ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

স্থিতিশীলতা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ইস্যুতে গুরুত্ব

স্থিতিশীলতা নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ইস্যুতে গুরুত্ব

তাসনিম মহসিন

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০২২ | ২১:৩৯

আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠককে সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত দুই দেশের কর্মকর্তারা। সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চলছে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি ও সমঝোতার প্রস্তুতি। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আসন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে গুরুত্ব পাবে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ইস্যু। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের আগেই দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বৈঠক করে ফেলেছেন দুই দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। ভারতের দেওয়া ঋণে তাদের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার একটি তালিকাও হস্তান্তর করেছে বাংলাদেশ। কূটনীতিকরা এটিকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করার একটি অংশ হিসেবে দেখছেন। সেই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে পুরো বিশ্বে এক প্রকার মেরূকরণ ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মেরূকরণের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এক প্রকার হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে বৈশ্বিক মেরূকরণ মোকাবিলা করে স্থিতিশীলতা নিয়ে উপ-আঞ্চলিকভাবে একত্রে কাজ করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে।

প্রসঙ্গত, ভারত দক্ষিণ এশিয়ার উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতাকে আরও জোরদার করতে চায় বলে জানিয়েছিলেন গত এপ্রিলে ঢাকা সফরকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর।

পারস্পরিক লাভ না হলে সম্পর্ক দৃঢ় হয় না, সেই সম্পর্কে প্রশ্ন থেকে যায় বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত শমশের মবিন চৌধুরী। সমকালকে তিনি বলেন, কানেক্টিভিটি, বাণিজ্য, মানুষে মানুষে যোগাযোগ, সামরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ঊর্ধ্বগতির যে ধারাবাহিকতা রয়েছে তা আরও বেগবান হবে। এ বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। ভারতের সঙ্গে এবারের বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হতে পারে। এখন দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যে পর্যায়ে রয়েছে, তা এর থেকে বাইরে ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিন একটি কালো দাগ রেখেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এবারের যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক একটি ইতিবাচক দিক। এ ছাড়া সীমান্ত হত্যা আগের থেকে কমে এলেও বহু প্রতিশ্রুতির পরও বন্ধ হয়নি, এটি দুঃখজনক। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে এবারের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে না, মতবিনিময় হয়তো হবে। তাতে বাংলাদেশ আশ্বাস পাবে। দুই দেশের সম্পর্ক পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে- এ ধারাবাহিকতা যাতে বজায় থাকে সেই আশা প্রকাশ করেছেন সাবেক এ কূটনীতিক।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে সমকালকে বলেন, ভারত মূলত চাইবে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে। কারণ বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যেভাবে মেরূকরণ হচ্ছে, এর ফলে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব-স্বার্থ এবং কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যদি শক্তিশালী উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা তৈরি করা যায়, তাহলে ১৫০ কোটি মানুষের বাজারটির যথাযথ ব্যবহারে মনোযোগী হওয়া যাবে। আর আঞ্চলিক আত্মনির্ভরতা বাড়লে কোনো মোড়লের চোখ রাঙানি আমাদের বিচলিত করতে পারবে না।

দুই দেশের নিরাপত্তা ইস্যুতে এবারের বৈঠকে বোঝাপড়া হবে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আনুষ্ঠানিক আলোচনায় নিরাপত্তার অনেক বিষয় না থাকলে দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকে আলোচনা হবে। শ্রীলঙ্কায় চীনের বলয় বিস্তার নিয়ে এক প্রকার অস্বস্তিতে ছিল ভারত। আর বাংলাদেশের সঙ্গে যেভাবে চীনের সম্পর্ক বাড়ছে, তা ভাবিয়ে তুলেছে ভারতকে। ভারত সব সময় চায়, বাংলাদেশ সরকার একটু ভারতমুখী থাকবে। বৈঠকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হবে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে আলোচনা করবে দুই দেশ।

সেই সঙ্গে এ অঞ্চলে বাড়তে থাকা ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী আল কায়দার উপ-আঞ্চলিক শাখার বিস্তার নিয়েও আলোচনা হবে দুই দেশের মধ্যে।

উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলা হলেও এর বাস্তবতা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান। সমকালকে তিনি বলেন, উপ-আঞ্চলিক অর্থনীতি খুবই দুর্বল। এখানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিশাল কোনো লাভ হবে না। নেপালের বাজার খুবই ছোট। আর ভুটানের বাজার নেই বললেই চলে। এখানে কানেক্টিভিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভারতের জন্য। এ কানেক্টিভিটি বাংলাদেশের জন্য তখনই গুরুত্বপূর্ণ হবে, যখন নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে জ্বালানি খাতে যোগাযোগ বাড়বে। পণ্যের বাজারের দিকে থেকে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বাস্তবায়নে দরকার সহযোগিতামূলক মনোভাব।

যে কোনো ধরনের চুক্তি সইয়ের আগে বাংলাদেশকে খুবই ভেবেচিন্তে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এ অধ্যাপক। তিনি বলেন, কারণ বাংলাদেশকে তার সেবা, কৃষি ও উৎপাদন খাতের সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন আছে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে যে চুক্তিটি হতে যাচ্ছে তাতে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বাণিজ্য দ্বিগুণ হবে। বাংলাদেশ কি এ মুহূর্তে ভারতের সেবা ও পণ্য খাতে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে- প্রশ্ন রাখেন তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরকে সামনে রেখে সব বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। একদিকে দুই দেশের বর্তমান সমুদ্রে যে বিরোধ বিদ্যমান রয়েছে, তারও প্রস্তুতি রাখছে বাংলাদেশ। আসন্ন সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) সই করতে পারে দুই দেশ। এ ছাড়া দুই দেশের রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশিক্ষণের জন্য একটি সমঝোতা প্রস্তুত করা হয়েছে। দুই দেশ নদী নিয়ে বেশ কয়েকটি চুক্তি, সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়ে একমত হবে, বিশেষ করে কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন ও ফেনি নদীর পানির ব্যবহার নিয়ে খসড়া প্রায় চূড়ান্ত।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে চূড়ান্ত সময়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। এ বিষয়গুলোর প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হচ্ছে। এখনি চূড়ান্ত করে কিছু বলা যাবে না। সামনে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক আছে, বৈঠকের পরে চূড়ান্তভাবে সফরের বিস্তারিত বলা যাবে।

বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এ সফরটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বর্তমান ও সাবেক কূটনীতিকরা। বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে ভারতের কাছে আবেদন নিয়ে সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের মন্তব্য এক প্রকার অস্বস্তিতে ফেলেছে দুই দেশের কূটনীতিকদের। এই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলাদেশে সব দলের সঙ্গে বন্ধুত্বের প্রত্যাশার বার্তা দিয়েছেন।

ভারতীয় গণমাধ্যম অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আগামী নির্বাচনে ভারতের প্রভাব প্রত্যাশা করছে। আর বাংলাদেশ যাতে চীনের দিকে ঝুঁকে না পড়ে, সেই দিক থেকে বিষয়টি ভারতের জন্যও জরুরি বলে জানানো হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ভারতের প্রাধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে দিল্লি পৌঁছবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পর সন্ধ্যায় দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর উপলক্ষে তাঁর সম্মানে একটি নৈশভোজের আয়োজন করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মূল সফরটি শুরু হবে ৬ সেপ্টেম্বর। এ দিন সকালে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এ দিন বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও দেশটির অন্যান্য শীর্ষ নেতার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে।

৭ সেপ্টেম্বর জয়পুর ও আজমির শরিফ যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এ ছাড়া ভারতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাদা একটি অনুষ্ঠান রয়েছে এ দিন। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে ভারত ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত ৬ সেপ্টেম্বরের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়টি শুধু নিশ্চিত হয়েছে। বাকি বৈঠক ও সময়সূচি এদিক-সেদিক করা হচ্ছে। হয়তো ৮ সেপ্টেম্বর সকালে আজমির শরিফ যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আবার দেশটির বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতেরও সম্ভাবনা রয়েছে। এখনও সব চূড়ান্ত নয়।

২০২১ সালের মার্চে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং একই বছরের ডিসেম্বরে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশটির রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বাংলাদেশ সফর করেন। একই বছরে একটি দেশে কোনো দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সফর একটি বিরল ঘটনা।

সর্বশেষ ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন।

আরও পড়ুন

×