশ পুনঃ ব্যবহার করা হয়। ১২ শতাংশের গন্তব্য নদীতে। অন্যান্য স্থানে পড়ে থাকে বাকি ৩ শতাংশ।
প্রতি বছর মানুষের মধ্যে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে উল্লেখ করে বলা হয়, ২০০৫ সালে দেশে মাথাপিছু মানুষ প্রতি বছর ৯ দশমিক ২ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করত। ২০১৪ সালে তা বেড়ে ১৭ দশমিক ২ কেজি হয়। ২০২০ সালে ২২ দশমিক ৩ কেজিতে দাঁড়ায়। আর দেশের বায়ুর মান কখনোই স্বাস্থ্যসম্মত থাকে না। জুলাই-আগস্ট মাসে কিছু দিনের জন্য বাতাসের মান থাকে চলনসই। এছাড়া বছরের বাকি পুরোটা সময়ে কখনো অস্বাস্থ্যকর বা কখনো খুবই অস্বাস্থ্যকর থাকে। বায়ু দূষণের কারণে দেশবাসীর যে স্বাস্থ্যহানি ঘটে তার জন্য প্রত্যেককে প্রতি বছর ৮ হাজার ৩৩৪ টাকা খরচ করতে হয়। বায়ু দূষণের কারণে প্রতি বছর ঢাকা মহানগরীতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর মোট ক্ষতির পরিমাণ ৬ দশমিক ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, জলাশয় দূষণের মাত্রা এমন পর্যায়ে গেছে গুলশান-বনানী লেকে এখন মাছের চাষ হয় না। মশার চাষ হচ্ছে। বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য লেক-খাল-ড্রেনে দিয়ে রাখা হয়েছে। ভবনমালিকরা ১০ লাখ টাকা দিয়ে জেনারেটর বসাতে পারে। কিন্তু ৫ লাখ টাকা খরচ করে একটি সেপটিক ট্যাঙ্ক বসাতে পারেন না। ইটের ভাটার কারণে বায়ু দূষণ বাড়ছে। বায়ু দূষণের জন্য ইটের ভাটা ৫৬ শতাংশ দায়ী। রাস্তার ময়লা ১৮ শতাংশ। এবং পরিবহন দায়ী ১০ শতাংশ। ইট বাদ দিয়ে ব্লক ব্যবহারের জন্য চাপ দিতে হবে। স্কুলবাস চালু করলে দূষণ কমবে। অভিভাবকরা সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে স্কুলবাসে পাঠাতে চায় না। আমরা তাদেরকে প্রযুক্তি দিয়ে সমাধান দিতে চেষ্টা করছি। বাসে সিসি ক্যামেরা থাকবে। জিপিএস থাকবে। যানজট নিরসনের জন্য স্কুলবাসের কোনো বিকল্প নেই।
আতিকুল ইসলাম আরো বলেন, 'টাকাওয়ালারা বিয়ে-বউভাতে বড় বড় কার্ড ছাপায়, যেখানে প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। দয়া করে এটা বন্ধ করুন। দাওয়াতের কার্ডে টাকার গরম দেখাবেন না।'
দুঃস্থ সহায়তা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক দিবালোক সিংহ বলেন, তাদের সংস্থার উদ্যোগে পরিবেশ থেকে প্লাস্টিক অপসারণের কাজ করছেন। চট্টগ্রাম, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে এ কাজ করছেন। কিন্তু মেডিকেল বর্জ্যে প্লাস্টিকের প্রচুর ব্যবহার হয়। এটা পৃথকভাবে সংগ্রহের উদ্যোগ নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে সিটি করপোরেশনের বাজেট থাকে ৮ শতাংশ। এটা ৩০ শতাংশ হওয়া উচিত।
ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কমকর্তা জাভেদ আকতার বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের পথে আছে। এর ফলে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়বে। সাথে সাথে পরিবেশ দূষণও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটা চ্যালেঞ্জ হলেও মোকাবিলা করা অসম্ভব না। ইউনিলিভারের পণ্যেও প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট মোঃ জসিম উদ্দিন বলেন, ইটের চেয়ে ব্লকের উৎপাদন খরচ বেশি। ব্লক তৈরিতে ব্যবহূত উপাদান তিন মিলিমিটার ব্যাসের পাথর চিপস আমদানিতে শুল্ক্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করলে একটি ব্লকের দাম পড়বে ৭-৮ টাকা। এতে মানুষ ব্লক ব্যবহারে উৎসাহিত হবে।
তিনি আরো বলেন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। সেটা এখন ১ থেকে ২ শতাংশ। বিআরটিএ ইলেকক্ট্রিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেয় না। জাপান, আমেরিকাসহ অনেক দেশে জনপ্রতি বছরে ১০০ কেজির ওপরে প্লাস্টিক ব্যবহার করে। কিন্তু তাদের প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আধুনিক। বাংলাদেশে ২০৩০ সাল নাগাদ জনপ্রতি প্লাস্টিকের ব্যবহার দাঁড়াবে ৪০ কেজি। তাহলে অবস্থা কোন পর্যায়ে দাঁড়াবে। এখনই প্রয়োজন ইউনিয়ন পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া।
সঞ্চালকের বক্তব্যে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ৭৫ শতাংশ গ্রীন হাউস গ্যাস আসে নগর এলাকা থেকে। ঢাকা শহরে প্লাস্টিক ব্যবহারের হার অন্যান্য এলাকার চেয়ে তিনগুন বেশি। প্লাস্টিকের সমস্যাগুলো বহুমাত্রিক। এগুলোকে বহুমাত্রিকভাবেই সমাধান করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য প্রদান করেন বায়ু বিশেষজ্ঞ মাসুদ রানা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত উন্নয়ন সংগঠন গারবেজম্যানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম উদ্দিন শুভ প্রমুখ।